কে হবেন রাষ্ট্রপতি! বিরোধী ঐক্যের সর্পছিদ্রই বিজেপির পোয়াবারো?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সহমতের ভিত্তিতে বিরোধী প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজটি খুবই কঠিন। তবুও ২০২৪-এর দিকে তাকিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালাতে চান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের ঐক্যবদ্ধ চেহারা তুলে ধরতে বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে ২২টি বিরোধী দল বৈঠকে বসছে। এই বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এনডিএ বা বিজেপি-র তরফে কোনও নাম ঘোষণা না হলেও জল্পনায় রয়েছে একাধিক নাম। তবে শেষ মুহূর্তে অনেককে টপকে সামনে এসেছে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নাম। সবকিছু ঠিক থাকলে রাজনাথ সিং-ই রাষ্ট্রপতি পদে এনডিএ তথা বিজেপির প্রার্থী হতে চলেছেন বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

এদিকে, জাতীয় রাজনীতির প্রবীণতম চরিত্র শরদ পাওয়ার প্রার্থী হোন, এমনটাই চান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কংগ্রেস সূত্রে খবর, সোনিয়া গান্ধীরও এই নামে আপত্তি নেই। কংগ্রেসের মল্লিকার্জুন খাড়গে ইতিমধ্যেই পাওয়ারের সঙ্গে কথাও বলেছেন। ফলে জোর জল্পনা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার লড়াই হতে পারে এনডিএ-র রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বিরোধী শিবিরের শরদ পাওয়ারের।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শেষ হাসি হাসবে বিজেপি-বিরোধীরা? যে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে

তবে এটাও ঠিক, চেষ্টা চললেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সহমতের ভিত্তিতে বিরোধী প্রার্থী চূড়ান্ত করা কার্যত অসম্ভব। নাম একটা ঘোষণা হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু তার পিছনে নিশ্চিতভাবেই লুকোনো থাকবে হরেক শর্ত। বিরোধী দলগুলি একক বা যৌথ বিবৃতি দেওয়ার সময় বিজেপি-বিরোধিতার প্রশ্নে তাদের ঐক্যবদ্ধ চেহারা তুলে ধরলেও যে কোনও বড় ইস্যু সামনে এলেই প্রকট হয়, ওই ঐক্য নেহাতই 'কসমেটিক'।

তবে রাজনীতিতে এমন হওয়া বিচিত্র কিছুই নয়। দেশে এই মুহূর্তে আঞ্চলিক দলগুলির রমরমা। প্রায় ৫০ শতাংশ রাজ্যে চলছে আঞ্চলিক দলের শাসন। এই দলগুলি তৈরি হওয়ার ইতিহাস খতিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়, এক একটি দল এক এক কারণে তৈরি হয়েছে। সব আঞ্চলিক দলই যে বিজেপি বা কংগ্রেস-বিরোধী, এমন নয়। নানা সময় এরা কখনও বিজেপি কখনও বা কংগ্রেসের সঙ্গে পথ হেঁটেছে। আঞ্চলিক দলগুলির স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। যখন যেমন প্রয়োজন, তখন তেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সেই সিদ্ধান্তকে জাস্টিফাই করতে সেই সময় যে যুক্তি দেয়, তা ওই একই দলের পূর্ববর্তী ঘোষিত নীতির ঠিক উল্টো। অতীতে বারবার দেখা গিয়েছে, দেশের আঞ্চলিক দলগুলি নীতি-আদর্শের সুদৃশ্য মোড়কে সুবিধে অনুসারে নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলে। এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে খুব সহজে বিরোধীরা একমত হবেন বলে রাজনৈতিক মহল মনে করে না। এবং এটাও নিশ্চিতভাবেই দেখা যাবে, সহমত না হলে বিরোধী দলগুলি প্রকাশ্যে একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে। এমন পরিণতির অপেক্ষাতেই রয়েছে বিজেপি। তবু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সহমতের ভিত্তিতে বিরোধী প্রার্থী চূড়ান্ত করার একটা চেষ্টা থাকা জরুরি।

ওদিকে, সদ্য-সমাপ্ত রাজ্যসভা ভোটে বিরোধীদের ছন্নছাড়া পরিস্থিতি ফের প্রকট হয়েছে। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা- কংগ্রেস-এনসিপি-র ‘মহা বিকাশ আগড়ি’ জোটকে জোর ধাক্কা দিয়ে মোট ৬টি আসনের মধ্যে ৩টিই জিতে নিয়েছে বিজেপি। অথচ মহারাষ্ট্রে এখন ওই ৩ দলের জোটই সরকার চালাচ্ছে৷ খোদ মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরের দল শিবসেনা দু’জন প্রার্থী দাঁড় করিয়ে একটিমাত্র আসন জিততে পেরেছে। সব বিধায়কের ভোট জোগাড় করতে না পারায় মহারাষ্ট্রের কংগ্রেস, এনসিপি একটি করে আসন জিতেছে। ওদিকে কংগ্রেস এবং জেডিএস-এর মধ্যে ন্যূনতম সমন্বয়ের অভাবে কর্নাটকেও ৪টির মধ্যে ৩টি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে রাজ্যসভার ভোট মিটতেই মহারাষ্ট্র সরকারের অন্দরে কাজিয়া তুঙ্গে উঠেছে। পরিস্থিতি এমনই, শিবসেনা-কংগ্রেস-এনসিপি-র ‘মহা বিকাশ আগড়ি’ জোট ভেঙেও যেতে পারে। জোটের পতন রুখতে মরিয়া হয়ে আসরে নেমেছেন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে এবং প্রবীণ শরদ পাওয়ার। ২০১৯ সালে আগড়ি-জোট মহারাষ্ট্রে সরকার গড়েছে। আড়াই বছরের মধ্যেই সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তুঙ্গে। একদিকে মহারাষ্ট্রের কংগ্রেস মন্ত্রীরা দলের হাই কমান্ডের কাছে অভিযোগ করেছেন, এনসিপি ও শিবসেনা তাদের উপযুক্ত মর্যাদা দিচ্ছে না। ওদিকে মুখ্যমন্ত্রী পদ দখলের আওয়াজ তুলেছে এনসিপি। দিনকয়েক আগে এনসিপির মন্ত্রী ধনঞ্জয় মুন্ডে বলেছেন, "মহারাষ্ট্রে পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী এনসিপি-র কেউ হবেন।" এই বক্তব্য সমর্থন করেছেন এনসিপি প্রধান শরদ পাওয়ারের মেয়ে সুপ্রিয়া সুলে। যদিও এই সংকট কাটাতে এনসিপি-র প্রবীণ নেতা এবং মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিলীপ ওয়ালসে পাতিল স্পষ্ট জানিয়েছেন, "মুখ্যমন্ত্রী বদলের প্রশ্নই নেই। পুরো পাঁচ বছর উদ্ধব ঠাকরেই মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন।" সমস্যা হয়তো আপাতত মিটবে, কিন্তু এই ইস্যুতে জোটে ফাটল লেগেই গিয়েছে৷ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে হাতিয়ার করে বিজেপি মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন করে সুড়সুড়ি দিতে নামলে কী হবে, বলা মুশকিল৷ এই মুহূর্তে বিরোধী শিবিরের অন্যতম দুর্গ মহারাষ্ট্র দখল করতে পারলে বিজেপি-র শক্তি নিশ্চিতভাবেই বৃদ্ধি পাবে।

ওদিকে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে আগামী ১৮ জুলাই। ফল ঘোষণা হবে ২১ জুলাই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের সর্বসম্মত প্রার্থী স্থির করতে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের ও মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি লিখেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীদের একজোট করতে উদ্যোগ নিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। এই ইস্যুতে বিরোধী নেতা-নেত্রীদের নিয়ে আগামী ১৫ জুন দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বৈঠক ডেকেছেন তিনি। ওই চিঠিতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, দেশের গণতন্ত্রের এই বিপদের সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে সমস্ত প্রগতিশীল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির জোট বাঁধা উচিত।

এই চিঠি পাঠানো হয়েছে সোনিয়া গান্ধী, উদ্ধব ঠাকরে, নবীন পট্টনায়েক, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পিনারাই বিজয়ন, এমকে স্ট্যালিন-সহ মোট ২২ জন বিরোধী নেতানেত্রীকে। যদিও সোনিয়া গান্ধী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সঙ্গে জানা গিয়েছে, উদ্ধব ঠাকরে এই বৈঠকে হাজির থাকছেন না। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, তিনি সেদিন গোয়া-য় থাকবেন অন্য কাজে। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, উদ্ধব ঠাকরে কারণ যাই-ই দেখান, মহারাষ্ট্র সরকারের অন্দরে সম্প্রতি শরিকদের মধ্যে যে বিতর্ক চলছে, সেই কারণেও কনস্টিটিউশন ক্লাবের বৈঠক এড়িয়ে যেতে পারেন ঠাকরে।

মহারাষ্ট্র, কর্নাটকে রাজ্যসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক শিবিরে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে, রাজ্যসভা নির্বাচনেই যখন বিরোধী শিবির এককাট্টা হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে পারেনি, সেখানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কীভাবে তারা এক হয়ে লড়বে? অথচ, এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে ২০২৪-এর লোকসভা দখলের লড়াইয়ে অনেকটাই এগিয়ে যাবে নরেন্দ্র মোদির দল। এই আশঙ্কার কথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায় রয়েছে বলেই তিনি এতখানি ঝুঁকি নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছেন। এখন যদি অন্য কোনও বিরোধী দল আলাদাভাবে প্রার্থী দিতে চেষ্টা করে, তাহলে বিজেপিকে অনেকটাই সুবিধা করে দেওয়া হবে। আপাতত সবার নজরে এখন ১৫ জুনের বিরোধী-বৈঠক।

More Articles

;