এর নাম ভক্তি! নির্লজ্জ! অযোধ্যায় কেন নিজেদের মধ্যে লড়ছেন সাধুরা!

tiasa gupta
৪ মিনিট
এর নাম ভক্তি! নির্লজ্জ! অযোধ্যায় কেন নিজেদের মধ্যে লড়ছেন সাধুরা!

বিতর্কের নাম অযোধ্যা। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। এখনও দেশের কাছে ত্রাস সেইদিন। বাবরি মসজিদ ধ্বংস। বহুদিন ধরে দেশের অন্দরে বাবরি মসজিদ-রামমন্দির নিয়ে বিতর্কের চোরা স্রোত বইতে থাকে। এরপর সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়। বিতর্কের নিষ্পত্তি। অযোধ্যার বুকে তৈরি হচ্ছে রামমন্দির। বারবার এই রাম জন্মভূমিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে। আর তাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বিজেপি। একসময়ে লালকৃষ্ণ আদবানিরা যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তার উত্তরাধিকার নিপুনভাবে বহন করছেন আজকে মোদি, যোগীরা। ফলে অযোধ্যায় রামমন্দির হচ্ছে। বৃহস্পতিবার এই রাম জন্মভূমি সাক্ষী থাকল এক নির্লজ্জ ঘটনার। এর সঙ্গে বিজেপির যোগ নেই, যোগ নেই রাম মন্দিরের ঠিকই, তবে যোগ আছে সাধু সন্তদের। মন্দিরের আয়ের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে তাঁরা যে কাণ্ড ঘটাল তাতে লজ্জায় মুখ লোকাতে হচ্ছে দেশকে। কী ঘটল এদিন?

মন্দিরের অধিকার এবং আয়ের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে বিবাদে জড়াল সাধুদের দুই গোষ্ঠী। বৃহস্পতিবার সকালে বোমাবাজি চলল রাম জন্মভূমি অযোধ্যায়। অযোধ্যা কোতায়ালি থানা জানিয়েছে, নরসিংহ মন্দিরে আয়ের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে গত ২ মাস ধরে পরিচালন সমিতির দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ চলছিল। বৃহস্পতিবার ভোরে সেই বিবাদের জেরেই সংঘর্ষ বাধে। তাতে জড়িয়ে পড়েন মন্দিরের মহন্ত, পুরোহিত এবং সাধুদের অনেকে। স্থানীয়দের একাংশ জানাচ্ছেন, ভোর ৪টে নাগাদ গোলমাল শুরু হওয়ার পর মন্দির চত্বর থেকে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। যা সম্ভবত বোমার।

এমনকী অশান্তির জেরে সাধুদের আটক করেছে পুলিস। (পুলিসের জালে সাধু! ভাবা যায়!) সার্কেল অফিসার রাজেশ তিওয়ারি জানান, মন্দিরের পরিচালন ক্ষমতা, আয়ের ভাগ বাঁটেয়ারা নিয়ে বিবাদ বাধে। অনেক দিন ধরে বিবাদ চলছিল। এদিন তা চরমে ওঠে। বিবাদমান দুই গোষ্ঠীর কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তবে বোমাবাজির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে পুলিস। তাদের দাবি, বোমা নয়, শক্তিশালী পটকা ফাটানো হয়েছে। এখনও কোনও এফআইআর দায়ের হয়নি। তবে ঘটনার তদন্ত হচ্ছে। অযোধ্যায় তৈরি হচ্ছে রামমন্দির। এবার সেখানেই মন্দিরে আয়ের ভাগ নিয়ে চরম বিবাদের সাক্ষী রইল সেই অযোধ্যা। স্বাভাবিকভাবে এই ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেই নিজেদের ইস্তেহারে রামমন্দির তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে শুরু হয়েছে সেই মন্দির নির্মাণের কাজ। সেই কাজ শেষ হতে ২০২৫। কিন্তু ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটের আগেই পুন্যার্থীদের জন্য মন্দিরের একাংশ খুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সেখানে তাঁর পুজোর্চনা সারতে পারবেন। এমনটাই জানিয়েছেন রামমন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সচিব চম্পত রাই। এদিন তিনি জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে পুন্যার্থীদের জন্য রামমন্দিরের গর্ভগৃহ খুলে দেওয়া হবে।

বাবরি মসজিদ না রাম জন্মভূমি? ৪০টি শুনানির পর এই নিয়ে ঐতিহাসিক রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। পাঁচ বিচারপতির একটি বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে এই রায় দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের পাশাপাশি সেই বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি এসএ বোবডে, বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি অশোক ভূষণ, বিচারপতি এস আবদুল নাজির। ৪০ দিন শুনানি হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট এই রায় ঘোষণা করে। এই রায়ে বলা হয়েছে-

১. সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যার বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমি রামলালাকে দিয়েছেন। সেখানেই তৈরি হবে রাম মন্দির।

২. সুপ্রিম কোর্ট উত্তরপ্রদেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারকে মুসলিমদের জন্য পাঁচ একর জমি দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। সেখানেই তৈরি হবে মসজিদ।

৩. সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে তিন মাসের মধ্যে মন্দির গঠনের ট্রাস্ট প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছে। অযোধ্যার বিতর্কিত অঞ্চলে ছিল বাবরি মসজিদ। সেখানেই রাম মন্দির হবে।

৬. সুপ্রিম কোর্টের রায়ে জানানো হয়েছে, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার খননে মসজিদের আগে অন্য কোনও স্থাপত্যের প্রমাণ পেয়েছে। তবে সেখানে কোনও ইসলামিক স্থাপত্য ছিল না।

অযোধ্যার বুকে তৈরি হচ্ছে রামমন্দির। এটা বিজেপির তুরুপের তাস। অনেকেই বলেন যোগী আদিত্যনাথের দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পিছনে রয়েছেন রামলালা। বিরোধী শিবির বলে, নতুন ভারত কাজ চায়। হিন্দুত্বে এই ভারতের মন ভিজবে না। তাই বারবার উন্নয়নের কথা বললেও আবার সেই রামলালাতেই আত্মসমর্পণ করে বিজেপি। অযোধ্যার কথা যখন উঠল, তখন প্রাসঙ্গিকভাবে আসে রামমন্দির নির্মাণ এবং বিজেপির হিন্দুত্ব রাজনীতির প্রসঙ্গ। তবে মন্দিরে সাধু সন্তরা আজ যা করছেন করলেন, তার সঙ্গে বিজেপির রাজনীতির প্রত্যক্ষ কোনও সম্পর্ক নেই ঠিকই, তবে এর সঙ্গে নাম জড়িয়ে আছে অযোধ্যার মতো একটা বহু আলোচিত পীঠস্থানের। আর সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, তাঁদের কাণ্ডকারখানা নিয়েও।

গীতায় আছে নিষ্কাম ধর্মের আদর্শ। এই দেশেই আছে শ্রীরামকৃষ্ণের কালী সাধনার সর্বত্যাগী আদর্শ। আর সাধু মানে তো যাঁরা পার্থিব সুখ দুঃখের ঊর্ধ্বে জীবনকে প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে থাকে না ,স্বার্থের বোঝাপড়া। কালে কালে কি এই চিরকালীন বিশ্বাসের ব্যতিক্রম ঘটছে? কেন আজ দেখতে হল মন্দিরের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে সাধু সন্তদের মধ্যে এমন নির্লজ্জ লড়াই?

স্বামী বিবেকানন্দ একবার এক চিঠিতে লিখেছিলেন,

আমি গৃহস্থ বুঝি না, সন্ন্যাসীও বুঝি না, যথার্য সাধুতা, উদারতা এবং মহত্ম যেথায়, সেই জ্ঞানেই আমার মস্তক চিরকালই অবনত হউক- শান্তিঃ, শান্তিঃ, শান্তিঃ।

নিরাভরণ এই সাধুতা, উদারতার কাছেই তো চিরকাল মাথা নত করে এসেছে সমাজ। আজ কি এই সব আদর্শ চুলোয় দিয়ে এক স্বার্থান্বেষী সমাজব্যবস্থাকে লালন করার সময় এসেছে? যেখানে সাধুতার মধ্যেও স্বার্থের উৎকট গন্ধ!

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।