পালাতে বাধ্য হয়েছেন রাষ্ট্রপতি, জ্বলছে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি! কেন এমন হল শ্রীলঙ্কায়?

শুধুমাত্র গোটাবায়া ব্র্যান্ডের উপরে ভরসা করে নয়, সঠিকভাবে কাজ করতে হবে শ্রীলঙ্কা সরকারকে। বৃদ্ধি করতে হবে করের হার।

Sourish Das
৮ মিনিট
পালাতে বাধ্য হয়েছেন রাষ্ট্রপতি, জ্বলছে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি! কেন এমন হল শ্রীলঙ্কায়?

ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের দরুন নজিরবিহীন বিক্ষোভ শুরু হয়েছে ভারতের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায়। শ্রীলঙ্কার রাজপথে নেমেছেন কাতারে কাতারে মানুষ। দুর্দশার সম্পূর্ণ দায় শাসক রাজাপক্ষে পরিবারের উপরে চাপাতে চাইছেন বিক্ষোভকারীরা। একদিকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, অন্যদিকে আবার খাদ্যপণ্য, ওষুধ এবং জ্বালানির অভাব রীতিমতো গ্রাস করেছে শ্রীলঙ্কাকে। তার মধ্যেই বিক্ষোভের মুখে সোমবার পদত্যাগ করেছেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে। বিক্ষোভ এবং সহিংসতা সামাল দেবার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেরকমটা কিছুই হয়নি। একের পর এক ঘটনায় রাজাপক্ষে পরিবারের ওপর ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের।

কোথায় কোথায় প্রতিবাদ হয়েছে?

গত মার্চ মাস থেকেই ২২ মিলিয়ন জনসংখ্যার এই দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, কারণ সেই সময় থেকেই অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে শুরু করেছিল শ্রীলঙ্কার সাধারণ জনতা। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছিল, অব্যবস্থা এবং ব্যাপক দুর্নীতি রীতিমতো শ্রীলঙ্কাকে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। জরুরি অবস্থা জারি থাকা সত্ত্বেও অনেকেই প্রাথমিকভাবে রাস্তায় নেমে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সরকার তৎক্ষণাৎ বিক্ষোভকে বেআইনি বলে ঘোষণা করে এবং তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু, পরিস্থিতি আরও বদলে যায় এপ্রিল মাসে।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষে সারাদেশে পরিচিত হতেন 'গোটা' হিসেবে। আর সেই দেশের রাজধানীতেই তাঁর বিরুদ্ধে এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে স্থাপন করা হয় বিশাল প্রতিবাদ শিবির। 'গোটা গো হোম' স্লোগান গুঞ্জরিত হতে থাকে সারা শ্রীলঙ্কায়। তাঁর পদত্যাগ করার দাবি জানিয়ে প্রতিদিন ভিড় জমাতে থাকেন লাখো লাখো সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা সরকার। এপ্রিল মাসেই প্রথমবারের জন্য শ্রীলঙ্কায় মৃত্যু হয় একজন বিক্ষোভকারীর। কলম্বো থেকে ৫০ মাইল দূরে ছোট্ট একটি শহর রামবুক্কানায় পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় ওই যুবকের।

কিন্তু জনগণের বিক্ষোভকে কোনওভাবেই থামানো যায়নি। রাজাপক্ষে পরিবারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসতে থাকায় বিক্ষোভকারীদের 'শায়েস্তা' করার পরিকল্পনা আঁটতে শুরু করে সরকারের সমর্থকরা। ৯ মে বিক্ষোভ হয়ে ওঠে সহিংস। সরকারের কট্টরপন্থী সর্মথকরা লোহার রড, বাঁশ, এবং আরও কিছু অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে বিক্ষোভকারীদের ওপর। কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটিয়ে, জলকামান চালিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও দুই শতাধিক সাধারণ মানুষ আহত হন ওই আক্রমণে। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা শ্রীলঙ্কা। শাসক দলের দুই সাংসদের বিরুদ্ধে ওঠে বিক্ষোভ মিছিলে গুলি চালানোর অভিযোগ। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজাপক্ষ সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও সাংসদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আক্রমণ করা হয় সাংসদদের। বিক্ষোভকারীদের আক্রমণে একজন সাংসদের মৃত্যু পর্যন্ত হয় শ্রীলঙ্কায়। এমনকী, আক্রমণ করা হয় শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষের বাড়িতেও। তাঁর বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির চাপে পড়ে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীরকম?

এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতিও রীতিমতো টালমাটাল। সরকারের বিরুদ্ধে অস্থিরতা এবং অসন্তোষের কারণে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও শ্রীলঙ্কার পুরো মন্ত্রিসভা এই সপ্তাহে তাঁদের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। শাসক পরিবারের অর্থনৈতিক পরিচালনা নিয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছিল গত নির্বাচনের আগে থেকেই। এই অবস্থায় গত লোকসভা নির্বাচনে শ্রীলঙ্কায় একটি জোট সরকার গঠন করার চেষ্টা করেছিলেন গোটাবায়া রাজাপক্ষে। কিন্তু, শপথ নেওয়ার মাত্র একদিনের মধ্যেই নতুন অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ রাজাপক্ষে সরকারকে নতুন সমস্যার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।

১০ মে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করেন। বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা ক্ষমতাসীন জোট থেকে বেরিয়ে এসে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেন বর্তমান সরকারের। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, রাজাপক্ষে পরিবারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বছরের পর বছর ধরে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে একেবারে কুরে কুরে খেয়েছে। আর সেই অব্যবস্থার ফল পাওয়া যাচ্ছে এখন।

রাজাপক্ষে পরিবারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কেন?

শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষে পরিবার বহু বছর ধরে ক্ষমতাসীন রয়েছে। প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষে শ্রীলঙ্কায় 'টার্মিনেটর' হিসেবে পরিচিত। তিনি শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান ছিলেন। তামিল গেরিলা আক্রমণকারীদের পরাস্ত করতে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। পরে তিনি টার্মিনেটর উপাধি লাভ করেন নিজের পরিবারের কাছ থেকেই। শ্রীলঙ্কায় বর্তমানে রাজাপক্ষে রীতিমতো একটি ব্র্যান্ড হিসেবে সামনে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য রাজাপক্ষে ব্র্যান্ড অনেকটাই দায়ী। তবে তাঁদের উত্তরসূরিদের এই একই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভূস্বর্গের ভয়াবহতাকে লেন্সে ধ‍রেছেন বারবার, চেনেন এই কাশ্মীরি নারীকে?

কাশ্মীরের বাসিন্দাদের জন্য একাধিকবার সোচ্চার হয়েছেন তিনি। সরকারের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলে সত্যের হয়ে সওয়াল করেছেন বহুবার।

কিন্তু, গোটাবায়া রাজাপক্ষে একেবারেই ধোয়া তুলসীপাতা চরিত্রের মানুষ নন। এর আগে তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের লোকজনকে গুম করার জন্য ডেথ স্কোয়াড তৈরি করার অভিযোগ উঠেছিল। যদিও তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। ২০১৯ সালে গোটাবায়া যখন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি হাতে পান। সেই সময় সন্ত্রাসী হামলা এবং রাজনৈতিক সংকট শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির ওপরে মারাত্মক আঘাত হানে। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরেই দ্রুত কাজে নেমে পড়েন গোটাবায়া। বিভিন্ন খাতে করে ছাড় দেওয়ার পাশাপাশি বাজারে নগদ অর্থ ছাড়তে শুরু করেন তিনি। এতে একদিকে যেমন বৃদ্ধি পায় মুদ্রাস্ফীতি, তেমনই কিন্তু কমে যায় কর আদায়। বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ে। শ্রীলঙ্কার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন গোটাবায়া রাজাপক্ষে।

রাজাপক্ষে পরিবার কেন প্রাইম টার্গেট?

রাজাপক্ষে পরিবারের প্রধান ক্যারিশমেটিক নেতা কিন্তু ছিলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। তিনি সম্পর্কে গোটাবায়া রাজাপক্ষের দাদা। এর আগে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। এরপর ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। তিন বছর আগে ২০১৯ সালে গোটাবায়া রাজাপক্ষে আবার দ্বিতীয়বার তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন।

মাহিন্দা রাজাপক্ষের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক অভিযোগ। ২০০৯ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল বিদ্রোহীদের দমনে নৃশংস সামরিক পন্থা গ্রহণ করেছিলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। প্রায় এক দশকের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছিল মাহিন্দা রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গৃহযুদ্ধের শেষদিকে কথিত গুলিবর্ষণ নিষিদ্ধ এলাকায় পর্যন্ত অসামরিক নাগরিকদের নৃশংসভাবে বোমা মেরে হত্যা করেছিলেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। সেই আক্রমণে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ৪০ হাজার সাধারণ মানুষের। মাহিন্দা রাজাপক্ষে সেই সময় ওই নিহতের সংখ্যা অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক মহলে তার বিরুদ্ধে একাধিক কথা উঠতে শুরু করে।

মাহিন্দা রাজাপক্ষের আমলে শ্রীলঙ্কা আরও বেশি চিন-ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। চিনের থেকে অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি ঋণ গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা। দুর্নীতির কারণে অকার্যকর সম্পদে রূপান্তরিত হলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। সমালোচকদের মতে, গৃহযুদ্ধ শেষ হলেও মাহিন্দা রাজাপক্ষে শ্রীলঙ্কার ইলাম তামিলদের সঙ্গে বিভেদ দূর করতে তেমন কিছু করেননি। নিউ যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করতেও তামিল বিদ্রোহী সম্প্রদায়ের বাধা রয়েছে এবং পাশাপাশি তাদেরকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে গোটা শ্রীলঙ্কায়।

মাহিন্দা রাজাপক্ষের আমল থেকেই অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তাঁর ভাই বাসিল রাজাপক্ষে। একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বিবিসি-র একটি সাক্ষাৎকারে তাঁকে 'মিস্টার টেন পার্সেন্ট' হিসেবেও কটাক্ষ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি সমস্ত সরকারি চুক্তি থেকে ১০ করে কমিশন নিতেন। গোটাবায়া প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে বাসিলের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়। তবে গত এপ্রিলে বাসিলকে অর্থমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মাহিন্দা যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, সেই সময় পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন চামাল রাজাপক্ষে। তবে বর্তমান সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী তিনি। তাঁর ছেলে শশীন্দ্রর বিরুদ্ধে সার কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফলে, তাঁকেও মানুষজন খুব একটা বেশি পছন্দ করেন না। তবে এই রাজাপক্ষে পরিবারের ভবিষ্যৎ ছিলেন নামাল রাজাপক্ষে। তিনি আইনজীবী হিসেবে কাজ করলেও আদতে তিনি মাহিন্দা রাজাপক্ষের বড় ছেলে। একটা বড় সময় পর্যন্ত তিনি ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তবে এসব অভিযোগ যদিও অস্বীকার করেন নামাল।

অর্থনৈতিক মন্দা কতটা খারাপ জায়গায়?

বৈদেশিক মুদ্রার গুরুতর অভাব শ্রীলঙ্কার সুনীতির একেবারে কোমর ভেঙে দিয়েছে। পর্যটন ক্ষেত্র এবং রেমিটেন্স খাতে কোনওরকম আয় হচ্ছে না শ্রীলঙ্কার। তার ওপর রয়েছে ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণ। এই অবস্থায় শ্রীলঙ্কাজুড়ে শুরু হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অভাব। দুধের প্যাকেট থেকে শুরু করে মুরগির মাংস, জ্বালানি সবকিছুই বাড়ন্ত। এমনকী, ওষুধ কেনার মতো অবস্থাতেও নেই শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ। দিনের প্রায় পুরোটা সময় থাকতে হচ্ছে অন্ধকারে। ঘরে বসে করতে হচ্ছে অফিস। কাগজের অভাবেই নেই কোনও পত্রিকা। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা এবং ক্লাস সম্পূর্ণরূপে বন্ধ। তার মধ্যেই আবার মাসখানেক আগে শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষে।

জনরোষ সামাল দিতে জরুরি আইন ব্যবস্থা জারি করলেও তেমন কোনও লাভ হয়নি। ২০১৯-এর ইস্টার সানডে-তে মারাত্মক বোমা হামলার পর শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থার আহ্বান জানানো হয়। এই আইনে কোনও অভিযোগ বা অপরাধের প্রমাণ ছাড়াই মানুষকে আটক করার অনুমতি দেওয়া রয়েছে। অভিযোগ উঠেছিল, শ্রীলঙ্কার সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে চাইছে। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে আরও ক্ষেপে ওঠে সাধারণ মানুষ।

অর্থনৈতিক মন্দা কতটা খারাপ জায়গায়?

থিংক ট্যাংক-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০৭ সাল থেকেই রাজস্ব আসছে না, এরকম প্রকল্পে বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ করেছে শ্রীলঙ্কা। ২০১৯ সালে কর বিরতির কারণে এই সংকট আরও মাত্রাতিরিক্ত আকার ধারণ করে। স্বাধীনতার পর থেকে এ-পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। কোনও সরকার এ-ব্যাপারে কোনও তাগিদ গ্রহণ করেনি। গত দুই বছরে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব কমে যাওয়ায় ঋণের বোঝা অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে সরকারের ওপর। আর সেই সমস্ত ঋণের বোঝার চাপে পড়েছে শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ।

ইস্টার রবিবারের সন্ত্রাসী হামলা এবং ২০১৯-এর শেষের দিকে বড় আকারে কর কমানোর নীতি শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল। সূচক অনুযায়ী গত বছর নভেম্বর মাসের হিসেবে দেশে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বৈদেশিক রিজার্ভ ছিল, যা দিয়ে মাত্র এক মাস পর্যন্ত আমদানি বাণিজ্য চালাতে পারে। সেন্ট্রাল ব্যাংকের তরফ থেকে আভাস দেওয়া হয়েছে, পিপলস ব্যাঙ্ক অফ চিনের সঙ্গে চুক্তির পর ডিসেম্বরের শেষের দিকে শ্রীলঙ্কার রিজার্ভ বেড়ে ১৫০ কোটি বিলিয়ন ডলারে পৌঁছয়। কিন্তু তারপরেই হঠাৎ পতন হয় এই রিজার্ভের।

শ্রীলঙ্কার অবকাঠামোগত বিভিন্ন প্রকল্পে বাণিজ্যিক ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে চিন। অভিযোগ উঠেছে, এই ধরনের ফাটকা ঋণ নেওয়ার কারণে শ্রীলঙ্কা ঋণের ফাঁদে পড়ে গিয়েছে। তবে এই ঋণের ফাঁদের জন্য কেবল চিন দায়ী, সেটা বলা যাবে না। শ্রীলঙ্কার প্রায় অর্ধেক বিদেশি ঋণ পাওনা ছিল পুঁজিবাজারের কাছে। আর গত বছরের এপ্রিল মাসে চিনের কাছে পাওনা ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। তবে, চিনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার পরেও তেমনভাবে কাজে লাগাতে পারেনি গোটাবায়া সরকার। অ-রাজস্বখাতমূলক প্রকল্পে ব্যবহারের মাধ্যমেও এই ঋণকে কাজে লাগাতে পারেনি তারা।

বহির্বিশ্ব কি সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে?

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় যখন ক্রমাগত গোটাবায়া সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করেছিল, সেই সময় থেকেই বিষয়টার উপরে নজর রাখছে ইউনাইটেড নেশনস।ইতিমধ্যেই শ্রীলঙ্কায় ৬০ এর বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে এবং তাদেরকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গিয়ে তাদের উপরে অত্যাচার চালানো হচ্ছে। শ্রীলংকার বিরুদ্ধে এর আগেও আন্তর্জাতিক স্তর থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল। তাই যদি বেসামরিক সাধারন মানুষের উপর অত্যাচার বৃদ্ধি পায়, তাহলে ইউনাইটেড নেশনস হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের তরফ থেকে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বহির্বিশ্ব থেকে কি সাহায্য পেতে পারে শ্রীলঙ্কা?

এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কার যে আর্থিক অবস্থা, তারে এই দেশকে সাহায্য করার জন্য খুব কম দেশ এগিয়ে আসতে পারে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের কাছ থেকে ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কা ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জরুরি অবস্থাকালীন ঋণ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের তরফ থেকে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়া হবে বলে সূত্রের খবর।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। মোদি সরকারের তরফ থেকে ১.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছে শ্রীলঙ্কা সরকারকে। জানা যাচ্ছে, আগামী দিনে এবারে আরও ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিতে পারে মোদি সরকার। এছাড়াও শ্রীলঙ্কায় ভারতের তরফ থেকে পাঠানো হয়েছে জ্বালানি তেল এবং কিছু খাদ্যদ্রব্য।

ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড ওরফে আইএমএফ-এর থেকেও সাহায্য প্রার্থনা করছে শ্রীলঙ্কা। তবে আইএমএফ-এর থেকে ঋণ নিতে গেলে নীতিতে পরিবর্তন করতে হবে শ্রীলঙ্কা সরকারকে। আইএমএফের থেকে সরাসরি শর্ত আরোপ করে শ্রীলঙ্কা সরকারকে জানানো হয়েছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বৃদ্ধি করতে হবে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ। শুধুমাত্র গোটাবায়া ব্র্যান্ডের উপরে ভরসা করে নয়, সঠিকভাবে কাজ করতে হবে শ্রীলঙ্কা সরকারকে। বৃদ্ধি করতে হবে করের হার।

রাজাপক্ষে ব্র্যান্ড কার্যত 'শেষ'

রাজাপক্ষে পরিবারের বিরুদ্ধে একাধিকবার বিক্ষোভ এবং অভিযোগ উঠেছে গোটা শ্রীলঙ্কায়। এবারের অভিযোগের পরেই পদত্যাগ করেছেন মাহিন্দা রাজাপক্ষে। সম্ভাবনা আছে, এরপরে আর তিনি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হবেন না। তাঁর জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হতে চলেছেন রনিল বিক্রমাসিংহ। এই অবস্থায়, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের জন্য শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক দলগুলিকে দুই বছরের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা করতে হবে। নতুবা শ্রীলঙ্কাকে এই অবস্থা থেকে টেনে আনা খুব একটা সহজ কাজ হবে না।

লিখেছেন
Sourish Das
Sourish Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।