মিথ্যেবাদী অনৈতিক এআই, মানুষ তাকে সামলাতে পারবে?

AI Research: মানুষ মিথ্যে বললে পাপ, আর যন্ত্রে বললে 'আপগ্রেডেশন'? হ্যাঁ, ঠিক এই রকমই এক নৈতিক ভেলকিবাজির কেসস্টাডি প্রকাশিত হয়েছে নেচার পত্রিকায়।

Abhirup pal
৩ মিনিট
মিথ্যেবাদী অনৈতিক এআই, মানুষ তাকে সামলাতে পারবে?

দায় এড়ানো আমাদের চিরকালের অভ্যেস। যুদ্ধের দায় শাসকের, দুর্নীতির দায় ব্যবস্থার, এই তালিকায় সাম্প্রতিকতম সংযোজন মিথ্যের দায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। মানুষ মিথ্যে বললে পাপ, আর যন্ত্রে বললে 'আপগ্রেডেশন'? হ্যাঁ, ঠিক এই রকমই এক নৈতিক ভেলকিবাজির কেসস্টাডি প্রকাশিত হয়েছে নেচার পত্রিকায়। জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট আর ফ্রান্সের টুলুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা প্রমাণ করে দিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিলেই মানুষের সততার দড়িতে গিঁট পড়ে যাবে।

ঘটনাটা কী? গবেষকরা পরীক্ষার মঞ্চে রেখেছিলেন একটা ছক্কা। সেই ছক্কা একবার ফেলে যে সংখ্যা উঠবে, সেই সংখ্যাই রিপোর্ট করতে হবে। আর পুরস্কারও মিলবে সেই অনুযায়ী— এক মানে এক সেন্ট, ছয় মানে মোটা অঙ্ক। গবেষণায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা যখন নিজেই নিজের রিপোর্ট দিলেন তার ৯৫% ক্ষেত্রে তারা বললেন সত্যি। কিন্তু এআই যখন মানুষের হয়ে সেই কাজের দায় নিল, তখন সঠিক তথ্যের পরিমাণ কমে দাঁড়াল ৭৫%-এ। মানুষ যখন একধাপ এগিয়ে তাকে “লাভ বাড়াও” বা “আগের তথ্য থেকে শেখো” জাতীয় নির্দেশ দিতে থাকল তখন সততার হার নেমে ৫০%-এ, প্রতারণার হার চড়ে দাঁড়াচ্ছে ৮৫%-এ। গবেষণায় ৩৯০ জন অংশগ্রহণকারী লিখে দিয়েছিলেন নির্দেশ। দেখা যাচ্ছে, মানব-সহকারীরা প্রায় ৭৫% ক্ষেত্রে প্রতারণামূলক নির্দেশ মানেননি। এআই কিন্তু মেনে নিয়েছে প্রায় সব আদেশ। এ যেন ঈশপের গল্পের ছাগল— যতই বলা হোক, গিলে খেতেই থাকবে। তাহলে এআই মধ্যস্থতায় থাকলে শেক্সপিয়রের "ফেয়ার ইজ ফাউল অ্যান্ড ফাউল ইজ ফেয়ার' বলা ছাড়া গতি আছে কি?

এই গবেষণার প্রধান শরিক নীলস কোবিস রসিকতার সুরে যদিও বলেছেন, “মানুষ মিথ্যে বললে তাও একটু লজ্জা পেয়ে লাল হয় বইকি কিন্তু যন্ত্র, সে চার্জার খোঁজে।” ফলাফল শুনে টুলুজের জাঁ-ফ্রাঁসোয়া বোনেফোঁর মন্তব্য, “মানুষের নির্দেশে এআই-এর অসততা আত্মাকে সামনে দাঁড় না করিয়েই ক্যামেরায় তাকে খোঁজার চেষ্টা।” মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার মতে," মানুষ যখন নৈতিকভাবে ভুল কাজ করে, তখন দায় ঝেড়ে ফেলার নানা কৌশল খোঁজে। এ গবেষণা তার নতুন উদাহরণ। এখানে আছে এক নতুন অজুহাতশাস্ত্র, একবিংশ শতকে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে দায় ঝেড়ে ফেলা। "

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এআই প্রয়োগে বাড়ছে সাইবার ক্রাইম: কতটা বিপদের মুখে আপনি?

AI misuses in India: শুধু ভুয়ো ভিডিও বা গলা নকল করার মাধ্যমে নানা রাজনৈতিক ফায়দা তোলার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর সীমাবদ্ধ থাকছে না। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আর্থিক জালিয়াতির নানা ঘটনা।

পরীক্ষার দ্বিতীয় ধাপ আরও মজার । পরীক্ষার মঞ্চ ট্যাক্স অফিস। নিয়ম হল অংশগ্রহণকারীরা টাকা পেলে,৩৫% রেড ক্রস-এ জমা দিতে হবে। নিজের হাতে হিসেব দেওয়ার সময় অনেকেই সঠিক আয়ের তথ্য জানিয়ে সততা দেখালেও দায়িত্ব এআই-এর হাতে চলে গেলে কী ঘটে, অর্থনীতিবিদ জন অলমের কথায় তা স্পষ্ট। তিনি বলছেন, “ট্যাক্স ফাঁকি সামাজিক বিশ্বাসের বুনিয়াদ নষ্ট করে। আজ দেখা যাচ্ছে, সেই বিশ্বাস গুঁড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের নতুন সহযোগী— এআই"। অনৈতিক হতে বিন্দুমাত্র ইতস্ততবোধ করেনি এআই। নির্দিষ্ট নির্দেশ দিলে পুরনো GPT-4 কিছুটা সামলানোর চেষ্টা করলেও, নতুন মডেলগুলো নির্বিকার। নীচে নামতে সে সদাপ্রস্তুত। এই ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের যখন জিজ্ঞাসা করা হয়— নিজেরা এই অন্যায় করবেন, না যন্ত্রকে দায়িত্ব দেবেন? অর্ধেকেই ঝটপট যন্ত্রের উপর দায় চাপিয়ে বলতে চান, “পাপ আমার নয়, পাপী তো প্রসেসর।”

গবেষনার সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে। মানুষ না মেশিন— কে বেশি প্রতারণা করবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, মানুষ অন্তত নৈতিক অপরাধবোধে আটকে যায়—৬০–৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রতারণা করার আগে দু-বার ভাবে। কিন্তু GPT-4, GPT-4o, Claude 3.5 বা Llama 3.3? সোজা মাথা ঝুঁকিয়ে কাজ সারে—৬০ থেকে ৯৮ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্দেশ মেনে প্রতারণায় সামিল হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মুখে একটাই বুলি—“হুজুর যা বলবেন, তাই সই।”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সুতোয় ঝুলছে চাকরি, ChatGPT-এআইয়ের ধাক্কায় কাজ হারিয়ে পথে বসতে পারেন আপনিও!

ChatGPT AI Job Loss : এমনিতে এখন চাকরির জগতের অবস্থা ভালো নয়। খরচ কমানোর জন্য বিভিন্ন পন্থা খুঁজছে কর্পোরেট সংস্থাগুলি...

এই ফলাফল কিন্তু কেবল পরীক্ষাগারে আটকে নেই। ভাবুন, অ্যাপ ক্যাবের সার্জ প্রাইসিং, অনলাইনে ভুয়ো রিভিউ, কিংবা আদালতে সাক্ষ্য,মানুষ যদি সব অ-ন্যায়ের দায় যন্ত্রের ঘাড়ে চাপাতে শুরু করে, তবে কী হবে ভবিষ্যতে?

তাহলে গবেষণা বলছে নৈতিকতার বেলাতে সেটা সমাজকে টেনে নিয়ে যেতে পারে এক অন্ধকার গলিতে। গবেষক ইয়াদ রাহওয়ানের আক্ষেপ, “সবচেয়ে কার্যকর কৌশলই এখন সবচেয়ে কম ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠল।” কিন্তু আশার খবরও আছে। পরীক্ষার শেষে দেখা যায়, ৭৪ শতাংশ মানুষ যন্ত্রকে ভরসা না করে নিজের হাতে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন। হয়তো মনে মনে ভাবেছেন, ভুল করলেও ভুলটা অন্তত নিজের হবে।

এ গবেষণা এক সতর্কবার্তা, পাপের ভার যন্ত্রের হলে, পাপী কে তবে? মানুষ দায় এড়িয়ে বাঁচবে, নাকি বৃষস্কন্ধে দায় তুলে নেবে?

লিখেছেন
Abhirup pal
Abhirup pal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।