হাতে সংবিধান, মাথায় হ্যাট || কে এই দলিত দেবী ‘ইংলিশ মাতা’

ভারতে জাতিবিদ্বেষ এখনও অস্থিমজ্জায় মিশে রয়েছে সাবর্ণ ভদ্রলোকদের। আর উত্তরপ্রদেশে এই পরিস্থিতি যে কী ভয়াবহ- তা অনুমান করাই যায়। উড়িষ্যাতেও কয়েকদিন আগে আম্বেদকর জয়ন্তী পালন করতে গিয়ে গেরুয়াবাহিনীর হামলার শিকার হতে হয় দলিতদের। প্রতিদিন একাধিক দলিত হত্যার খবর আসে। তা নিয়ে খুব আলোড়নও পড়ে না ভদ্রসমাজে। তাই এসবের বিপ্রতীপে নিজস্ব পরিচিতি নির্মাণ করতে হয় দলিত সমাজকে। বছরদশেক আগে উত্তরপ্রদেশের বঙ্কা গ্রামে একটি মন্দির স্থাপনের খবর আসে। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন চন্দ্র ভান প্রসাদ। দলিত লেখক এবং দলিত চিন্তক। মন্দিরটি ‘ইংলিশ মাতা’-র। সেখানে আক্ষরিক অর্থে ইংরেজি শিক্ষাকে পুজো করা হয়। কেন? এর পিছনে রয়েছে নানা কারণ।

মূলস্রোতের হিন্দু ধর্মের দেবদেবীদের ব্যবহার করে দলিতদের ওপর অত্যাচার কম দিন হচ্ছে না। অথচ, দলিতদের হিন্দু ধর্মের অংশ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুনতে শুনতে এক সময় দলিতরাও তা বিশ্বাস করেছে। হিন্দু দেবদেবীকেই পুজো করেছে। সঙ্গে সঙ্গে চূড়ান্ত শোষণের শিকারও হয়েছে। তাদের দিয়ে সিংহভাগ কাজ করিয়ে নেওয়া হয়েছে কয়েক হাজার বছর। আর সেই কাজের ফলভোগ করেছে উচ্চবর্ণ। উপরন্তু মাটির কাছাকাছি থেকে মাটির কাজ করতে হয় বলে দলিত শরীরকে অপবিত্র, নোংরা ঘোষণা করা হয়েছে। মনুর বিধানে বলা হয়েছে, দলিতেরা সংস্কৃত পড়লে যেন গরম শিক দিয়ে চোখ গেলে দেওয়া হয়। অচ্ছুৎ করে রাখা এই মানুষরা টোল জাতীয় বিদ্যায়তনগুলিতে পড়ার সুযোগ পায়নি কোনওদিনই।

তবে ভারতে ইংরেজ শাসনের প্রথম পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থা সম্বন্ধে মেকলে তাঁর মিনিট ঘোষণা করেন। তাতে ইউরোপীয় ধাঁচে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে নতুন করে সাজানোর প্রস্তাব আসে। ইংরেজি বাধ্যতামূলক করা হয়। যদিও মেকলের ইনফিল্ট্রেশন থিওরি অনুযায়ী এই ব্যবস্থায় সবথেকে লাভবান হয়েছিলেন সাবর্ণরাই, তবে সংস্কৃতের আধিপত্য চুরমার হওয়ায় দলিতমুক্তির একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। এবং সেই ক্ষমতায়নের মাধ্যম হয়ে ওঠে ইংরেজি। আম্বেদকর তাই ভারতের দফতরি ভাষা হিসেবে ইংরেজিকেই চেয়েছিলেন, তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যবাদী সরকার গায়ের জোর ফলিয়ে হিন্দিকে দফতরি ভাষা করেন। অথচ এই পর্যন্ত সমস্ত সরকারি কাজ হয় ইংরেজিতেই। তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ইংরেজি শেখাকে ক্ষমতায়ন মনে করেন দলিতরা।

আরও পড়ুন: ইংরেজি বলায় আমেরিকার পরেই ভারত, কেন এত বিদেশি ভাষা প্রীতি দেশবাসীর?

যে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা-সম্পর্কের জন্য সাবর্ণরা নিজেদের মধ্যে ইংরেজি বলাকে ক্ষমতার চোখে দেখত, তাকেই আত্মস্থ করে সাবর্ণদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কথা বলছেন দলিতরা। তাই চন্দ্র ভান প্রসাদ প্রশ্ন করেন, “জাতিহিংসায় জর্জরিত কাজের ক্ষেত্রটিতে দলিতদের চলাফেরার অনেকটাই সুবিধা দেয় ইংরেজি। একজন ইংরেজি জানা দলিতকে দিয়ে মরা গরুর চামড়া ছোলানোর ক্ষমতা হবে কারও? নর্দমা, রাস্তা পরিষ্কার করাতে সাহস পাবে কেউ, একজন ইংরেজি শিক্ষিত দলিতকে দিয়ে? না কি বেগার খাটানোর স্পর্ধা হবে জমিদারের? ইংরেজি দেবী দলিতদের ক্ষমতা দেন। বহু শতকের শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে বেরনোর একটা সুযোগ করে দেন।” মূলত এই ধারণার ওপরেই দঁড়িয়ে রয়েছে প্রসাদের ইংরেজি দেবী প্রতিষ্ঠা। দু'ফুটের ব্রোঞ্জ বিগ্রহটি স্ট্যাচু অব লিবার্টির আকারে গঠিত। একহাতে কলম, যা তাঁর শিক্ষার পরিচয়, অপর হাতে ভারতীয় সংবিধান। আম্বেদকর-কৃত সেই সংবিধান, যা দলিতদের সমমর্যাদা দেয়। অধিকার বুঝে নেওয়ার কথা বলে। পোশাক-আষাকের দিক থেকেও দেবী আধুনিকা। তাঁর মাথায় একটি বড় হ্যাট, যা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় ব্রাহ্মণ্যবাদী পোশাকের ঐতিহ্য সে পদে পদে অস্বীকার করছে।

দলিত কৌমের মধ্যে শিক্ষিতের হার ৫৫%-এরও কম। প্রসাদের বক্তব্য, শহরে বা মফস্‌সলে মানুষ ইংরেজির গুরুত্ব বোঝে। কিন্তু গ্রামে তেমন সচেতনতা নেই। আগামী কুড়ি বছরের মধ্যে যদি দলিতরা ইংরজি শিক্ষায় নিজেদের শিক্ষিত করে তুলতে না পারে, তবে কোনও কাজের জায়গাতেই তারা সুযোগ পাবে না। আর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া জাতের লড়াইয়ে এগোনোর একটি অন্যতম অংশ। সেই কারণেই ইংরেজি দেবী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রামের দলিত মানুষদের ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রসাদ। বঙ্কা গ্রামে প্রায় সাত থেকে আটহাজার দলিত বাস করেন। এই পরিকল্পনা সকলকেই প্রভাবিত করেছে। এমনকী, 'জয় আংরেজি দেবী মাতা' ভজনও শোনা যাচ্ছে মানুষের মুখে মুখে সে অঞ্চলে। এত অভিনব ধর্মাচরণ, যা একই সঙ্গে গণতন্ত্রের হাত শক্ত করে, তার নিদর্শন আর আছে কি?

More Articles

;