বিস্ফোরণের মূল চক্রীর মৃত্যুদণ্ড, ষোলো বছর আগে ঠিক কী ঘটেছিল বারাণসীতে?

ষোলো বছর আগে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল বারাণসীর পুণ্যভূমি। ২০০৬ সালের ৭ মার্চের সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ গিয়েছিল ২০ জনের। আহত হয়েছিলেন ১০০ জনেরও বেশি মানুষ।

২০০৬ সালের ৭ মার্চ ৬টা ১৫ নাগাদ প্রথম বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে কাশীর সংকটমোচন মন্দির। এর ঠিক ১৫ মিনিটের মধ্যেই আবার বিরাট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে বারাণসী ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের ফার্স্ট ক্লাস ওয়েটিং রুমের বাইরে। দশাশ্বমেধ থানার সামনের রেললাইনের পাশে আরও একটি বোমা পাওয়া যায়।

বারাণসী বিস্ফোরণের নেপথ্য কারিগর হিসেবে ওয়ালিউল্লাহ খানকে গ্রেপ্তার করে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। প্রথমে এই মামলা এলাহাবাদ হাই কোর্টে বিচারাধীন ছিল। পরে এলাহাবাদ হাই কোর্ট এই মামলা গাজিয়াবাদ জেলা আদালতে স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দেয়। ষোলো বছর ধরে শুনানি চলার পর অবশেষে দোষী সাব্যস্ত হলেন ওয়ালিউল্লাহ খান। গাজিয়াবাদ আদালত এই মামলায় ওয়ালিউল্লাহ খানের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: মুসলিম বিশ্বের চাপে বেকায়দায় ভারত, সামাল দিতে কী অস্ত্র মোদি-শাহর?

কে এই ওয়ালিউল্লাহ খান?
ওয়ালিউল্লাহ খান উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজের ফুলপুরের বাসিন্দা। ২০০৬ সালের এপ্রিলে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বারাণসী বিস্ফোরণ মামলায় ওয়ালিউল্লাহ খানকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ দাবি করে ওয়ালিউল্লাহ আসলে বাংলাদেশি জঙ্গি সংগঠন হরকত-উল-জেহাদ আল ইসলামির সঙ্গে যুক্ত। বারাণসী বিস্ফোরণে ওয়ালিউল্লাহ-ই মূল ষড়যন্ত্রী।

ওয়ালিউল্লাহ খান ছাড়াও এই মামলায় আরও পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তাদের মধ্যে মৌলানা জাবির নামে এক অভিযুক্ত বিএসএফের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারান। সমস্যা তৈরি হয়, যখন ওয়ালিউল্লাহ খানের হয়ে মামলা লড়তে রাজি হন না কোনও আইনজীবী। ফলে প্রথমদিকে পুলিশ কোর্টে কোনও মামলা দায়ের করতে পারেনি। সেই কারণেই এলাহাবাদ হাই কোর্ট থেকে মামলা স্থানান্তর হয় গাজিয়াবাদ জেলা আদালতে।

ওয়ালিউল্লাহ খানের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের বিশেষ শাখা। এছাড়াও আরও ছয়টি মামলা দশাশ্বমেধ, লঙ্কা ও ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের হয় ওয়ালিউল্লাহ-র বিরুদ্ধে।

জেলা আদালতের বিচারপতি জিতেন্দ্রকুমার সিনহা আইপিসি ৩০২ ধারায় খুন এবং ৩০৭ ধারায় খুনের চেষ্টার মামলায় ওয়ালিউল্লাহকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।

ঠিক কী হয়েছিল সেদিন বারাণসীতে?
দশাশ্বমেধ, সংকটমোচন মন্দিরের মতো জনবহুল এলাকায় বিস্ফোরণ গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল বারাণসীর মতো প্রাচীন ধর্মীয় শহরের নিরাপত্তা। বিস্ফোরণের ঠিক পরেই ৭ মার্চ রাতেই তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিল এবং কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী বারাণসী পৌঁছন। বিস্ফোরণের স্থান ঘুরে দেখার পাশাপাশি সেদিন হাসপাতালে আহতদের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন সোনিয়া গান্ধী।

মুলায়ম সিং যাদব তখন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশি গাফিলতির দায় অস্বীকার করে মুলায়ম সেদিন বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিলেন, উত্তরপ্রদেশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা লস্কর-ইস-তইবার এক সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৫-এর দিল্লি বোমা বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে পুলিশ তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিল।

২০১২ সালে বারাণসী বিস্ফোরণের কেসে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টির সরকারকে কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়েছিল। ২০১২-তে অখিলেশ যাদব সরকার চেষ্টা করেছিল ১৫ জন বিচারাধীন অপরাধীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ মামলা প্রত্যাহার করবে। এই ১৫ জনের মধ্যে ছিল ওয়ালিউল্লাহ খান। এই মর্মে ২০১২ সালের ৮ নভেম্বর উত্তরপ্রদেশ সরকার বারাণসীর ম্যাজিস্ট্রেটকে একটি চিঠি পাঠায়। সেখানে জেলার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের আধিকারিকদের কাছে সরকার বারানসী বিস্ফোরণে অভিযুক্ত হরকত-উল-জিহাদ–ই-ইসলামির জঙ্গি ওয়ালিউল্লাহ খান এবং শামিমের বিরুদ্ধে কেস তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তার আগেই ২৬ আগস্ট ২০০৮ লখনউয়ের আদালত ওয়ালিউল্লাহ খান ও শামিমকে ১০ বছরের জন্য জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয়। সেই সময় লখনউ জেলা আদালতের বিচারপতি শামশের চন্দ্র ত্রিপাঠি অস্ত্র আইনে ওয়ালিউল্লাহ কে আরও তিন বছরের জেল ও ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন। দশাশ্বমেধ থানার বাইরে বোমা রাখার মামলায় উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে মুক্তি দেওয়া হয় ওয়ালিউল্লাহ খানকে।

গাজিয়াবাদ জেলা আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবেন কি না ওয়ালিউল্লাহ খান, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

More Articles

;