চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল: যে অসাধ্যসাধন করে পুরস্কৃত হলেন ত্রয়ী

2025 Nobel Prize in Medicine: এর মাধ্যমে মানব শরীর নিজস্ব উপাদান এবং ক্ষতিকারক নয় এমন বহিরাগত উপাদানের বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত বা অতিরিক্ত প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া যাতে না শুরু হয় সে জন্য বাধা দেয়।

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল: যে অসাধ্যসাধন করে পুরস্কৃত হলেন ত্রয়ী

আজ নোবেল কমিটি এ বছরের প্রথম নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করল। এ বছর চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্বে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারি ই ব্রুঙ্কো, ফ্রেড র‌্যাম্‌সডেল এবং শিমন সাকাগুচি। পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স নিয়ে গবেষণার জন্য তাঁদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়। সোজা কথায় আমাদের শরীরের নিজস্ব রোগ-প্রতিরোধের একটি প্রক্রিয়া হলো এই পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স। এর মাধ্যমে মানব শরীর নিজস্ব উপাদান এবং ক্ষতিকারক নয় এমন বহিরাগত উপাদানের বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত বা অতিরিক্ত প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া যাতে না শুরু হয় সে জন্য বাধা দেয়।

ঠিক কী করেছেন দুই মার্কিন ও এক জাপানি বিজ্ঞানী, এবং তাঁদের কাজ কোন রোগের চিকিৎসায় কীভাবে করবে, সে বিষয়ে আমরা জানার চেষ্টা করি।

আমাদের প্রত্যেকের শরীরে একটি শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে, যেটি কেবল বাইরের ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে না, মানবদেহের কোন কোষগুলিতে আদৌ আক্রমণ করা উচিত নয়, সে সম্বন্ধে সম‍্যক ধারণা রাখে। প্রতিদিন আমরা বিভিন্ন রকম জীবাণুর সংস্পর্শে আসি, যেগুলি আবার সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে মাঝে মাঝে এমন রুপ ধারণ করে, যে তাকে চেনা দুষ্কর; অনেক সময় তো এরা মানব শরীরের কোনো না কোনো কোষের রুপে সামনে এসে হাজির হয়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাজটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যদি কোনোভাবে সে শরীরের সুস্থ কোষগুলি শনাক্তকরণে ব্যর্থ হয় , তখন আমরা অটো-ইমিউন রোগে আক্রান্ত হই। এছাড়াও, বর্তমানে দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় স্টেম সেল (বা অস্থি মজ্জা) খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখে; প্রতিনিয়ত এর প্রয়োগ বেড়েই চলেছে, সেক্ষেত্রে, নতুন প্রতিস্থাপিত কোষগুলিকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তাঁর আবিষ্কারেই বিশ্বজয় বিজ্ঞানীদের! কেন নোবেল পেলেন না সত্যেন্দ্রনাথ?

Centenary of Boson Particle: অজানা, অচেনা এক বিজ্ঞানীর কাছ থেকে পত্র পেয়ে আইনস্টাইন বিব্রত হননি, বরং অভিভূত হয়েছিলেন সত্যেন বোসের চিন্তা করার ধরন দেখে

সুতরাং, ইমিউন সিস্টেম কীভাবে কাজ করবে, আরও পরিস্কারভাবে বললে কীভাবে সে সংকেত পাবে যে কাকে আক্রমণ করতে হবে না-তা বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইমিউন সিস্টেমের অন‍্যতম হাতিয়ার T-কোষ। সহায়ক T-কোষগুলি সারাক্ষণ মানব শরীরে পায়চারি করে, কোনো বিপদের আশঙ্কা দেখলেই এটি ইমিউন সিস্টেমকে সতর্ক করে, তখন ঘাতক T-কোষগুলি ভাইরাস বা অন্য কোনো প্যাথোজেনকে আক্রমণ করে।

আগে মনে করা হত, আমাদের বুকের উপরিভাগে অবস্থিত থাইমাস গ্ল্যন্ড ঠিক করে যে ইমিউন সিস্টেম কীভাবে কাজ করবে। এই গ্ল্যন্ডটি শিশুদের মধ্যে বিশেষভাবে সক্রিয়। T-কোষগুলি থাইমাসে ভ্রমণ করে। যদি আমাদের নিজস্ব কোষকে আক্রমণ করতে দেখা যায় ওই সেম সাইড গোল আর কি, থাইমাস তাদেরকে আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশতে দেয় না । সুতরাং, থাইমাসের মধ্য T-কোষগুলির ঘুরে বেড়ানো আদতে এক ধরনের পরীক্ষা, যেটি শরীরে সুরক্ষার কাজে সাহায্য করে।

তিনজন বিজ্ঞানী জটিল এই শরীরবৃত্তীয় কার্যকলাপের বিস্তৃত ব‍্যাখ‍্যা দেন, এবং তাঁরা এই নিয়ন্ত্রণকারি T-কোষগুলিকে চিহ্নিত করেন, ফলে গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নোবেলজয়ীদের সোনালি পোর্ট্রেটের নেপথ্যনায়ক! চেনেন এই গুণী শিল্পীকে?

Niklas Elmehed: নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গত বারো বছর ধরে জুড়ে রয়েছেন তিনি। হয়ে উঠেছেন অজানা, অচেনা এক তারকা, যার তুলির টানে আশ্চর্য মায়াবী হয়ে বিশ্বের কাছে ধরা দেন প্রত্যেক নোবেলজয়ী।

৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, সাকাগুচি প্রচলিত বিশ্বাসকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দাবি করেন যে কিছু বিশেষ ধরণের T-কোষ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার "নিরাপত্তা রক্ষী" হিসাবে কাজ করে, মূলত তারাই অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দমন করে। তিনি বেশ কিছু ইঁদুর নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন যাদের শরীরে থাইমাস নেই, এবং T-কোষগুলিতে পরে তাদের দেহে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। তিনি T-কোষের একটি শ্রেণী চিহ্নিত করেছিলেন যাদের কাজ হলো অতিমাত্রায় উদ্দীপ্ত কোষগুলিকে শান্ত করার বার্তা দেওয়া, যেগুলিকে বলা হয় নিয়ন্ত্রক T-কোষ। কিন্তু এই পরীক্ষার ফলাফল বিজ্ঞানী মহলে বিশেষ আলোড়ন তৈরি করতে পারেনি।

অপরদিকে দুই মার্কিন বিজ্ঞানী, ব্রানকো এবং র্যামসডেল অসুস্থ পুরুষ ইঁদুর নিয়ে তখন পরীক্ষা করছিলেন। সেই পরীক্ষায় দেখা যায় অটোইমিউন রোগ FOXP3 জিনের মিউটেশনের কারণে হয়। তার কয়েক বছরের মধ্যেই এটি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, এই FOXP3 জিন নিয়ন্ত্রক T-কোষের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে, যার অস্তিত্ব সাকাগুচি আগেই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কয়েক দশক ধরে করা তাঁদের এই সমন্বিত কাজই এবার নোবেল নিয়ে এসেছে।

এখন কথা হলো চিকিৎসাক্ষেত্রে এই আবিষ্কারের কিভাবে ছাপ রাখবে?

নিয়ন্ত্রক T-কোষে ও FOXP3 জিন সম্পর্কিত এই আবিষ্কার মানব শরীরের প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত গবেষণায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। ক্যান্সারের টিউমারগুলি প্রায়শই অনেক নিয়ন্ত্রক T-কোষ দ্বারা বেষ্টিত থাকে, যা তাদের ইমিউন আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এই "সুরক্ষামূলক প্রাচীর" কীভাবে ভেঙে ফেলা যায় গবেষকরা তা খতিয়ে দেখছেন, যাতে ইমিউন সিস্টেম ক্যান্সারযুক্ত কোষগুলির কাছে আরও ভালভাবে পৌঁছতে এবং নির্মূল করতে পারে। আবার অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রে বাঁচার উপায় হলো নিয়ন্ত্রক T-কোষগুলির সংখ্যা বৃদ্ধি করা, যাতে তারা আক্রমণকারী কোষগুলিকে শরীরকে ধ্বংস করা থেকে বিরত রাখতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে, তাঁদের কাজের উপর ভিত্তি করে অদূর ভবিষ্যতে এমন সব গবেষণা হবে যে অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও অটো ইমিউন রোগের চিকিৎসার দুয়ার খুলে যাবে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।