ট্রাম্প-মাস্কের হুঙ্কারকে দুয়ো! ইতিহাস গড়লেন জোহরান মামদানি

Zohran Mamdani Becomes New York Mayor: মামদানির প্রচারের বার্তাই তরুণ ভোটার, অভিবাসী এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে।

Tanvia Barua
৩ মিনিট
ট্রাম্প-মাস্কের হুঙ্কারকে দুয়ো! ইতিহাস গড়লেন জোহরান মামদানি

নিউ ইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত জোহরান মামদানি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দক্ষিণ এশিয় বংশোদ্ভূত ও মুসলিম ব্যক্তি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরের মেয়র নির্বাচিত হলেন। ৩৩ বছর বয়সি মামদানি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল শাখার প্রতিনিধি। মঙ্গলবারের ভোটে তিনি তাঁর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী— রিপাবলিকান কার্টিস স্লিওয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কৌমো-কে পরাজিত করেছেন। এখনও অবধি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামদানি পেয়েছেন প্রায় ৫০.৪% (১,০২২,৪৪৪) শতাংশ ভোট। জয়ের পর তাঁর সমর্থকেরা নিউ ইয়র্কের রাস্তায় নেমে উল্লাসে মেতে উঠেছেন।

মামদানিকে হারাতে এক চমকপ্রদ কৌশল নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের দলের প্রার্থী কার্টিস সিলভার পরিবর্তে মামদানির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী অ্যান্ড্রু কৌমোকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ট্রাম্পের যুক্তি ছিল স্পষ্ট— “রিপাবলিকান প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা নেই, তাই মামদানিকে পরাজিত করতে হলে ভোট নষ্ট না করে কৌমোকে ভোট দিন।”এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, “একজন খারাপ ডেমোক্র্যাটও একজন কমিউনিস্টের চেয়ে ভালো।” তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, যদি মামদানি জেতেন, তবে নিউ ইয়র্কের জন্য ফেডারেল ফান্ড বন্ধ করে দেবেন। নির্বাচনী প্রচারে বারবারই ট্রাম্প মামদানিকে 'কমিউনিস্ট' আখ্যা দিয়েছেন। শুধু ট্রাম্পই নন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের ইলন মাস্কও প্রকাশ্যে কৌমোকে সমর্থন জানান এবং ভোটারদের তাঁকেই বেছে নিতে অনুরোধ করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে দক্ষিণপন্থী কৌমোকে হারিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক প্রার্থী হন জোহরান মামদানি। এরপর থেকেই দক্ষিণপন্থী মহলের রোষের মুখে পড়েন তিনি। কৌমো পরবর্তীতে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামেন এবং ডানপন্থী ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন পান। মামদানিকে ঘিরে শুরু হয় অভিযোগ— তিনি নাকি কমিউনিস্ট।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
‘নো কিংস’ বিক্ষোভ! কেন ট্রাম্প বিরোধী আন্দোলনে নেমেছেন লাখ লাখ মানুষ?

No Kings Protest in the US: এই আন্দোলনে ডেমোক্র্যাট পার্টির শীর্ষ নেতারাও যোগ দেন। ওয়াশিংটনে বিশাল জনসমাবেশে বক্তব্য রাখেন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স।

এত আক্রমণ সত্ত্বেও তাঁর বিজয় কেবল নিউ ইয়র্ক নয়, সমগ্র বিশ্বের প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ৮.৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার এই শহরের বাজেটই ১১০ বিলিয়ন ডলার। জোহরান মামদানি উগান্ডায় জন্মগ্রহণ করেন, তবে তাঁর পরিবার ভারতের বংশোদ্ভূত। ছোটবেলায় তাঁর পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসে। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি একজন সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন— যারা ভাড়া থাকেন তাদের অধিকার, শিক্ষার সুযোগ এবং অভিবাসীদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছেন। ২০২০ সালে তিনি নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন। সেই সময় থেকেই তিনি পরিচিতি পান 'জনগণের নেতা' হিসেবে।

মামদানির প্রচারের বার্তাই তরুণ ভোটার, অভিবাসী এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। মামদানির জয়কে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলি 'রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত' বলে উল্লেখ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জয় প্রমাণ করে যে তরুণ ভোটাররা এখন এমন নেতৃত্ব চান, যারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তনের কথা বলেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মীরা নায়ারের পুত্র, মোদি সমালোচক— নিউ ইয়র্ককে দিশা দেখাবেন ভাবী মেয়র মামদানি?

Zohran Mamdani: বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত উগান্ডার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাহমুদ মামদানির সন্তান হলেন জোহরান মামদানি।

প্রসঙ্গত, প্রথম থেকেই মামদানিকে নিয়ে ভারতের মিডিয়ায় চর্চা কম। মামদানি দক্ষিণ এশিয় সম্প্রদায়ের মধ্যে জোর প্রচার চালিয়েছিলেন। উর্দু ও হিন্দিতে বলিউড থিম ব্যবহার করেও প্রচার করেন। তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক মীরা নায়ার ও শিক্ষাবিদ মাহমুদ মামদানির পুত্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের মিডিয়ার নীরবতার মূল কারণ মামদানির ধর্মীয় পরিচয়। তিনি একজন শিয়া মুসলিম। ঋষি সুনক বা প্রীতি প্যাটেলের মতো নেতাদের সাফল্যে গোদি মিডিয়া উচ্ছ্বসিত হয়, কিন্তু মামদানির জন্য সেই উচ্ছ্বাস নেই। গাজায় ইজরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে জোহরান মামদানি বরাবরই প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর এই অবস্থানের কারণেই হয়ত ভারতের মিডিয়া তাঁকে এড়িয়ে গিয়েছে, বলে মত ওয়াকিবহাল মহলের অনেকের।

এখন জোহরান মামদানির সামনে একাধিক বড়ো চ্যালেঞ্জ। তাঁর জয়ের পর মানুষ যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনি প্রত্যাশাও অনেক বেড়ে গিয়েছে। সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো বাসস্থানের সংকট। নিউ ইয়র্কে বাড়ি ভাড়া অনেকটাই বেশি। সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্ন আয়ের মানুষদের পক্ষে ওই শহরে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। মামদানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সাশ্রয়ী বাসস্থান নির্মাণ এবং ভাড়াটেদের অধিকার রক্ষার জন্য নতুন নীতি আনবেন। দ্বিতীয় বড়ো চ্যালেঞ্জ গণপরিবহন বা ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। শহরের সাবওয়ে ও বাস পরিষেবায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন, কিন্তু পরিষেবা অনিয়মিত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। মামদানি বলেছেন, তিনি পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন বাজেট বরাদ্দ করবেন। পাশাপাশি যাত্রী সুরক্ষায়ও কঠোর নজরদারি চালু করবেন। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা। এছাড়াও পরিবেশ দূষণ, কর্মসংস্থান, অভিবাসীদের অধিকার এবং শিক্ষা সংস্কার— এই সব বিষয় নিয়েও তিনি কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে নিউ ইয়র্কের অনেকের বিশ্বাস, মামদানি তরুণ ও প্রগতিশীল নেতা। তাঁর নেতৃত্বে শহরটিতে সবার জন্য সমান সুযোগ করে দেওয়া হবে।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।