কেন ন্যানো বানিয়েছিলেন রতন টাটা?

'টাটা ন্যানো: বিশ্বের সবথেকে সস্তা গাড়ি'; একটা সময় ছিল, যখন ভারতের প্রত্যেকটি সংবাদমাধ্যমের পাতা ভরে থাকত এই বিজ্ঞাপনে। ১ লাখ টাকার মধ্যেই চারচাকার গাড়ি! রতন টাটার মস্তিষ্কপ্রসূত এই ড্রিম প্রোজেক্ট দেখে চমকে গিয়েছিল সারা বিশ্ব। কোনও বিদেশি ব্র্যান্ড নয়, সম্পূর্ণ ভারতীয় একটি ব্র্যান্ড ভারতীয়দের সমস্যার কথা চিন্তা করেই নিয়ে এসেছে বাইকের দামে চারচাকার গাড়ি, এ ছিল বিস্ময়কর! ভারতীয় গাড়ির শিল্পে একটি মাইলফলক হয়ে উঠেছিল ন্যানো।

মধ্যবিত্তর হাতের নাগালে চারচাকা গাড়ি, এটাই ছিল ন্যানো তৈরির প্রধান পরিকল্পনা। তবে উন্মাদনা তৈরি হলেও, সফলতা কিন্তু আসেনি। বাস্তবের মাটিতে এই গাড়ি এলেও তার ডিজাইন এবং স্পেসিফিকেশনের কারণে খুব কম দিনের মধ্যেই গাড়িটি হয়ে উঠেছিল একটি কমিক মেটেরিয়াল। ফলে শেষমেশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল উৎপাদন। যদিও সবকিছুকে ছাপিয়ে ন্যানো-র সঙ্গে জুড়ে রয়েছে জমি অধিগ্রহণের বিতর্ক, যা প্রকারান্তরে পতন নিশ্চিত করেছিল ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট জমানার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাটা কোম্পানির ওই গাড়ির ভালো-মন্দর চেয়েও অনেক বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই জমি অধিগ্রহণ বিতর্ক।

গাড়ি নির্মাতা সংস্থা টাটা মোটরস এই গাড়ি তৈরি করার জন্য প্রথমে সিঙ্গুরকেই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে পরবর্তীতে ন্যানো কারখানা সরাসরি স্থানান্তরিত হয় গুজরাতের সানন্দ-এ। এই নিয়ে পরবর্তীকালে আফসোস করতে হয়েছিল 'এমিরেটস অফ টাটা সনস'-এর চেয়ারম্যান খোদ রতন টাটাকে। এখন এই গাড়ি না পাওয়া গেলেও কিছুদিন আগে খবর পাওয়া যাচ্ছিল, এই গাড়ির নাকি একটি ইলেকট্রিক ভার্সন লঞ্চ হতে চলেছে। সেই টাটা ন্যানো ইলেকট্রিক মডেলটিকে নিয়ে রতন টাটার একটি ছবিও ব্যাপক ভাইরাল হয়। কিন্তু সেই দিনের সেই ন্যানো গাড়ি নিয়ে আসার পিছনে কারণ কী ছিল? কম দামের একটা গাড়ি ভারতীয়দের হাতে তুলে দিতে এত মরিয়া কেন হয়ে উঠেছিলেন রতন টাটা? সাম্প্রতিক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তিনি এই বিষয়টা নিয়েই বিস্তারে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করলেন। জানালেন, ভারতীয়দের প্রতি তাঁর দায়িত্বর কথা, জানালেন একলাখি ন্যানোর ভাবনার আসল কারণ।

আরও পড়ুন: অ্যাম্বাসাডর ফিরছে ইলেকট্রিক স্কুটার হয়ে! কেমন হতে চলেছে নয়া এই যান?

কেন নিয়ে আসা হয়েছিল এই ন্যানো?
এত সস্তায় কীভাবে মধ্যবিত্তর গাড়ির স্বপ্ন পূরণ করেছিল টাটা মোটরস? এতদিন পর্যন্ত এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর অধরা থাকলেও এবারে সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন খোদ রতন টাটা। তিনি তাঁর ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে এই টাটা ন্যানো সম্পর্কে নানা ধরনের অজানা কাহিনি শেয়ার করলেন। একটি আবেগঘন পোস্ট শেয়ার করে তিনি বর্ণনা করলেন, কীভাবে এই গাড়ি তৈরি করার জন্য তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং কীভাবে দেশবাসীর জন্য তিনি নিজের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছিলেন।

আদতে টাটা ন্যানোর সম্পূর্ণ প্রোজেক্ট শুরু করা হয়েছিল ২০০৩ সালের নভেম্বর মাসে। সেইদিন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একটি পরিবারের চার জনকে একটি স্কুটারের ওপরে বসতে দেখেছিলেন রতন টাটা। বাবা এবং মায়ের মাঝখানে বাচ্চারা যেন রীতিমতো স্যান্ডউইচ অবস্থায় বসে ছিল। সেই সময়ই ভারতীয়দের জন্য কিছু একটা করার ভাবনা নেন রতন টাটা। কিছুদিন রিসার্চ করার পর রতন টাটা বুঝতে পারলেন, এই সমস্যার শুধুমাত্র একটাই সমাধান রয়েছে, এবং তা হল সস্তায় চারচাকার গাড়ি নিয়ে আসা। এর ফলে এই পরিবারগুলোর সুরক্ষাও বাড়বে এবং তারা গাড়ি চালানোর সুখও উপভোগ করতে পারবে।

 

 
 
 
 
 
View this post on Instagram
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

 

A post shared by Ratan Tata (@ratantata)

তাঁর কথায়, আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম সেই সমস্ত ভারতীয় পরিবারগুলোকে দেখে, যাঁরা প্রতিনিয়ত স্কুটারে চেপে যাতায়াত করেন। কখনও বর্ষায় ভেজা পিচ্ছিল রাস্তায় যাওয়ার সময় স্কুটারে বাবা এবং মায়ের মাঝে ছোট্ট শিশুগুলি একেবারে স্যান্ডউইচ হয়ে যেত। স্কুল অফ আর্কিটেকচার-এ থাকার কারণে আমি আমার অবসর সময়ে ভাবতাম কীভাবে ভারতীয় পরিবারগুলোর জন্য কিছু একটা করতে পারব। আমি সবসময় তাদের আরামপ্রদভাবে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। সেই সময় তৈরি হয়েছিল ন্যানোর একটি ব্লু প্রিন্ট। আমি এই গাড়িতে কোনওরকম জানলা-দরজা তৈরি করিনি। ছিল শুধুমাত্র একটি বগি। কিন্তু তারপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, একটি সম্পূর্ণ গাড়ির মতো এর ডিজাইন হওয়া উচিত। আর তা থেকেই তৈরি হয়েছিল আমার স্বপ্নের ন্যানো। ৮৪ বছর বয়সি রতন টাটার কথায়, "ন্যানো হলো দেশের আম আদমির গাড়ি।"

কী বৈশিষ্ট্য ছিল টাটা ন্যানো গাড়ির?
টাটা ন্যানো তৈরি হয়েছিল ৬২৪ সিসি এসএসসি পেট্রোল রিয়ার ইঞ্জিন এবং রিয়ার হুইল কার টেকনোলজি অনুযায়ী। এর সঙ্গেই ছিল ম্যানুয়াল গিয়ারবক্স, যা এই গাড়িটিকে করে তুলেছিল মধ্যবিত্তর সবচেয়ে সুরক্ষিত গাড়ির মধ্যে একটি। এই গাড়িতে ২৫ কিলোমিটার প্রতি লিটার মাইলেজ পাওয়া যেত এবং শহরে চালালে এই গাড়ির মাইলেজ থাকত ১৫ থেকে ১৭ কিলোমিটার প্রতি লিটার।

কীভাবে এত সস্তা টাটা ন্যানো?
যখন টাটা ন্যানো প্রথমবার মার্কেটে আসে, তখন থেকেই সকলের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে কীভাবে মাত্র ১ লাখ টাকার মধ্যে এই গাড়ি নিয়ে আসতে পারলেন রতন টাটা? আসল উত্তরটা হলো, এই গাড়িতে ব্যাপক 'কস্ট কাটিং' করা হয়েছিল টাটা মোটরসের দ্বারা। প্রথমত, এই জিনিসটিকে গাড়ি বলে উপস্থাপন করা খুব একটা সহজ হয়নি টাটা কোম্পানির জন্য।

১ লক্ষ টাকার মধ্যে এই গাড়ির দাম নিয়ে আসার জন্য প্রথমেই একটি উইন্ডস্ক্রিন বাদ দেওয়া হয়েছিল গাড়ির মডেল থেকে। গাড়ি থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল এয়ারব্যাগ, যার ফলে প্রশ্ন উঠেছিল গাড়ির সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। স্পেয়ার টায়ারের আকার ছিল অত্যন্ত ছোট। পেট্রোল ট্যাঙ্ক শুধুমাত্র অপারেট করা যেত গাড়ির সামনের অংশ থেকেই, যার ফলে পেট্রোল নেওয়া এই গাড়িতে ছিল অত্যন্ত সমস্যার। দু'টির জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছিল সিঙ্গল উইং মিরর। সবকিছু বাদ দিয়ে টাটা ন্যানো গাড়িটি সেই সময় মারুতি সুজুকি অল্টো গাড়ির একটি সস্তা দামের বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কীভাবে ফ্লপ করল ন্যানো প্রজেক্ট?
গাড়িটি প্রথমবার ২০০৮ সালের অটো এক্সপো-তে প্রদর্শন করেছিল টাটা মোটরস। তারপর ২০০৯ সালের মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই গাড়ি বাজারে আসে। সেই সময় এই গাড়ির বেস মডেলের প্রারম্ভিক মূল্য ছিল মাত্র ১ লক্ষ টাকা। কিছু কারণে গাড়ি নির্মাতা সংস্থা টাটা মোটরস এই গাড়ির দাম কিছুটা বৃদ্ধি করতে চেয়েছিল। কিন্তু রতন টাটা নিজেই এতে আপত্তি তোলেন। তিনি জানান, জনসাধারণের জন্য অত্যন্ত সস্তায় গাড়ি নিয়ে আসার জন্য তিনি নিয়ে এসেছেন টাটা ন্যানো। তাই এর দাম ১ লক্ষ টাকার কাছাকাছিই থাকবে।

কিন্তু, সস্তা দামের গাড়ি হলেও রতন টাটার স্বপ্নের প্রোজেক্ট টাটা ন্যানো খুব একটা সাফল্য পেল না ভারতীয় মার্কেটে। তার অবশ্য মূল কারণ হলো, এই গাড়ির অত্যন্ত খারাপ বিল্ড কোয়ালিটি এবং খারাপ ডিজাইন। ভারতীয় রাস্তায় গাড়ি চালাতে গেলে সব সময় একটু বড় টায়ার হলে ভালো হয়। কিন্তু টাটা ন্যানো গাড়ির টায়ার এতটাই ছোট, যে ভালো সাসপেনশন তো দূরে থাক, গাড়ি সঠিকভাবে রাস্তায় চলতে পর্যন্ত পারে না। এই গাড়িটির বিল্ড কোয়ালিটি খুব একটা ভালো ছিল না। ৬৩৫ কিলোগ্রাম ওজন হলেও, সুরক্ষার দিক থেকে একেবারেই নিম্নমানের ছিল টাটা ন্যানো। এই গাড়িতে ছিল না কোনও এয়ার ব্যাগ। এর ফলে যদি গাড়ির কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়, তাহলে গাড়ির ভেতর বসে থাকা সকলেই আক্রান্ত হবেন।

এই গাড়ির আরেকটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এর দাম। ১ লাখ টাকা দাম হলেও ভ্যাট, জিএসটি এবং অন্যান্য ট্যাক্স মিলিয়ে এই গাড়ির দাম অনেকটাই বেড়ে যায়। তাই, ১ লাখ টাকার যে তকমা টাটা ন্যানো ধারণ করেছিল, সেটা কিন্তু বাস্তব জীবনে সম্ভব ছিল না। পরবর্তীতে টাটা ট্যাগ পাল্টে 'নতুন প্রজন্মের গাড়ি' হিসেবে এই গাড়িটিকে মার্কেটে নিয়ে আসে। কিন্তু তাতেও খুব একটা লাভ হয়নি।

ন্যানো নিয়ে রতন টাটার পরিকল্পনা
প্রথমে কিন্তু কোনওভাবেই রতন টাটা কোনও গাড়ি তৈরি করতে চাননি। প্রথমে তিনি চেয়েছিলেন একটি নিরাপদ স্কুটার তৈরি করতে। সেই স্কুটারে সবাই একসঙ্গে বসে চলতে পারবে, এবং অনেকটা জায়গাও থাকবে। কিন্তু পরবর্তীতে এমন একটা গাড়ি তৈরি করার কথা তিনি ভাবেন, যার দাম স্কুটারের থেকে সামান্য বেশি এবং তাতে চড়ে একটা পরিবার ছোট-বড় সমস্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। যখন তিনি আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশোনা করছেন, সেই সময় তিনি এবং তাঁর দল একটি ডুডল তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে তাতেই চাকা এবং দরজা যোগ করে তৈরি হয়েছিল একটি গাড়ির ডিজাইন। ২০০৮ সালে লঞ্চ হওয়ার পর দেশের প্রচুর গ্যারাজের স্থায়ী সদস্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল এই টাটা ন্যানো। কিন্তু দিন যত এগোয়, ততই যেন বিক্রিবাটায় ভাটা পড়তে থাকে এই গাড়ির। শেষমেশ ২০১৮ সালে বাজার থেকে টাটা ন্যানো গাড়ি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একটা সময় প্রতি বছর ২.৫ লক্ষ ইউনিট ন্যানো গাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছিল সংস্থা। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা কোনওদিনই পূরণ করতে পারেনি টাটা মোটরস। ২০১১-১২ আর্থিক বছরে সর্বাধিক বিক্রি হয়েছিল টাটা ন্যানো। সেবছর ৭৪,৫২৭ ইউনিট ন্যানো বিক্রি হয়। তারপর থেকে প্রতি বছর এই গাড়িটা বিক্রি হতে থাকে।

ন্যানো নিয়ে এখনো আশাবাদী রতন টাটা
এই মুহূর্তে ভারতে যে-সমস্ত কোম্পানি ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরি করছে, তাদের মধ্যে টাটা মোটরস শীর্ষস্থানে রয়েছে। তাদের কাছে এই মুহূর্তে রয়েছে ভারতের সবথেকে ভালো তিনটি ইলেকট্রিক ভেহিকল লাইন আপ। টাটা টিগর ইভি, টাটা নেক্সন ইভি এবং টাটা নেক্সন ইভি ম্যাক্স, এই তিনটি গাড়ির বিক্রি বেশ ভালোই। এছাড়াও CURVV ইভি নামের একটি বিশেষ গাড়ি নির্মাণ শুরু হচ্ছে আর কিছুদিনের মধ্যেই।

সম্ভাবনা রয়েছে, এই গাড়ির লাইন আপের সঙ্গেই এবারে যুক্ত হবে টাটা ন্যানো ইভি। রতন টাটার আশা, ইলেকট্রিক সাইকেলের হাত ধরেই আবার নতুন করে পুনর্জন্ম হবে টাটা ন্যানোর। মারুতি ৮০০ যেরকমভাবে ভারতীয় গাড়ির মার্কেটে বিপ্লব নিয়ে এসেছিল, সেরকম একটি বিপ্লব নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছিল টাটা ন্যানো। সফল না হলেও, মধ্যবিত্ত মানুষের মনে একটা আশার সঞ্চার করতে পেরেছিল এই গাড়িটি। হয়তো আবারও নতুন রূপে নতুন ডিজাইনে, আগের ভুলগুলোকে শুধরে নিয়ে নতুনভাবে ময়দানে অবতীর্ণ হবে ন্যানো। ভারতীয় গাড়ির শিল্পে এই নস্টালজিয়া আবারও ফিরবে। ভারতের রাস্তায় আবার দেখা মিলবে 'লাখতাকিয়া' গাড়ির।

 

More Articles

;