ব্যান্ডেল চিজ, যে সুতোটা বেঁধেছে বাংলা আর পর্তুগালকে

রেস্টুরেন্টে গিয়ে অতিরিক্ত চিজ দিয়ে পিজা বা বার্গার খেতে আমরা আজকাল সকলেই ভালোবাসি। পিজা অর্ডারের সময় 'একস্ট্রা চিজ' কথাটি আলাদাভাবেই উল্লেখ করে দিই। তবে রোজকার জীবনে আমরা বাঙালিরা যেসব খাবার খাই তাতে চিজের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। চিজের উৎপত্তিস্থল ইউরোপ তাই বাঙালিরা চিজ তৈরিতে তেমন সিদ্ধহস্ত নয় বলেই আমাদের ধারণা। কিন্তু বাঙালির হাতে তৈরি ব্যান্ডেল চিজের গুণগ্রাহী গোটা বিশ্ব, এমনটা শুনলে কি অবাক হবেন? খ্যাতনামা সকল রাঁধুনিই মেনে নিয়েছেন যে ব্যান্ডেল চিজের স্বাদ অতুলনীয়। আর স্রেফ স্বাদই নয় বাঙালির  তৈরি ব্যান্ডেল চিজের  গায়ে লেপ্টে রয়েছে কয়েকশো বছরের অল্পশ্রুত ইতিহাস।

শুরুয়াতি গপ্পো

পর্তুগিজ কলোনি বললেই আজও আমাদের প্রথম গোয়ার কথা মাথায় আসে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিল পর্তুগিজদের ঘাঁটি। ভাস্কো-ডা- গামার ভারতে আগমনের প্রায় কয়েক দশক পরে পর্তুগিজরা এদেশে যাতায়াত শুরু করে। পরে ষোড়শ শতকে বাংলা তথা দেশের মাটিতে পা রাখেন পর্তুগিজরা। তৎকালীন সময়ে বাংলার শাসক ছিলেন হোসেন আলাউদ্দিন। তিনিই বাংলায় হোসেন শাহী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। আলাউদ্দিন সপ্তগ্রাম, চট্টগ্রাম এবং ব্যান্ডেল - এই তিনটি জায়গায় বাণিজ্য ঘাঁটি গড়ে তোলেন এবং একচেটিয়াভাবে ইউরোপের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যকে পরিচালনা করতে শুরু করেন।

পর্তুগীজরা ভারতে প্রথমে চট্টগ্রামে অবতরণ করেন,যা পরবর্তীকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বন্দর হয়ে ওঠে। রাজা হোসেন আলাউদ্দিন চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রামের আয়কর ভবনের দ্বায়িত্ব স্থানান্তরিত করেন পর্তুগিজদের হাতে এবং ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশে দেন।  সেই সময় সপ্তগ্রাম থেকে লবণ, কারুকাজ করা বিশেষ ধরনের কাপড় বিদেশে রপ্তানি করা হত। হুগলি শহরকে ব্যবসার কেন্দ্রস্থলে রূপান্তরিত করেন পর্তুগিজরা , নাম দেন ‘উগোলিম’। ১৫৯৯ সাল নাগাদ ব্যান্ডেলে পর্তুগিজরা বাংলার অন্যতম প্রাচীনতম গির্জা তৈরি করেন। পরে ১৬৩২ সাল নাগাদ মুঘল সম্রাট শাহজাহান পর্তুগিজদের ঘাঁটি ধ্বংস করতে উদ্যত হন। মুঘল সম্রাটের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয় পর্তুগিজরা। সেই থেকে ধীরে ধীরে বাংলায় পর্তুগিজদের বসতি হ্রাস পেতে শুরু করে। তাই স্থানীয় ভারতীয় রাঁধুনিদের নিয়োগ করতে শুরু করেন পর্তুগিজরা। তাঁরা দেশীয় ও পশ্চিমী পদ্ধতি মিশিয়ে নানা খাবার তৈরি করতেন। তাঁদের হাত ধরেই পর্তুগিজদের  চিজ খেতে শিখল বাঙালি। জায়গার নাম মতো এর নাম হয়ে গেল ব্যান্ডেল চিজ।

চিজের আমি চিজের তুমি চিজ দিয়ে যায় চেনা- 

বাংলার রন্ধনশিল্পে ব্যান্ডেল চিজ আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। একসময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ছানা কেটে যাওয়া দুধকে অশুভ মনে করতেন তাই ছানা কেটে গেলে সেই দুধ ফেলে দেওয়াই ছিল দস্তুর। কিন্তু পর্তুগিজদের থেকেই দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরির কৌশল শেখে বাঙালি। বর্তমানে গরুর দুধ থেকে ব্যান্ডেল চিজ তৈরি হয়। লেবুর রস দিয়ে দুধ থেকে ছানাকে আলাদা করে ছোট ছোট গোল পাত্রে জমানোর জন্যই গোলকার চাকতির মত আকার হয় এই চিজের। বাজারে দুরকমের ব্যান্ডেল চিজ বিক্রি হয়। প্রথমটি হল সাদা রঙের সাধারণ চিজ এবং আরেকটি বাদামি রঙের ধোঁয়াটে গন্ধ যুক্ত চিজ অর্থাৎ স্মোকড চিজ। ধোঁয়াটে গন্ধ আনতে চিজকে ঘুঁটের আঁচে পুড়িয়ে নেওয়া হয়। রান্নায় খুব বেশি না ব্যবহার করলেও স্যান্ডউইচ ও স্যালাড তৈরিতে এই চিজের ব্যবহার আলাদা মাত্রা যোগ করে।

আরও পড়ুন-মধুস্মৃতির ছোটবেলাগুলি চলে গেল নারায়ণ দেবনাথ সঙ্গে, নন্টে-ফন্টে-কেল্টুদের আজ চোখে জল

এককালে পর্তুগিজ ঘাঁটি ব্যান্ডেলে এই চিজ তৈরি হলেও বর্তমানে ব্যান্ডেল চিজের ঠিকানা তারকেশ্বর ও বিষ্ণুপুর। অল্প সংখ্যক কিছু পরিবার বংশপরম্পরায় আজও এই চিজ প্রস্তুত করেন। বেশিদিন সংরক্ষণ করার জন্যই এই চিজে প্রিজারভেটিভ হিসেবে নুন ব্যবহার করা হয় । তাই রান্নায় ব্যবহারের আগে অতিরিক্ত লবণ ধুঁয়ে ফেলতে সারারাত ব্যান্ডেল চিজ জলে ভিজিয়ে রাখা হয়। কলকাতার হাতেগোনা কয়েকটি দোকানেই এখন ব্যান্ডেল চিজ বিক্রি হয়। এর মধ্যে নিউমার্কেট চত্বরে জে জনসন ও মল্লিক অ্যান্ড সনস- এই দুটি দোকানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই চিজ বিক্রি করছেন। কলকাতার বিভিন্ন রেস্টুরেন্টেও ব্যান্ডেল চিজ ব্যবহার করে বিভিন্ন পদ তৈরি করা হয়। এর যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে খাদ্যপ্রেমীদের মধ্যে।  

তবে জিআই ট্যাগ এখনও অধরা রয়ে গেছে ব্যান্ডেল চিজের। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ দেবব্রত বিশ্বাস ব্যান্ডেল চিজের ভৌগলিক নির্দেশক ট্যাগের জন্য লড়াই করছেন। এই ট্যাগ শুধু ব্যান্ডেল চিজের অনন্য স্বাদ ও ইতিহাসকে স্বীকৃতি দেবে তাই নয়, বিপণনের নতুন দিগন্তও খুলে দেবে বলে মত ডঃ বিশ্বাসের। এর ফলে অনেক ভালোভাবে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে যাবে ব্যান্ডেল চিজ। স্বয়ং সত্যজিৎ রায় যে চিজের স্বাদে মজেছিলেন সেই ব্যান্ডেল চিজের উৎপাদনকারী শ্রমিকদেরও অবস্থার উন্নতি হবে জি আই ট্যাগ শিকে ছিঁড়লে।

যুগ যুগ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ বাংলায় এসে পাড়ি জমিয়েছে নিজেদের। ভোজনরসিক বাঙালি সুস্বাদু খাবারের আশায় সব সংস্কৃতি থেকেই নিজের খাওয়ার উপযোগী পদ তৈরি করে নিয়েছেন। পর্তুগিজ হেঁশেলের ব্যান্ডেল চিজ তার ব্যতিক্রম নয়। অষ্টাদশ দশকে তাই পর্তুগিজরা বাংলা ছেড়ে চলে গেলেও বাঙালি তাঁদের চিজকে মনে রেখেছে আজও।

More Articles

;