প্রার্থী খুঁজতে হিমশিম, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগেই প্রকাশ্যে বিজেপি-বিরোধী শিবিরের দেউলিয়া দশা

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীরা 'পাওয়ার প্লে'-র সুযোগ আগেই হারিয়েছেন। এখন যা পরিস্থিতি, তাতে হয়তো 'টস রাউন্ড'-এ গিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে বিজেপি-বিরোধী শিবিরকে।

বিরোধী পক্ষের অন্যতম স্তম্ভ দুই মুখ্যমন্ত্রী, মহারাষ্ট্রের উদ্ধব ঠাকরে এবং তামিলনাড়ুর এম.কে. স্ট্যালিনের দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থী নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। ওদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠক এড়িয়ে গিয়েছিলেন দেশের আরও পাঁচজন বিরোধী মুখ্যমন্ত্রী। এরা হলেন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াইএসআর কংগ্রেসের ওয়াই এস জগন্মোহন রেড্ডি, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আম আদমি পার্টি-র অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী বিজেডি-র নবীন পট্টনায়েক, তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী টিআরএস-এর কে চন্দ্রশেখর রাও এবং পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী আম আদমি পার্টি-র ভগবন্ত মান। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, এই পাঁচ মুখ্যমন্ত্রীর চারটি রাজনৈতিক দল বিরোধী জোটে সরাসরি শামিল হতে নারাজ৷ অন্যদিকে জোর জল্পনা, নবীন পট্টনায়েক এবং ওয়াই এস জগন্মোহনের দলের সমর্থন নিশ্চিত করে ফেলেছে বিজেপি বা এনডিএ‌।

দেখা যাচ্ছে, সরাসরি এনডিএ-তে যুক্ত না থাকা চারটি শাসক দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোন পক্ষকে সমর্থন করবে, তা এখনও ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়েছে। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, দেশের অ-বিজেপি সাত-সাত জন মুখ্যমন্ত্রী বিরোধী শিবিরের প্রার্থী নিয়ে হয় উদাসীন রয়েছেন অথবা আপত্তি জানিয়েছেন। বিরোধী শিবিরের পক্ষে এই সমীকরণ সুখকর নয়‌।

আরও পড়ুন: কে হবেন রাষ্ট্রপতি! বিরোধী ঐক্যের সর্পছিদ্রই বিজেপির পোয়াবারো?

এদিকে এই ইস্যুতে শোরগোল ফেলে দিয়েছে মহারাষ্ট্রের অন্যতম শাসক দল শিবসেনা। তাদের দলীয় মুখপত্র 'সামনা'-র সম্পাদকীয়তে যা বলা হয়েছে, তার নির্যাস, শরদ পাওয়ার প্রার্থী হতে রাজি না হওয়ায় বিরোধী পক্ষ যে দু'টি নাম নিয়ে নাড়াচাড়া করছে, সেই ফারুক আবদুল্লা এবং গোপালকৃষ্ণ গান্ধীতে প্রবল আপত্তি রয়েছে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার। 'সামনা'-য় বলা হয়েছে, "রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় এলেই এই দু'টি নাম উঠে আসে৷ কিন্তু এবারের নির্বাচনকে কঠিন লড়াইয়ের পরিণত করার মতো 'ব্যক্তিত্ব বা ওজন' তাদের নেই।" এখানেই শেষ নয়, আরও একধাপ এগিয়ে শিবসেনার মুখপত্রে রীতিমতো প্রশ্ন তোলা হয়েছে, "বিরোধীরা যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্যই একজন শক্তিশালী প্রার্থী দিতে না পারে, তাহলে আগামিদিনে একজন যোগ্য প্রধানমন্ত্রী কীভাবে দেবে? এ বিষয়ে লোকে প্রশ্ন তুলতেই পারে।" 'সামনা' লিখেছে, "আগামিকাল দেখা যাবে, প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য অনেক 'কনে' লাইনে দাঁড়াবে, কিন্তু এখন রাষ্ট্রপতি পদ চাই না"৷ শিবসেনার মুখপত্রর সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, "রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে একটি 'প্র্যাকটিস ম্যাচ'। বিরোধী দলগুলির এই নির্বাচনকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। কিন্তু যদি শেষ পর্যন্ত প্রার্থীর নামে সহমত না হওয়া যায়, তাহলে কে হবেন প্রার্থী? ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজ যদি ৬ মাস আগে করা যেত, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিরোধীদের আন্তরিকতায় গভীরতা রয়েছে বলেই মনে হত। এখন কিন্তু তেমনটা মনে হচ্ছে না। তবে এখনও সময় আছে।"

শুধুই শিবসেনা নয়, বিরোধী শিবিরের অপর শরিক ডিএমকে-ও এই দুই নামে খুব একটা রাজি নয়‌। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিনের দলের বক্তব্য, গোপালকৃষ্ণ গান্ধী উপযুক্ত প্রার্থী নন। বস্তুত, উঠে আসা দুই নামেই অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে ডিএমকে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই। ১৮ জুলাই ভোট, ২১ জুলাই ফলপ্রকাশ। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধীদের তৎপরতা ক্রমশই বাড়ছে। বিজেপি তথা এনডিএ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের আগেই৷ মোদি আগামী ২৬ জুন জার্মানি শুরু হওয়া জি-২৭ বৈঠকে যোগ দিতে যাবেন৷ তার আগেই হবে প্রার্থী ঘোষণা৷ দলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন দাখিলের সময়ও উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী৷ পাশাপাশি, এনডিএ প্রার্থীর সমর্থনে দেশজুড়ে প্রচার চালাতে ১৪ সদস্যের এক কমিটিও ঘোষণা করা হয়েছে। এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রী গজেন্দ্র সিংহ শেখাওয়াতকে। মোটের ওপর শাসক শিবির অনেকটাই গুছিয়ে ফেলেছে ঘর৷

অন্যদিকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা ১৭ দলের বিরোধী বৈঠকে প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করা যায়নি৷ ২১ জুন ফের বৈঠক৷ সংসদের অ্যানেক্সি-তে এই বৈঠকে শরদ পওয়ারই সভাপতিত্ব করবেন। প্রথম বৈঠকে এমনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় দফার এই বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দিচ্ছেন না। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করবেন সাম্প্রতিক জাতীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞ রাজ্যসভা সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়৷ কিন্তু এখনও পর্যন্ত যা খবর, তাতে বিরোধী শিবির কোনও নামই স্থির করতে পারেনি‌। প্রথম বৈঠকের শেষভাগে প্রার্থী হিসেবে ফারুক আবদুল্লা এবং গোপাল গান্ধীর নাম তৃণমূল নেত্রী প্রস্তাব করলেও দু'জনের কেউই এখনও পর্যন্ত নিজেদের সম্মতি বা আপত্তির কথা জানাননি। ফলে বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত স্তরে রয়েছে। আর তারই মাঝে শিবসেনা বা ডিএমকে জোরালোভাবে নিজেদের যে মত প্রকাশ করেছে, তাতে আবদুল্লা বা গান্ধী- নিজেরাই পিছিয়ে যেতে পারেন বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। বৈঠকের আগেই শিবসেনা এবং ডিএমকে-র তাৎপর্যপূর্ণ ওই মনোভাবের প্রভাব নিশ্চিতভাবেই দ্বিতীয় দফার সভায় পড়বে। শিবসেনা দলীয় মুখপত্রে যেভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শক্তপোক্ত প্রার্থীর দাবি তুলেছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে, ঠাকরের দল ফারুক আবদুল্লা বা গোপাল গান্ধীকে 'শক্তপোক্ত' প্রার্থী হিসেবে বিবেচনাই করছে না। এই দু'জনের কাউকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করালে বিজেপি তথা এনডিএ-র প্রার্থীর বিরুদ্ধে তেমন কঠিন লড়াই হবে না বলেই ধারণা শিবসেনা-র। প্রার্থী হিসেবে গোপালকৃষ্ণ ও ফারুককে মূল্যায়ন করে শিবসেনার স্পষ্ট বার্তা, "এই দু'জনের কেউই বিজেপি বা এনডিএ শিবিরের সঙ্গে লড়াই পারবেন না।" আর এই ধারণার কথা গোপন না রেখে দলীয় মুখপত্রে তা জানিয়েও দিয়েছে। 'সামনা'-র সম্পাদকীয়তে বিরোধী নেতৃত্বকে নিশানা করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেভিওয়েট কাউকে প্রার্থী করার কার্যত দাবি তোলা হয়েছে। তবে ওজনদার প্রার্থী কে হতে পারেন, সে ব্যাপারে নতুন কোনও নাম উল্লেখ করেনি শিবসেনা। আস্তিনে লুকোনো কোনও নাম ২১-এ বৈঠকে তুলে ধরতে পারে বলেও রাজনৈতিক মহল মনে করছে।

জাতীয় স্তরের রাজনীতিকরা আরও একটি নজরকাড়া বিষয় নিয়ে কার্যত বিস্মিত‍। এখনও পর্যন্ত বিরোধী শিবিরের মধ্যে থেকে ফারুক আবদুল্লা বা গোপাল গান্ধীর বিকল্প কোনও নামই উঠে আসেনি। এমনকী, এই পরিস্থিতিতেও কংগ্রেস কোনও নাম প্রস্তাব করেনি। মমতার ডাকা বৈঠকে কংগ্রেস চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধীর নির্দেশে কংগ্রেসের তরফে হাজির ছিলেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা তথা রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে, কংগ্রেস সাংসদ জয়রাম রমেশ, রণদীপ সুরজেওয়ালা। এরা প্রত্যেকেই সোনিয়া-ঘনিষ্ঠ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকে বেছে বেছে কংগ্রেসের এই তিন জনকে পাঠানো যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষত খাড়গে-র উপস্থিতি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। গান্ধী পরিবার যথেষ্টই মান্যতা দেয় বিচক্ষণ এবং প্রবীণ নেতা খাড়গে-র মতামতকে। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, বিরোধী দলগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার যে চেষ্টা তৃণমূল নেত্রী করছেন, সেই উদ্যোগকে সোনিয়া গান্ধী যথেষ্টই গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিব্রত করে আলাদাভাবে আগাম কোনও প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে চায় না কংগ্রেস।

তাছাড়া কংগ্রেস কোনও প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করলে, বিরোধী শিবিরে থাকা একাধিক দল তাতে সম্মতি না-ও দিতে পারেন কারন, কংগ্রেসের প্রশ্নে তাদের অ্যালার্জি রয়েছে। তাই সোনিয়া গান্ধী গোটা বিষয়টিই ছেড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর। এই ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছে একাধিক বিরোধী দল। বিজেপিকে চাপে রাখতে কংগ্রেসের এই ভূমিকা কার্যকর হতে পারে বলেও অনেকে মনে করছে। যদি শেষ পর্যন্ত সহমতের ভিত্তিতে বিরোধী প্রার্থী চূড়ান্ত করা না যায়, এবং কংগ্রেসের কাছে যোগ্য প্রার্থীর নাম চাওয়া হয়,তেমন পরিস্থিতিতে সক্রিয় হতে পারেন সোনিয়া গান্ধী।

More Articles

;