সবটুকু শুষে নিচ্ছে স্মার্টফোন, শান্তি ফেরাতে গোটা বিশ্ব ফিরছে সেই পুরনোয়...

Touchpad smartphone vs Keypad phone : নতুন করে যুদ্ধে নামছে কি প্যাড ফোন, স্মার্টফোনে ক্লান্ত মানুষ আবার বেছে নিচ্ছে তাকেই!‍

মোবাইল ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বিশ্বজুড়ে বদলাতে থাকে মিলেনিয়ামের শুরুতে। মোবাইল ফোন শুধু কথা বলার যন্ত্র হয়েই আর থেমে  রইল না, ক্রমে হয়ে উঠল সারাদিনের সঙ্গী, সেই ফোন দিয়ে হেন কাজ নেই যা হয় না, বা করা যায় না। প্রযুক্তির জিয়নকাঠি যেন ছুঁয়ে আছে তাকে। সেই থেকে শুরু স্মার্টফোনের বাজার। আস্তে আস্তে তা বিশ্ব জয় করেছে। হারিয়ে গেছে আমাদের শৈশবের সেই কি প্যাড মুঠো ফোন। কিন্তু আজও মুখে মুখে ফেরে সেই সময়টার কথা যখন নোকিয়া, রিলায়েন্সের আপাত শক্ত কি প্যাড ফোনগুলি হাতে হাতে ঘুরত, যা পড়ে গেলেও ভাঙত না! বা ধরুন ওই ১০-১১ টাকা রিচার্জ করলেই এক সপ্তাহ ১০০ টা মেসেজ ফ্রি পাওয়া যেত, সেই সময়ের আদি বাসিন্দারাই মনে করতে পারবেন কী সোনার দিন ছিল সেইসব। স্মার্টফোন এসে আমাদের সেই রোজের অভিজ্ঞতা  সম্পূর্ন ভাবে পাল্টে দিয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই জীবনে গতি এসেছে। আর স্মার্টফোনের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত। দূরের মানুষকে কাছে এনে দিয়েছে। কিন্তু কোথায় যেন একটা কাঁটা রয়েই গেছে।

মাত্র এক দশক আগের কথা, তখনও ঘরে ঘরে থাকত কি প্যাড ফোন। রসিকতা করে এই ফোনগুলিকেই নতুন নাম দেওয়া হয়েছে, ডাম্বফোন। কিন্তু এই নামকরণের কারণ কী? আর ডাম্বফোন আসলে কী? ডাম্বফোন হল সেই ফোন যা কিনা স্মার্টফোনের মতো স্মার্ট প্রযুক্তিতে তৈরি হয়নি, বেশি ফিচার নেই সেই কারণে একে বোকাফোন বলে ডাকা হয়।এদের কাজ করার ক্ষমতা অ্যান্ড্রয়েড বা আইফোনের মতো নয়। যেমন কাউকে কল করা, মেসেজ করা, রেডিওতে গান শোনা খুব বড় জোর যদি আপনি সৌভাগ্যবান হন তাহলে ছবি তুলতে পারবেন। কিন্তু অ্যাপ কিছু থাকে না। তো এই হল ডাম্বফোন। স্মার্টফোনের রমরমার যুগে আজ আবার একটু একটু করে কথা শুরু হচ্ছে সেই বিগতযৌবনাকে নিয়েই।

হঠাৎ করেই এই ফোনের শিরোনামে আসার কারণ কী? সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হরেক সমীক্ষা বলছে, আজকের তরুণ প্রজন্ম এই স্মার্টফোন ছেড়ে নাকি সেই পুরনো ফোনের দিকে ঝুঁকছে। ভাবা যায় ! কিন্তু এটাই সত্যি। সম্প্রতি বিবিসি প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী বাজারে আসার পরই দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ডাম্বফোন। বিশেষ করে, ভারত এবং আফ্রিকার মতো দেশ যেখানে মানুষ দিন আনে দিন খায় সেখানে স্মার্টফোন বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না। আবার অনেকে এটাও বলছেন যে, শুধু আর্থিক কারণেই নয়, অনেকে স্মার্টফোনের মোহজাল থেকে বেরোতে ফিচার ফোনের দিকে ঝুঁকছে।

হলিউড স্টার সেলেনা গোমেজ কিন্তু এই ডাম্পফোন নিয়ে বেশ খুশিতে আছেন। তিনি বিগত কয়েক বছর ধরে স্মার্টফোন থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছেন আর এই ডাম্পফোন তার সমস্যা দূর করতে সাহায্য করেছে এবং তাকে মানসিক শান্তি এনে দিয়েছে। স্মার্টফোন মানেই দিন নেই রাত নেই নোটিফিকেশন আসতেই থাকে। কাহাতক তা সহ্য করা যায় তাই তিনি এই পুরনো কিসিমের ফোনের দিকেই হাত বাড়িয়েছেন।

এক তরুণের কথায়, একটা স্মার্টফোনের ব্যাটারি চার্জ করতে দিলেও চার্জ বেশিক্ষণ থাকে না কিন্তু ডাম্পফোন এ সেই সমস্যা নেই। ওটায় একবার চার্জ দিলে তিনদিন অবধি চলে যায়। আর স্মার্টফোন বন্ধ করে এই ফোন ব্যবহার করার ফলে নাকি সে বন্ধুদের সঙ্গে আরো বেশিক্ষণ আড্ডা দিতে পারে। স্ট্রেসও কমে হু হু করে। মেজাজ থাকে ঝরঝরে।

তরুণ প্রজন্মের কাহিনি এখানেই শেষ নয়। রবিন ওয়েস্ট নামে এক যুবক স্মার্টফোনে এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েন যে নিজের পড়াশোনা লাটে উঠেছিল। সারাদিন শুধু স্ক্রল আর স্ক্রল। কিন্তু সম্প্রতি একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ফিচার ফোন কিনে নিজেকে স্মার্টফোনের হাতছানি থেকে দূরে রেখেছেন। বিবিসি-র, কথায় রবিন ওয়েস্টের কাছে যে ফিচার ফোন আছে তার দাম যেমন কম তেমনই মাসের শেষে বিলও আসে অনেক কম। লন্ডনের এক কিশোরী আবার বলেই ফেললেন যে তিনি আর স্মার্টফোন কিনবেন না। তিনি এই বোকা ফোন নিয়েই খুশি।

২০২১ সালের এক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বিবিসি জানিয়েছে মার্কিন মুলুকেও ১০ জন ফোন ব্যবহারকরীদের মধ্যে ১ জন ডাম্পফোন ব্যাবহার করে। আসউইচ ডট কমের মোবাইল বিশেষজ্ঞ আর্নেস্ট ডকু বলেন, এই ফিচার ফোনের পুনরুত্থানের পেছনে নোকিয়ার অনেক বড় অবদান আছে। একসময় ফিচার ফোনের বাজারে নোকিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি ছিল। ২০০০ সালে অর্থাৎ আজ থেকে ২২ বছর আগে নোকিয়া ৩৩১০ বাজারে আসে। পরে আবার ২০১৭ সালে এই ডাম্পফোনটিকে নতুন করে বাজারে ছাড়া হয়। আর তাতেই শিরোনামে উঠে আসে এই ডাম্পফোন।

এক রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে নোকিয়ার পুরোনো ফিচার ফোনগুলো আবার বাজারে ঝড় তুলতে শুরু করে। জানা যায়, প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মানুষ গুগলে এই  কি প্যাডগুলি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন।

পাঁচ বছর আগে একজন মনোবিজ্ঞানী তার স্মার্টফোন ছেড়ে নোকিয়া ৩৩১০ কিনেছিলেন। তিনি বলছেন,

আমি সবসময় ফোনে আটকে থাকতাম। হয় ফেসবুক নয়তো অন্য সোশ্যাল সাইট নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু এখন এই ফিচার ফোন কেনার পর আমি আমার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারছি।


নোকিয়ার মতো অন্য একটি ডাম্বফোন নির্মাণ সংস্থা লাইটফোন জানিয়েছে তাদের হ্যান্ডসেটের বিক্রি আগের থেকে অনেক বেড়ে গেছে। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে তারা লক্ষ্য করেছে যারা এই ডাম্প ফোনের গ্রাহক তাদের সকলের বয়স ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে।

সফটওয়্যার নির্মাতা সেমরাশ বলছেন ফিচার ফোনের বিক্রির তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন কিন্তু এক রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপি ১০০ কোটি ফিচার ফোন বিক্রি হয়েছে। যেখানে ২০২০ তে ফিচার ফোনের সংখ্যা ছিল ৪০ কোটির মতো।

৯০ দশকের মানুষ যারা তাদের কাছে এই বোকাফোন জিনিস অতি চেনা পরিচিত। তখনকার দিনে এই ফিচার ফোন হাতে পাওয়া মানে যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। বারবার হাত থেকেও পড়েছে তাও ভাঙেনি এই অক্ষয়চাঁদ বরং জুড়ে দিয়েছে অনেক ভাঙা মন। কি প্যাড ফোনেকে আপনি বলতেই পারেন সেকেলে। তবে এটা সত্যি বহুমুখী পারফরমেন্সের দিক থেকে বিচার করলে, অ্যাপল বা অন্য অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মতো না হলেও. টেকসই আর ব্যাটারির দিক থেকে এই ফোন আজকের ফোনকে বলে বলে গোল দেবে। স্মার্ট নয়, কিন্তু চালাক, আপনি কোনটা চান!

More Articles