নেটফ্লিক্সে না প্যারামাউন্ট কোন দিকে ঝুঁকবে ওয়ার্নার ব্রাদার?

Netflix vs Paramount: নেটফ্লিক্সের প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই প্যারামাউন্ট (Paramount) একটি পাল্টা দর নিয়ে সামনে আসে। তাদের বক্তব্য, ওয়ার্নার ব্রাদার ডিসকভারির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য তাদের অফার আরও লাভজনক।

বিশ্ব বিনোদন জগতে বড় স্টুডিওদের চাপ, রাজনীতি আর নানা আইনি নিয়ম মিলে পুরো পরিস্থিতি খুবই জটিল ও অস্থির হয়ে উঠেছে। স্টুডিওগুলি এখন ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কোন পথে এগোবে। একদিকে দর্শকের পছন্দ দ্রুত বদলাচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব ও বড় কোম্পানিগুলির একত্র হওয়া নিয়ে নানা রকম আইনি বাধা তৈরি হচ্ছে। ফলে পুরো বিনোদন জগতই দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত জায়গায়, যেন ভবিষ্যতের পথ স্পষ্ট নয়। বহু দশক ধরে হলিউডে শক্তিশালী কিছু নামই নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে সিনেমা, সিরিজ এবং টেলিভিশনের প্রধান পরিসর। কিন্তু স্ট্রিমিং যুগ সেই চিত্র পাল্টে দিয়েছে। নেটফ্লিইক্স (Netflix) এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে। আর এখন, ওয়ার্নার ব্রাদার ডিসকভারি (Warner Bros. Discovery) কেনার ঘোষণা সেই পরিবর্তনকে আরও জটিল করেছে। এইচ (HBO), এইচবিও মেক্স (HBO Max), ওয়ার্নার (Warner)-এর ফিল্ম ও টিভি ডিভিশন সব মিলিয়ে প্রায় সাত দশমিক দুই ট্রিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বিনোদন শিল্পের ক্ষমতার মানচিত্র আমূল বদলে যেতে পারে।

চুক্তি ঘোষণার পর তা নিয়ে যেমন বিশাল আলোড়ন উঠেছে, তেমনি তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা গিয়েছে। খবর এসেছে, নেটফ্লিকসের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর ওরাসেল (Oracle)-এর প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন (Larry Ellison) সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে জানান, এই একত্রীকরণ যদি কার্যকর হয়, তাহলে বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর দাবি, নেটফ্লিক্সের আকার এমনিতেই অনেক বড়; তার সঙ্গে ওয়ার্নার ব্রাদার যুক্ত হলে পুরো বাজার একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অতিরিক্ত ঝুঁকে যাবে। এদিকে হোয়াইট হাউসের ভেতর কথা চলছে, ট্রাম্প এই চুক্তি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে পর্যালোচনা করতে চান, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সরাসরি করার কথা নয়।

কিন্তু উত্তেজনা এখানেই শেষ নয়। নেটফ্লিক্সের প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই প্যারামাউন্ট (Paramount) একটি পাল্টা দর নিয়ে সামনে আসে। তাদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, ওয়ার্নার ব্রাদার ডিসকভারির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য তাদের অফার আরও লাভজনক। কারণ, তাদের প্রস্তাবে অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি, মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় আঠারো বিলিয়ন ডলার বেশি। প্যারামাউন্ট দাবি করছে, তাদের প্রস্তাব বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতেও তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।

আরও পড়ুন

The Kandahar Hijack: নেটফ্লিক্সকে তলব কেন্দ্রের! কেন এই ওয়েব সিরিজ ঘিরে চরম বিতর্ক?

প্যারামাউন্ট আরও বলেছে, যদি দুই প্রতিষ্ঠানের সংযুক্তি ঘটে, তাহলে হলিউডে সৃজনশীল মানুষের কাজ বাড়বে, সিনেমা হলের ব্যবসা আরও বড় হবে এবং দর্শকরা বৈচিত্র্যময় কনটেন্ট দেখার সুযোগ পাবেন। তাদের সিইও ডেভিড এলিসন মনে করেন, ওয়ার্নার ব্রাদার আর প্যারামাউন্ট একত্রিত হলে একটি বৃহত্তর, সক্ষম, ফিউচার-রেডি স্টুডিও গড়ে উঠবে, যা ডিসনি (Disney)-কেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টেনে আনবে। প্যারামাউন্ট-এর প্রস্তাবে ওয়ার্নারের কেবল নেটওয়ার্ক, টেলিভিশন বিভাগ সবই রয়েছে। অন্যদিকে নেটফ্লিক্স শুধুমাত্র ওয়ার্নার ব্রাদারের স্টুডিও, এইচবিও এবং এইচবিও মেক্সকেই তাদের পরিকল্পনায় রেখেছিল।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, Paramount-এর প্রস্তাবে নতুন আরেকটি সংকট দেখা দিতে পারে। কারণ, এতে দু’টি বিশাল টিভি অপারেটর এক ছাদের নিচে চলে আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছেন, এ রকম হলে মার্কিন নাগরিকরা টেলিভিশনে যা দেখবেন, তার বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণ করবে একটি কোম্পানি। এতে সংবাদ, বিনোদন এবং রাজনৈতিক বয়ান পর্যন্ত এক হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। যদি প্যারামাউন্ট সফল হয়, তবে তারা ডিসনির চেয়েও বড় টিভি নেটওয়ার্ক হয়ে উঠবে, যা টেলিভিশন বাজারকে একচেটিয়া করে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

একই সঙ্গে প্যারামাউন্ট-এর অফার নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, এতে বিনিয়োগ করছে কুশনার-সম্পর্কিত অ্যাফিনিটি পার্টনার্স, সৌদি আরব, কাতার এবং আবুধাবির সার্বভৌম সম্পদ তহবিল। অর্থাৎ, পুরো চুক্তির পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন সরাসরি বলেছেন, ট্রাম্পের আপনজন এবং বিদেশি তহবিল মিলিয়ে তৈরি এই অফার 'মারাত্মক অ্যান্টিট্রাস্ট ঝুঁকি' তৈরি করছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণেই এই দর তোলা হয়েছে এবং এতে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও উঠতে পারে।

উভয় পক্ষের চুক্তির মধ্যে আরেকটি বড় আর্থিক হিসাব আছে, যদি ওয়ার্নার ব্রাদার প্যারামাউন্ট-এর প্রস্তাব নেয়, তাহলে নেটফ্লিক্সকে দিতে হবে বিশাল পরিমাণ বিচ্ছেদ-ফি, যা প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার। আবার নেটফ্লিক্সের দিক থেকে চুক্তি ভেঙে গেলে তাদের জরিমানা হতে পারে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মতো। ফলে কোন দিক বেছে নিলে প্রতিষ্ঠানটি বেশি লাভবান হবে, তা নিয়েও ওয়ার্নার ব্রাদার বোর্ড ভেতরে ভেতরে চাপে।

নেটফ্লিক্সের সহ-সিইও টেড সারান্ডোস অবশ্য আত্মবিশ্বাসী। তিনি দাবি করেছেন, প্যারামাউন্ট-এর বাড়তি দরের পেছনে কেবল ‘গিমিক’ আছে, এটা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, প্যারামাউন্ট যে ছয় বিলিয়ন ডলারের ‘সিনার্জি’ বা একত্রীকরণের সুবিধার কথা বলছে, তা কোথা থেকে আসবে? তাঁর মতে, এর অর্থ প্রতিষ্ঠানটি কর্মী ছাঁটাই করতে পারে। নেটফ্লিক্স বলছে, তারা চাকরি বাড়াতে চায়, কমাতে নয়। এই বক্তব্য আবার শ্রমিক ইউনিয়নগুলির সমর্থন জোগাড় করারই ইঙ্গিত দেয়।

এদিকে প্যারামাউন্ট এর আগেও ওয়ার্নারকে ছয়বার অফার পাঠিয়েছে, কিন্তু তাদের অভিযোগ, ওয়ার্নার ব্রাদার নাকি আগাগোড়া নেটফ্লিক্সের দিকেই ঝুঁকে ছিল। একটি পর্যায়ে ওয়ার্নারের ব্যবস্থাপনা নেটফ্লিক্স চুক্তিকে 'স্ল্যাম ডাঙ্ক' বা নিশ্চিত বিজয় বলে অভিহিত করেছিল বলেও খবর বেরিয়েছে। প্যারামাউন্ট অভিযোগ করেছে, বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াই স্বচ্ছ ছিল না।

আরও পড়ুন

আমাজন-নেটফ্লিক্স থেকে রাতারাতি ৪০০ কোটির বরাত! অনুষ্কা শর্মা লক্ষ্মীলাভের রহস্যটা কী

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন জটিল এবং বহুমুখী। ওয়ার্নার ব্রাদার আসলে কোন দিক বেছে নেবে তা শুধু আর্থিক লাভ দিয়ে নয়, রাজনীতি, বাজার-নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, সাংস্কৃতিক প্রভাব সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হবে। বিশ্লেষকদের মত, এই লড়াই দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। উভয় পক্ষই তাদের অবস্থান আরও শক্ত করবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিও গভীরভাবে পরীক্ষা করবে স্ট্রিমিং ও টিভি বাজারের ভবিষ্যৎ কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে দর্শক, কর্মী এবং শিল্প— কার লাভ, কার ক্ষতি।

এদিকে বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। প্যারামাউন্ট এবং ওয়ার্নারের শেয়ারদর চুক্তি–আলোচনার খবর বের হওয়ার পর হঠাৎই বেড়ে গিয়েছে। নেটফ্লিক্সের শেয়ারে উল্টো চাপ পড়েছে। বিনিয়োগকারীরা বুঝছেন, চুক্তিটি অনিশ্চয়তায় ভরা আর সেই অনিশ্চয়তা নেটফ্লিক্সের অবস্থানকে তুলনামূলক দুর্বল করে দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কী হবে? নেটফ্লিক্সের একতরফা স্ট্রিমিং সাম্রাজ্য কি তৈরি হবে? নাকি Paramount-এর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ-সমর্থিত দর শেষ পর্যন্ত ওয়ার্নারের মন জয় করবে? শিল্পের ভেতরকার বিতর্ক, রাজনীতির চাপ, আইনগত বাধা সব মিলিয়ে এই ঘটনাটি শুধু একটি ব্যবসায়িক অধিগ্রহণের গল্প নয়। এটি একটি পরীক্ষামূলক মুহূর্ত যে বিনোদন শিল্প ভবিষ্যতে কতটা গণতান্ত্রিক থাকবে, শিল্পীর সৃজনশীল স্বাধীনতা কোথায় দাঁড়াবে এবং দর্শক আসলে কোন ধরনের কনটেন্ট পাবে, সব কিছুর ওপর যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে থাকবে।

More Articles