কাফালা ব্যবস্থা: শেষ হচ্ছে সৌদির আধুনিক দাসত্ব?

Saudi Arabia Ends 50-Year-Old Kafala System : শ্রমিকরা নিজেদের চাকরি বদলাতে পারতেন না, কাজ ছাড়তে বা অন্য জায়গায় যেতে পারতেন না নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া। ফলে অনেক সময় শ্রমিকরা ভয়, শোষণ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করতেন।

Tanvia Barua
৩ মিনিট
কাফালা ব্যবস্থা: শেষ হচ্ছে সৌদির আধুনিক দাসত্ব?

৫০ বছর পর সৌদি আরবের বিতর্কিত 'কাফলা' তথা শ্রমব্যবস্থার অবসান ঘটছে। এই ব্যবস্থার কারণে এতদিন ধরে লক্ষ লক্ষ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগকর্তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থেকে কাজ করতেন। এবার সেই শ্রমব্যবস্থা ভেঙে, সরকার ঘোষণা করেছে নতুন শ্রমনীতির। এর ফলে বিদেশি কর্মীরা আরও বেশি স্বাধীনতা ও অধিকার পাবেন।

‘কাফালা’ শব্দের অর্থ স্পনসরশিপ বা দায়িত্ব নেওয়া। এই ব্যবস্থায় সৌদি আরব ও গাল্ফ দেশগুলিতে বিদেশি শ্রমিকদের ভিসা, কাজ, এমনকি দেশে ফেরার অনুমতিও নির্ভর করত এক জন নিয়োগকর্তা বা 'কাফিল'-এর উপর। অর্থাৎ, শ্রমিক নিজের চাকরি বদলাতে পারতেন না, কাজ ছাড়তে বা অন্য জায়গায় যেতে পারতেন না নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া। ফলে অনেক সময় শ্রমিকরা ভয়, শোষণ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করতেন। নানা মানবাধিকার সংস্থা এই ব্যবস্থাকে 'আধুনিক দাসত্বের' সঙ্গে তুলনা করেছে। ১৯৫০-এর দশক থেকে সৌদি আরব-সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এই কাফালা ব্যবস্থা চালু ছিল।

নতুন সিদ্ধান্তে কী বদলাচ্ছে?

সৌদি সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে এখন থেকে বিদেশি শ্রমিকরা নিজের কাজ পরিবর্তন করতে পারবেন নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়াই। তাঁরা চাইলে দেশ ছাড়ার ভিসাও নিজে থেকেই নিতে পারবেন, আগের মতো আর 'এক্সিট পারমিট' নেওয়ার দরকার হবে না। তাছাড়া, শ্রমিকদের জন্য চুক্তি-ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু হচ্ছে, যেখানে তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কাজের শর্ত আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা থাকবে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ১৩ মিলিয়ন (১ কোটি ৩০ লাখ) বিদেশি শ্রমিক উপকৃত হবেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অন্তরঙ্গতাই উপার্জন, অন্তরঙ্গতাই ভয়: শহরের মহিলা সেবাশ্রমিকদের রোজনামচা

International Workers' Day: গৃহ শ্রমিক ও সেবা শ্রমিকেরাও একই রকম ঝুঁকি নিয়ে গৃহস্থ বাড়ির অন্দরমহলে কাজ করে থাকেন। এই শ্রমনিযুক্তির প্রাকশর্ত হয় অন্তরঙ্গতা।

নতুন নিয়মে শ্রমিকরা—

• আগের চাকরি ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে যোগ দিতে পারবেন

• নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তি শেষ হওয়ার পর নিজের ইচ্ছা মতো নতুন চাকরি নিতে রবেন

• প্রয়োজনে পরিবারের সঙ্গে দেশে যেতে পারবেন নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্বাধীন কাজের ইন্দ্রজালে কীভাবে প্রতারিত হচ্ছেন গিগ শ্রমিকেরা?

Gig Workers : যদি ব্লিংকিট কোম্পানিকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনারা গিগ শ্রমিকদের ইচ্ছে মতো সময়ে কাজ করতে দেন? তাঁরা বলবেন, হ্যাঁ, যে যখন খুশি ঢুকতে পারে, যখন খুশি বেরোতে পারে। কিন্তু বিষয়টা আলাদা।

• অভিযোগ জানাতে পারবেন সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়ে, যাতে তাঁদের সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়

উল্লেখ্য, সৌদি আরবের অর্থনীতি বহু বছর ধরে বিদেশি শ্রমিকদের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ফিলিপাইন থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ করতে যান সেখানে। কিন্তু কাফালা ব্যবস্থার কারণে তাঁদের অনেকেই শোষণের শিকার হয়েছেন। পাসপোর্ট আটক রাখা, বেতন আটকে দেওয়া, অতিরিক্ত সময় কাজ করানো, এমন নানা অভিযোগ ছিল।

এই সংস্কার সৌদি সরকারের 'ভিশন ২০৩০'-এর অংশ। দেশটি তেলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শিল্প, পর্যটন ও প্রযুক্তি খাতে রূপান্তর আনতে চায়। এজন্য আধুনিক শ্রমনীতি খুব প্রয়োজন ছিল। সরকারের দাবি, এই পরিবর্তন শ্রমবাজারকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও মানবিক করবে।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আইনের বদলই শেষ কথা নয়। বাস্তবে এই নিয়ম ঠিকভাবে প্রয়োগ করা এবং শ্রমিকদের সচেতন করাই সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। অনেক শ্রমিকই হয়ত জানবেন না, তাঁদের নতুন অধিকার কীভাবে ব্যবহার করবেন। ভাষাগত বাধা, ভয় বা তথ্যের অভাবে তাঁরা পুরনো নিয়মের মধ্যেই থেকে যেতে পারেন। আরেকটি চ্যালেঞ্জ নিয়োগকর্তাদের মানসিকতা। যারা এতদিন পুরনো শ্রমনীতি মানতেন, তাঁদের অনেকে হয়ত নতুন নিয়ম সহজে মানবেন না। তাই সরকারের পক্ষ থেকে কড়া নজরদারি, তদারকি ও প্রচার চালানো জরুরি।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সৌদি আরবের এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক অধিকার রক্ষায় নতুন যুগের সূচনা করবে।বাংলাদেশ-সহ শ্রম রফতানিকারক দেশগুলিও এই পরিবর্তনে স্বস্তি পেয়েছে। কারণ এতদিন সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের অধিকাংশই অভিযোগ জানাতে পারতেন না। এখন তাঁদের জন্য আইনি পথ অনেক সহজ হবে।

৫০ বছর পর সৌদি আরবের কাফালা ব্যবস্থার পরিসমাপ্তি শ্রমিক জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হলে বিদেশি শ্রমিকদের জীবন অনেক সহজ ও সম্মানজনক হবে। তবে আইন বদল যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, আসল সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগ ও শ্রমিকদের সচেতনতার উপর। এই পরিবর্তন শুধু সৌদি আরব নয়— পুরো গাল্ফ অঞ্চলে মানবাধিকারের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘মহাকাব্য যদি কোথাও জন্মে থাকে, তবে তা ফুটপাতে’—কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্তের সঙ্গে 'আড্ডা'য় অত্রি ভট্টাচার্য

The Other Kolkata of krishnapriya Dasgupta: কলকাতার সেই অচেনা ফুটপাতের মানুষরা কীভাবে বেঁচে থাকেন? সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আজকালের প্রাক্তন সাংবাদিক কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত কী দেখেছেন? আর আজকের সংবাদমাধ্যম কেন বদলে গেল তাঁদের দেখার চোখে? তাঁর স্মৃতি, সাংবাদিকতা ও আজকের বদলে যাওয়া শহর নিয়েই তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় অত্রি ভট্টাচার্য।

১৯৭১ থেকে ২০১১: কলকাতার ফুটপাথে থাকা মানুষদের রোজনামচা কেমন ছিল?

Kolkata pavement dwellers survey: ১৯৭১ থেকে ২০১১—এই চার দশকে কলকাতার ফুটপাথবাসীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ৭০ হাজারে পৌঁছেছে। ফুটপাথবাসীদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। কেউ থাকেন উড়ালপুলের নীচে, কেউ রেললাইনের পাশে, আবার কেউ পরিত্যক্ত পাইপের ভিতরে। শহরের অসংগঠিত অর্থনীতিতে ফুটপাথবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের জীবনযাপন, কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নিয়ে অতীতে বেশ কিছু গবেষণা ও সমীক্ষাও হয়েছে।

শুধু আমেরিকা বা আফ্রিকাতেই নয়, বাংলাতেও ছিল দাসপ্রথা

International Day for the Remembrance of the Slave Trade and its Abolition: ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক দাসব্যবসা স্মরণ দিবস। হাইতির দাসবিদ্রোহের পাশাপাশি স্মরণ করতে হবে, বাংলার মাটি থেকে লক্ষাধিক মানুষকে বলপূর্বক নির্বাসিত করার ইতিহাস। চট্টগ্রাম, হুগলি, সুন্দরবন হয়ে আরব, আফ্রিকা, মরিশাসে পৌঁছেছেন বাংলার দাসেরা। শুধু ইতিহাসে নয়, আজও বাঙালির আন্তর্জাতিকতা চর্চায় দাসেদের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক।

ঘাড়ধাক্কা খেয়ে ওপারে, বাংলাদেশে যেভাবে বেঁচে আছেন সাইদা ফকির

Saida Fakir Deportation: বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগের পর কী ভাবে দিন কাটছে সাইদা ফকিরের? বাংলাদেশের কোথায় আছেন? কারা আশ্রয় দিল তাঁকে?

সোনালি সুইটির পর এবার সাইদা, 'ঘাড়ধাক্কা'র তালিকায় নতুন নাম যে প্রশ্ন তুলছে

Saida Fakir Case: সাইদা ফকিরকে বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবির ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি। কাউকে দেশছাড়া করার আগে যথাযথ তদন্ত ও সাংবিধানিক সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই বিতর্ক ফের উঠে এসেছে।

ফিরে দেখা: সোনালি-সুইটিদের নরক যাত্রা

Sonali Khatun, Sweety Bibi: দু'দশক দিল্লিতে থাকার পরও কেন সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবিদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হলো? নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও কেন জেল, পুশব্যাক ও অপমানের শিকার হতে হলো তাঁদের? সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকার প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিল?

উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম, তবু ফল প্রকাশের দিন হোটেলে কাজে ব্যস্ত সাগর

Sagar Mondal: উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম। মোট ৪৮৮ নম্বর। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন বাড়িতে নয়, গুজরাটের আমেদাবাদের একটি হোটেলে কাজে ব্যস্ত ছিল পূর্ব বর্ধমানের সাগর মণ্ডল। পরিযায়ী শ্রমিকের ছেলে সাগরের স্বপ্ন আইএএস হওয়ার।