প্রধান বিচারপতিকে জুতো মারা আসলে সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থাকেই নস্যাৎ করার প্রক্রিয়া

BR Gavai: হাজার হাজার বছর ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা সেই দলিত সমাজ থেকে উঠে আসা বলেই কি অন্ধবিশ্বাসীদের এ হেন আক্রমণের মুখে প্রধান বিচারপতি?

Kanad Mukherjee
৪ মিনিট
প্রধান বিচারপতিকে জুতো মারা আসলে সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থাকেই নস্যাৎ করার প্রক্রিয়া

গত সোমবারের ঘটনা। ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ১১টা বেজে ৩৫ মিনিটে থমকেছে। সুপ্রিম কোর্টের ১ নম্বর রুমে প্রধান বিচারপতি বিআর গভাইয়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে চলছে শুনানি। ঠিক সেই সময়েই 'ধামাকা', যা এ দেশের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটতে দেখা যায়নি। সংবাদমাধ্যম বলছে, ওই সময় রাকেশ কিশোর নামে এক আইনজীবী স্লোগান দিতে শুরু করেন। বলতে থাকেন, ''সনাতন ধরম কা অপমান, নেহি সহেগা হিন্দুস্তান।'' অর্থাৎ, “সনাতন ধর্মের অপমান সহ্য করব না।” এর পরই চমক। স্লোগান দিতে দিতে রাকেশ খুলে ফেলেন তাঁর স্পোর্টস শ্যু। কেউ কেউ বলছেন, রাকেশ সে দিন প্রধান বিচারপতিকে লক্ষ্য করে জুতো ছুঁড়েছিলেন। আবার কেউ বলছেন, কিছু একটা ছুঁড়েছিলেন তিনি।

কিন্তু কেন? সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো মন্দির কমপ্লেক্স নিয়ে এক মামলার শুনানি চলছিল প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে। সেখানকার জাভারি মন্দিরে মুখমণ্ডলহীন ৭ ফুট উঁচু বিষ্ণুমূর্তির সংস্কার চেয়ে আবেদন করেছিলেন এক আইনজীবী। আর অন্ধবিশ্বাসের উপর করা সেই মামলাটি খারিজ করতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি আইনজীবীর উদ্দেশ্যে বলেন, ''যদি আপনি সত্যিই বিষ্ণুর ভক্ত হন, তবে যান, প্রার্থনা করুন। দেবতাকে বলুন যেন উনি নিজেই কিছু করেন। খাজুরাহো একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। এর জন্য এএসআইয়ের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন।''

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'আমিত্ব' ভারতীয় সংবিধানের মূল নয়, মনমোহনের জয় ও পরাজয় সেই মূলেই লুকিয়ে

Manmohan Singh Death: ১০ বছরের শাসনকালে মনমোহন সিংহ জননেতা বা তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা বা একনায়ক হয়ে উঠতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু নিজের ও সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করেছেন একজন শিক্ষিত ও রুচিশীল ব্যক্তি হিসেবে।

নানা বিতর্কিত পর্ব পেরিয়ে আসা অযোধ্যার বাবরি মসজিদে এই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই নির্মিত হয়েছে রাম মন্দির। যা এক সময় বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে। সেই সুপ্রিম কোর্টেই বিষ্ণুমূর্তি সংক্রান্ত মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ায় রেগে কাঁই আইনজীবী রাকেশ। তাই প্রধান বিচারপতিকে তিনি জুতো ছুড়ে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে। তাঁকে তল্লাশি করে পাওয়া গিয়েছে স্লোগান লেখা চিরকুট। যদিও রাকেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের তরফে কোনও অভিযোগ দায়ের হয়নি। তাই মুক্তি তিনি পেয়েছেন। আর মুক্তির পর ফের গর্জে উঠেছেন। প্রধান বিচারপতির উপর এই আক্রমণ নিয়ে দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠলেও, এ জন্য বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নন রাকেশ। বরং তাঁর দাবি, ‘পরমাত্মা’ তাঁকে দিয়ে এই কাজ করিয়ে নিয়েছেন (গত লোকসভা ভোটের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দাবি করেছিলেন, তিনি কিছুই নন। তিনি ঈশ্বরের তৈরি একটি যন্ত্র মাত্র। ঈশ্বর তাঁকে দিয়ে কাজ করাতে চান। আর তিনি সেই কাজ করেন। এই বক্তব্যের সঙ্গে রাকেশের দাবির কী অদ্ভুত মিল!)। রাকেশের বক্তব্য, ''উনি অ্যাকশন নিয়েছেন। আমি রিঅ্যাকশন দিয়েছি। যে ভাবে পারেন দেখুন। আমি ভয় পাই না। কোনও আফশোস নেই আমার।''

২০১৪ সাল থেকে বিজেপি জমানা শুরু হওয়ার পর থেকে, এ দেশের তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ বা সংখ্যালঘুদের উপরে গেরুয়াবাহিনীর নানা অত্যাচারের দৃশ্য সামনে এসেছে। যেন দীর্ঘকাল ধরে বোতলবন্দি থাকা দৈত্য বেরিয়ে এসেই শুরু করেছে নৃশংসতার একের পর এক পর্ব। কখনও গোরক্ষাবাহিনীর শিকার হয়েছে উত্তর প্রদেশের দাদরির মহম্মদ আকলাখ। আবার কখনও দৈত্যের কবলে যোগীরাজ্য হাথরসের দলিত তরুণী। 'ডাবল ইঞ্জিন' শাসিত রাজ্যগুলি যেন এমন উদাহরণ তুলে ধরায় একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এ বার সেই তাণ্ডবের আঁচ পৌঁছে গেল সুপ্রিম কোর্টের অন্দরেও।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সংবিধানের দলিত, দলিতের সংবিধান: একটি বোঝাপড়া

Constitutional Rights of Dalits: সংবিধানের রক্ষাকবচ না থাকলে ভারতীয় দলিত বহুজন যে বহু পরিসর থেকে আজও বহু দূরে থাকত তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

কেজি বালাকৃষ্ণণের পর দেশের দ্বিতীয় দলিত প্রধান বিচারপতি বিআর গভাই। দেশের সংবিধান প্রণেতা ডক্টর বিআর আম্বেদকর তাঁর শ্রদ্ধার পাত্র। সংবিধানকে তিনি মানেন 'ভীমস্মৃতি' হিসাবে। দলিত সম্প্রদায়ের জন্য আম্বেদকরের লড়াইয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা তাঁর। হাজার হাজার বছর ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা সেই দলিত সমাজ থেকে উঠে আসা বলেই কি অন্ধবিশ্বাসীদের এ হেন আক্রমণের মুখে প্রধান বিচারপতি?

শুধু কি তাই, কারণ আরও আছে। চলতি বছরের ৫ অক্টোবর মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে সংগঠনের জন্মের শতবার্ষিকী পালন করেছিল এ দেশের শাসকদল বিজেপির মেরুদণ্ড আরএসএস। সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল প্রধান বিচারপতি বিআর গভাইয়ের মা কমল গভাইকে। কিন্তু সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়ে কমল আরএসএসের কর্তাদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, তিনি আম্বেদকরপন্থী। তিনি কোনও সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন না। দলিত পরিবারের কাছ থেকে আসা এই উত্তরকে কি 'অপমান' হিসাবে দেখছে আরএসএস? এর উপর বিষ্ণমূর্তি সংক্রান্ত মামলা খারিজ করে দেওয়া কি যোগ করেছে নতুন মাত্রা? প্রধান বিচারপতি রাকেশের এ হেন কীর্তিকে পাত্তা দিতে চান না। বস্তুত পুলিশের হাত থেকে রেহাইও পেয়ে গিয়েছেন রাকেশ। কিন্তু, এই ক্ষমা নতুন করে কোনও বিপদের পথ খুলে দেবে না তো?

আজকাল গেরুয়াবাহিনীর বড়, মেজ, সেজ বা ছোট, যে কোনও হর্তাকর্তার সঙ্গে অল্পস্বল্প আলাপেই শুনতে পাই, এ দেশে এক দিন ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রতিষ্ঠা পাবে ঋকবেদের যুগের সমাজতন্ত্র। তাঁদের বক্তব্য, ঋকবেদের যুগে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই জাতিগত বিভাজন ছিল না। ছিল শুধুমাত্র কর্মগত শ্রেণী বিভাজন। সেই সমাজতন্ত্র না কি এ দেশে আগতপ্রায়। হয়তো সেই অনাগত সময়ের নতুন সংবিধানও লেখা চলছে নাগপুরের কোনও বৃক্ষকোটরে। বর্তমান সংবিধানকে সরিয়ে যা হয়তো এক দিন ঠাঁই পাবে দেশনেতাদের টেবিলে টেবিলে। হয়তো তার সপ্তম অধ্যায়ের ক-এর দাগের তিন নম্বর প্যারাগ্রাফ দেখে রোজ সকালে টিভি বা রেডিওয় প্রচার করে দেওয়া হবে, আজ কী খাওয়া যাবে বা কী খাওয়া যাবে না। অথবা এ নিছকই আমার কষ্টকল্পনা।

কিন্তু তাই বা কী করে বলি! রবিবারই দিল্লির বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত সর্বভারতীয় একটি ব্রাহ্মণ সম্মেলনে বলেছেন, ''সমাজে যদি কেউ জ্ঞানের শিখা প্রজ্বলিত করে, তবে তা হল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়। তাঁরা কেবল ধর্মগ্রন্থই নয়, অস্ত্রেরও পুজো করেন। এই অস্ত্র এবং ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমেই আমরা সমাজ ও দেশকে রক্ষা করতে পারি।'' আলো কি ক্রমে আসিতেছে না কমে আসিতেছে?

লিখেছেন
Kanad Mukherjee
Kanad Mukherjee
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।