ভাগবাটোয়ারার দিনগুলিতে সকলেই ব্যস্ত ছিল পাওনা বুঝে নিতে

The Great Calcutta Killings : আজকে যদি কেউ এই সমস্ত ব্যপারটার জন্য মুসলিম-সমাজকে দায়ী করেন, তাহলে সেটা অন্যায় হবে এই কারণে যে দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম-সমাজ হিন্দুদের লাঞ্ছনার শিকার হয়ে এসেছে।

Sandip Bandopadhyay
৩ মিনিট
ভাগবাটোয়ারার দিনগুলিতে সকলেই ব্যস্ত ছিল পাওনা বুঝে নিতে

চল্লিশের দশকে, দেশভাগের পূর্ববর্তী পরিস্থিতির একটা দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের আধিপত্য, তার রাজনৈতিক ব্যর্থতা যেমন আছে, তেমনই মুসলিম লীগের জঘন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও রয়েছে। কংগ্রেস অন্তত সাম্প্রদায়িক সংগঠন ছিল না, দলটির মধ্যে নানাবিধ ভাগ ছিল। কারও-কারও মধ্যে হয়তো সাম্প্রদায়িক মনোভাব ছিল, আবার অনেকের মধ্যে তা ছিল-ও না। কিন্তু মুসলিম লীগ তৈরি-ই হয়েছিল একটা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে এবং ধীরে-ধীরে তারা সেই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার দিকে এগোতে শুরু করে।

অবশ্য, এরও একটা পটভূমি আছে। বাংলার কথা আমরা যদি বলি, শুধু বাংলা কেন ভারতের সর্বত্রই হিন্দুরা মুসলিমদের ঘৃণা করেছে। তাদের আর্থিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অবদমিত করে রাখার চেষ্টা করেছে। ১৯২০-র পর, মুসলিম-সমাজের মধ্যে শিক্ষার প্রসার হতে থাকে, তাদের মধ্যেও একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠতে থাকে। স্বভাবতই তাদের নিজস্ব আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, যা খুবই সংগত। ১৯৩০-এর শেষ থেকে এবং ১৯৪০-এর দশকে, যখন বাংলায় মুসলিম লীগ প্রথমে আংশিকভাবে, পরে সামগ্রিকভাবে ক্ষমতায় এল, তখন তারা তাদের সেই সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের দিকেই ধীরে-ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল। স্বাভাবিকভাবেই সেই সময় হিন্দুদের দিক থেকেও একটা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে যে কৌশলে পাকিস্তানকে নাস্তানাবুদ করেছিল ভারত

India Pakistan War: পহেলগাঁও হামলার প্রেক্ষাপটে ১৯৭১-এর যুদ্ধে ভারত পাকিস্তানকে কীভাবে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল, প্রায় ৫৫ বছর আগের সেই ইতিহাস আবারও আলোচনায় আসা দরকার।

সে-সময়, শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিম লীগ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, একাধিক ক্ষেত্রে হিন্দু যুবকের চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে— অজস্র মানুষের লেখায় এ-ঘটনার উল্লেখ আছে। সেই মানুষগুলি কিন্তু সাম্প্রদায়িক নন। তাঁরা সেই সময়ের পরিস্থিতিটা কেবল মাত্র নিরপেক্ষভাবে বলেছেন। সর্বশেষে, ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের ডাকা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম, সেটা এক ভয়ানক মানুষ মারার রাজনীতি হয়ে ওঠে। যদিও প্রথমে আক্রান্ত হলেও, পরে হিন্দুরাও সমানভাবে হিংসায় যোগ দিয়েছিল। যেহেতু প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ঘোষণা করেছিল মুসলিম লীগ, তাই তারপর হিন্দুদের সংগত কারণেরই ধারণা তৈরি হয় যে মুসলিম লীগের সঙ্গে আর থাকা যাবে না। ফলে, দেশভাগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, যদুনাথ সরকার, মেঘনাদ সাহা— যাঁরা মোটেই সাম্প্রদায়িক নন, অত্যন্ত উদারমনা মানুষ, তাঁরাও কিন্তু সেই সময় বঙ্গ বিভাজন সমর্থন করেছিলেন এই কারণে যে, পরিস্থিতি তখন যা আকার নিয়েছিল, তাতে আর মুসলিম লীগের সঙ্গে থাকা যাচ্ছিল না।

দাঙ্গা বিধ্বস্ত কলকাতা

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্বাধীনতা দিবস হিসেবে কেন ১৫ অগাস্ট দিনটিকেই বেছে নেওয়া হলো

কেন ১৫ অগাস্টকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল? এই দিনের কি কোনওরকম বিশেষ গুরুত্ব ছিল ইংরেজদের কাছে?

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনীতিকেও কিন্তু এই পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার করতে হবে। বলা যেতে পারে, সেই সময়ের যে ক্ষুব্ধ তরুণ-মন, তার প্রতিনিধি হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তাঁর রাজনীতি আমাদের অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে, কিন্তু তাঁর যে একটা ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল সেটা স্বীকার করতেই হয়।

আজকে যদি কেউ এই সমস্ত ব্যপারটার জন্য মুসলিম-সমাজকে দায়ী করেন, তাহলে সেটা অন্যায় হবে এই কারণে যে, দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম-সমাজ হিন্দুদের লাঞ্ছনার শিকার হয়ে এসেছে। উলটো দিকে, মুসলিম লীগের জঘন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ধীরে-ধীরে দেশভাগের দিকে পরিস্থিতিকে এগিয়ে নিয়ে গেল, তা-ও আমরা অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু কোনও একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে দায়ী করা যায় না। ভারতের তিনটি প্রধান সম্প্রদায়— হিন্দু, মুসলিম, শিখ— এরা প্রত্যেকেই তখন দায়ী ছিল। হয়তো ভূমিকায় কিছু তারতম্য থাকতে পারে। কিন্তু দায় কেউ-ই অস্বীকার করতে পারে না।

আজকে ভারতের যে সাম্প্রদায়িক অবস্থা, তার সঙ্গে '৪৬ সালের কিন্তু তেমন মিল নেই। মনে রাখতে হবে, সে-সময় অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমরা ছিল সংখ্যা গুরু, তারা তখন ক্ষমতায় ছিল, ফলে হিন্দুদের তখন মুসলিমদের প্রতি ক্ষোভ থাকা হয়তো স্বাভাবিক-ই ছিল। সেই সময়, প্রায় প্রতিটি সম্প্রদায়ই বুঝতে পেরেছিল যে এবার ব্রিটিশরা ভারত থেকে চলে যাচ্ছে, এবার একটা ভাগবাটোয়ারার সময় এসেছে। এবং প্রত্যকেই কে কতটা কী পেতে পারে, সেই নিয়ে ব্যস্ত ছিল তখন। ফলে, সেই সময়ের রাজনীতির সঙ্গে এখনকার ভারতের কোনও মিল নেই।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।