টাকার লোভ আর ক্ষমতার দেমাক,মেসি আসায় যে নর্দমার ঢাকনা খুলে গেল

Messi Kolkata chaos: ভাঙা চেয়ার বদলানো হবে, কিন্তু ভাঙা বিশ্বাস? ভাঙা সম্মান? মেসি এসেছিলেন আনন্দ দিতে। কিন্তু রেখে গেলেন লজ্জা

inscript
৩ মিনিট
টাকার লোভ আর ক্ষমতার দেমাক,মেসি আসায় যে নর্দমার ঢাকনা খুলে গেল

শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে একটা অস্বস্তি যেন বুকের ভিতর চেপে বসল। উৎসব হওয়ার কথা ছিল। ইতিহাস রচনার কথা ছিল। কিন্তু...

কলকাতা দেখেছে এই শহরের রাস্তায় মারাদোনা হেঁটেছেন, পেলে মাঠে নেমেছেন। মেসিও এসেছেন আগে। কিন্তু সেই সব স্মৃতি ছিল উচ্ছ্বাসের,গর্বের। শনিবারের যুবভারতী হয়ে উঠল এক বিশৃঙ্খলার দলিল, ভারতীয় ফুটবলের এক কলঙ্কিত পাতা।

সারা ভারত থেকে ৫০০০ থেকে ৫০০০০ টাকায় টিকিট কেটে মেসির ভক্তরা স্টেডিয়ামে এসেছিলেন, এক ঝলক মেসিকে দেখবেন বলে। চোখের সামনে ইতিহাস হাঁটবে, এই স্বপ্ন নিয়েই। বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ মেসির গাড়ি যুবভারতীতে ঢোকে। সঙ্গে লুই সুয়ারেজ, রদ্রিগো ডি’পল। গ্যালারিতে তখন জনজোয়ার। মেসি গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই নেতা, মন্ত্রী, তাঁদের আত্মীয়-পরিজন ও ঘনিষ্ঠরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। ভিড় এতটাই যে গ্যালারি থেকে দাঁড়িয়ে মেসিকে দেখার কোনও সুযোগই ছিল না।

এখানেই প্রথম প্রশ্ন আসে, এই অনুষ্ঠান কাদের জন্য ছিল? আদপে ক্রীড়ানুষ্ঠান ছিল, নাকি ছিল ক্ষমতাবানদের ব্যক্তিগত প্রচার আর বাণিজ্যিক প্রদর্শনের মঞ্চ? ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ বৃত্তকে সামনে রেখে যুবভারতীতে যে ছবি উঠে এল, তাতে মনে হচ্ছে, একটি পারিবারিক অ্যালবামকে ‘আরও ঝকঝকে’ করার প্রকল্পের খেসারত দিল গোটা কলকাতা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বুড়ো না হলে মেসির জ্বলে ওঠা অধরাই থেকে যেত

Lionel Messi: আগের থেকে ঢের বেশি ভঙ্গুর হয়েও অসীম কার্যকরী মেসি এমন একজন, যাঁর জন্য সর্বস্ব বাজি রেখে খেলোয়াড়েরা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন কাপ জেতার লক্ষ্যে।

তারপর যা হল, সেটা শুধু ক্ষোভ নয়, একটা বিস্ফোরণ। বাকেট চেয়ার ভাঙল। বোতল উড়ল। হাজার হাজার মানুষ মাঠে নেমে পড়লেন। গোলপোস্টের জাল খুলে নেওয়া হল। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন, মুহূর্তে পরিণত হল বিশৃঙ্খলার মঞ্চে। যদিও ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ প্যাকেজ। ১০ লক্ষ টাকা খরচ করে একটি হোটেলে গিয়ে মেসির সঙ্গে হাত মেলানো, ছবি তোলা, প্রিমিয়ার লাউঞ্জে বিশেষ আপ্যায়নের সুযোগের খবর পূর্বেই কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছিল; গোটা আয়োজনটিই সাধারণ দর্শকের জন্য নয় বরং বিত্তশালী ও প্রভাবশালীদের কথা ভেবেই সাজানো । তবু প্রশ্ন ওঠেই পুলিশ কোথায় ছিল? নিরাপত্তার দায়িত্বে কারা ছিলেন? এত মানুষের জমায়েতের অনুমতি দিল কে, কী শর্তে? পশ্চিমবঙ্গের দূর দূরান্ত থেকে যারা মেসিকে দেখতে এলেন? তাঁরা কী পেলেন? নিরাশা, প্রতারণা, পুলিশের বাটাম!

যেই দর্শকদের নিরাপত্তার অজুহাতে জলের বোতল পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, উল্টে তাঁদের স্টেডিয়ামের ভিতরে বাধ্য করা হয়েছিল ২০ টাকার জল ২০০ টাকায় কিনতে। খেসারত কি বারবার সেই সাধারন দর্শকই দেবেন? কেউ হয়তো বিয়ের দিনেও মেসিকে এক ঝলক দেখতে এসেছিলেন। পরিবার, পরিজন, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যারা কাজ ছুটি নিয়ে সময় বের করে, টাকার অঙ্ককে তোয়াক্কা না করে শুধু এক ঝলক মেসিকে দেখতে এসেছিলেন তাদের দোষটা কোথায়? সঠিক সমন্বয়ের অভাবে পুলিশ এই ক্ষোভ সামলাতে পারলেন না। নীরব দর্শকও পরে দর্শকদের পিটিয়ে মনের জ্বালা মেটালেন। অনেকে মেসিকে না দেখতে পাওয়ার আক্ষেপ পূরণ করলেন স্টেডিয়াম থেকে ফুলের টব বাড়ি নিয়ে গিয়ে। কলকাতায় কিন্তু এই কাজটা সুষ্ঠ ভাবে করে দেখিয়েছিলেন মদন মিত্র। আজ যাঁরা মদন মিত্রকে দূরে সরিয়ে রাখলেন তাঁরা কি সুষ্ঠ ভাবে কাজটা করতে পারলেন? পারলেন না।

আর ঠিক এই নৈরাজ্যের মাঝেই সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্যটা চোখে পড়ল। মোহনবাগান ও ডায়মন্ড হারবার অলস্টারের প্রাক্তন ফুটবলারদের সঙ্গে মেসির পরিচয় করানোর কথা ছিল। কিন্তু লালকমল ভৌমিক,অসীম বিশ্বাস, সংগ্রাম মুখোপাধ্যায় ,দীপক মণ্ডল- বাংলা ফুটবলের পরিচিত মুখগুলো যাঁরা একদিন দেশের জার্সিতে খেলেছেন, আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করেছেন, বিদেশি কোচের প্রশংসা কুড়িয়েছেন আজ তাঁরাই ধাক্কা খেলেন তাও আবার বিশ্ববন্দিত এক ফুটবলারের সামনে। এটা কি শুধু কয়েকজন ফুটবলারের অপমান? হয়তো না, একটা গোটা দেশের ফুটবল সংস্কৃতিকে মাড়িয়ে দিল বাণিজ্যিক আকাঙ্খা ।

ফিফা র‌্যাঙ্কিয়ে ভারত ১৪২। লিগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কবে শুরু হবে, কতদিন চলবে—কেউ জানে না। এই অবস্থায় মেসির মতো কিংবদন্তিকে এনে কী লাভ হল? কয়েকটা ছবি? কয়েকটা ফটোসেশন? নাকি রাজনৈতিক প্রদর্শনী? মেসির নামে মূর্তি বসানো হল। বড় নেতার ক্লাবে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু মাঠের ভিতরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেল না? দর্শকদের সম্মান রাখা গেল না। নিজের রাজ্যের ফুটবলারদের মর্যাদা দেওয়া গেল না?

এই জায়গায় যদি প্রাক্তন ক্রিকেটাররা থাকতেন, তাহলে কি এমন ধাক্কা খেতেন? তাহলে কি এমন নির্লজ্জ অব্যবস্থা চলত? ফুটবলার বলেই কি তাঁরা সফট টার্গেট? খেলার মাঠ শুধু খেলা শেখায় না, সহবতও শেখায়। কিন্তু শনিবারের যুবভারতী দেখাল, চরিত্র বদলাচ্ছে মাঠের। অসম্মান, অব্যবস্থা, ক্ষমতার দাপট সব একসঙ্গে মিশে গেল।

ঘটনার পর রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী টিকিটের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত, আয়োজক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের গ্রেফতারের দাবি তুলেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে দায় এড়িয়ে মুখ খুলেছেন দেবাংশু ভট্টাচার্য। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে । ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনাধীন। গ্রেফতার করা হয়েছে শতদ্রু দত্তকেও। কিন্তু ক্ষতিটা কি শুধু টাকার? আবার যুবভারতীর সংস্কার হবে, আবার নতুন ফলক লাগবে, আবার উদ্বোধন হবে ভোটের আগে নবরূপে সজ্জিত বলে, ভাঙা চেয়ার বদলানো হবে, কিন্তু ভাঙা বিশ্বাস? ভাঙা সম্মান? মেসি এসেছিলেন আনন্দ দিতে। কিন্তু রেখে গেলেন লজ্জা। গোটা বিশ্বের সামনে আবার একবার বেরিয়ে এলো ভারতীয় ফুটবলের কঙ্কাল।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।