কেন নোবেল পুরস্কার চান ট্রাম্প?

Trump Nobel Prize controversy: আসলে নোবেল শান্তি পুরস্কার বহু দিন ধরেই আর এই শান্তির প্রতীক নয়। বরং পুরস্কার দিয়ে এসেছে এমন নেতাদের, যাঁরা নিজেরাও যুদ্ধের অংশ ছিলেন।

inscript
৩ মিনিট
কেন নোবেল পুরস্কার চান ট্রাম্প?

ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার চান, এই কথাটি শুনলেই অনেকে মুখ টিপে হাসেন। সোশ্যাল মিডিয়া ভরে যায় মিমে আর ঠাট্টায়। কিন্তু হাসির আড়ালে যে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা আছে, তা আমরা খুব কমই দেখি। প্রশ্নটা শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, প্রশ্নটা নোবেল শান্তি পুরস্কারের বদলে যাওয়া চরিত্র নিয়ে।

আজকের নোবেল শান্তি পুরস্কার আর সেই পুরস্কার নেই, যা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক ছিল। বরং তা ধীরে ধীরে এমন এক স্বীকৃতিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে বড় বড় শক্তিধর রাষ্ট্র, সামরিক আধিপত্য ও কূটনৈতিক প্রদর্শনী অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি মূল্য পায়। তাই ট্রাম্পের দাবি অযৌক্তিক নয়, বরং পুরস্কারের ইতিহাসই তাঁর এই চাওয়াকে সম্ভব করেছে।

'শান্তি' বলতে তো আসলেই যুদ্ধ না হওয়া বা যুদ্ধ থেমে যাওয়াকে বোঝায়। তবে শান্তির আরও ভিন্ন অর্থ আছে। শান্তি মানে সামরিক শক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা; শান্তি মানে অস্ত্রবাণিজ্য, সামরিক হস্তক্ষেপ, রাষ্ট্রনেতার আগ্রাসী নীতি, এসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এই অর্থে ট্রাম্প কখনোই শান্তির দূত নন। মুসলিম অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি, কোরিয়া উপদ্বীপে অস্থিরতা— সবটাই ছিল তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতি। আসলে নোবেল শান্তি পুরস্কার বহু দিন ধরেই আর এই শান্তির প্রতীক নয়। বরং পুরস্কার দিয়ে এসেছে এমন নেতাদের, যাঁরা নিজেরাও যুদ্ধের অংশ ছিলেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ট্রাম্প-পুতিন-আম্বানি, ত্রয়ীর মধ্যে মিলটা কোথায়?

India-US relations: ফিনল্যান্ড-ভিত্তিক CREA-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, জামনগর রিফাইনারিতে যুদ্ধের আগে রাশিয়ান অপরিশোধিত তেলের ভাগ ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। যুদ্ধের পর তা লাফিয়ে বাড়ে।

হেনরি কিসিঞ্জার তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতায় তিনি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তবু তিনি শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। এই একটি ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, নোবেলের সংজ্ঞা শুধুই শান্তি নয়, কূটনৈতিক চুক্তিও।

গত কয়েক দশকে নোবেল কমিটি যে বার্তা দিয়েছে তাতে মনে হয়, যুদ্ধে না থেকে যুদ্ধকে 'ম্যানেজ' করাও যেন এক ধরনের শান্তি। বড় শক্তিধর রাষ্ট্রের নেতা যদি দু'দেশের মধ্যে একটি অস্থায়ী চুক্তি করিয়ে দেন, কিছু ছবি তোলেন এবং কিছু বিবৃতি দিয়ে দেন— তাহলেই তিনি শান্তির দাওয়েদার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ট্রাম্প বনাম মাদুরো: কিউবান মিসাইল সংকটের ছায়া কি ফিরছে?

Trump vs Maduro: যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও কঠোর সামরিক তৎপরতা দেখায়, আর ভেনেজুয়েলা পাল্টা প্রতিরোধে নামে তাহলে নতুন এক আঞ্চলিক সংকট তৈরি করতে পারে, যার প্রভাবে পুরো মহাদেশ অস্থিতিশীল হতে পারে।

এখানেই ট্রাম্পের চাহিদা যৌক্তিক হয়ে ওঠে। তিনি নিজে যে বড় কোনো শান্তির প্রতীক, তা নয়; কিন্তু তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কেন্দ্রে ছিলেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক বৈঠক, মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত 'শান্তি-চুক্তি', আফগানিস্তান নিয়ে আলোচনায় তাঁর সরকারের ভূমিকা— সবকিছুরই প্রচার হয়েছিল বিশ্বমঞ্চে। এই প্রচার, এই আলোচনাই নোবেলের বর্তমান মানদণ্ডে 'শান্তির কাজ' হিসেবে গণ্য হয়। ফলে ট্রাম্প নিজেকে পুরস্কারের যোগ্য মনে করেন, এটা তাঁর ব্যক্তিগত অহংকার যতই হোক, নোবেলের সাম্প্রতিক ইতিহাস সেটা সমর্থন করে।

ট্রাম্পের নোবেল পাওয়ার ইচ্ছার পিছনে রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক ব্র্যান্ড ইমেজও। নিজের সমর্থকদের কাছে তিনি বারবার দেখাতে চান তিনি এক শক্তিশালী নেতা, বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু, যাঁকে প্রতিপক্ষরা ভয় পায়। নোবেল পুরস্কার তাঁর জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক 'ট্রফি', যা তিনি ব্যবহার করতে পারেন মার্কিন ভোটারদের সামনে নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করতে।

ট্রাম্প খুব ভালোভাবেই জানেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলে তাঁর রাজনৈতিক প্রচারে নতুন জোর আসবে। রিপাবলিকান দলেও তাঁকে হালকা ভাবে দেখা কমবে। এর সঙ্গে রয়েছে আরেকটি ব্যক্তিগত কারণ, বারাক ওবামা। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই নোবেল পেয়েছিলেন। ট্রাম্প মনে করেন, তিনি ওবামার চেয়েও বেশি শান্তি এনেছেন। তাই নোবেল আসলে তাঁরই পাওয়া উচিত। এটা শুধু ট্রাম্প ও ওবামার পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। এটা মার্কিন রাজনীতিতে কে বড় নেতা, সেই মর্যাদারও লড়াই।

সব শেষে এসে প্রশ্নটা একই জায়গায় দাঁড়ায়, ট্রাম্প নোবেল চাইছেন ঠিকই, কিন্তু আজকের নোবেল কি সত্যিই শান্তির পুরস্কার? না কি রাজনৈতিক আলোচনার, কূটনৈতিক ফটোসেশনের, বিশ্বশক্তির মধ্যস্থতার পুরস্কার?যদি নোবেল সত্যিই শান্তির, মানবিক আদর্শ ও যুদ্ধবিরোধী নীতির প্রতীক হত, তাহলে ট্রাম্পের দাবি নিছক রসিকতা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু পুরস্কার যখন বহু আগেই তার চরিত্র বদলে ফেলেছে, তখন ট্রাম্পের দাবি আর অবাস্তব নয়। শান্তির ভাষা যেন এখন শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর সেই শক্তির খেলার মধ্যে ট্রাম্পের মতো নেতা নোবেল চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।