জার্নালিজম পড়ে বিয়েবাড়ির ক্যামেরাম্যান!

Wedding Photography: আমাদের না লিখতে পারা কলম আজ কালিকাপুরের কনে আর যাদবপুরের বরের গপ্পে বাইলাইন পায়।

Panchanon Podder
৩ মিনিট
জার্নালিজম পড়ে বিয়েবাড়ির ক্যামেরাম্যান!

আমরা যারা ক্লাস সিক্সে গৌতম ভট্টাচার্য, দেবাশীষ দত্তকে পড়ে সাংবাদিক হতে চাইলাম, চাইলাম লাহোরের প্রেসবক্সে থেকে উঁকি মেরে ইমরান খান আর ক্রিজের সচিন-কাইফকে কভার করতে, তাদের কেউ কেউ স্বপ্নভঙ্গের ভেলায় চেপে আজ বিয়েবাড়ির ক্যামেরাম্যান! বছরের শুরুতে লাল পঞ্জিকা হাতড়াচ্ছি, ধর্মতলার ক্যামেরা গলি থেকে একবুক আশা নিয়ে বেরোচ্ছি ধানবাদের বিয়েবাড়ি কভার করব বলে।

আমাদের কেউ কেউ বরখা দত্তকে দেখে ভেবেছিল কার্গিল যাবে, সুমনকে দেখে আঙুলটা উঁচিয়ে কেউ দিয়েছিল তার প্রথম স্মার্টফোনের ওয়ালপেপার। দেশকল্যাণ চৌধুরীর তোলা ছবি আমাদের শিহরিত করেছিল! শেখর গুপ্তার 'ওয়াক দ্য টক', জয়ন্ত ঘোষালের 'দিল্লি থেকে বলছি' দেখতে আর পড়তে গিয়ে যাদের স্বপ্ন রাইটার্সের অলিন্দ থেকে ইমরান খানের ব্যালকনি পর্যন্ত অবাধে যাতায়াত করত, তাদেরকেই একদিন কলেজের পঁয়ত্রিশ নম্বর ঘরে প্রফেসরের মুখ থেকে শুনতে হলো, "জার্নালিজম পড়ে বিয়েবাড়িতে মানুষকে হাসতে বলিস? লজ্জা করে না?"

বিয়েবাড়িতে রাত জাগা ক্যামেরা, লাইট, ঠান্ডা খাসির মাংস জাগিয়ে রাখল এই মফসসলের ছেলেদের। পরদিন ক্লাসে গিয়ে প্রফেসর বললেন, "এটা ঘুমোনোর জায়গা? বিয়েবাড়িতে গিয়ে ঘুমাও।"

নভেম্বরের ১৭ তারিখ এলেই আমাদের উপস্থিতির হার কমে গেল ক্লাসে। গায়ে হলুদ শেষ করে সেমিস্টারের পরীক্ষা, সেই পরীক্ষার পর রুদ্ধশ্বাসে পেরোলাম বিটিরোড, বেলঘড়িয়ার ফিডার রাস্তা। টুজি স্মার্টফোনে হিস্ট্রি অফ জার্নালিজম পড়তে পড়তে আগুনে পড়ল খই, একটার পর একটা কুসুমডিঙা পেরনোর লাল-সবুজ ছবি রেকর্ড করতে গিয়ে আমরা একটু একটু করে ভুলে গেলাম মাস্টার ব্লাস্টারের শারজায় মরুঝড়, ব্রায়ান লারার চারশো, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শেষ ব্রিগেড, স্টেফি গ্রাফ-আন্দ্রে আগাসিকে। চিরতরে মৃত্যু হলো উইম্বলডন নামের একটা স্বপ্নের!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কনসার্ট থেকে বিয়েবাড়ি- নেই সেই আবাহন, হারিয়েই যাবে বিসমিল্লার 'পাগলা' সানাই?

Bismillah Khan Shehnai: ১৯৪৭ সালে যখন ভারত স্বাধীন হওয়া নিশ্চিত, তখন জওহরলাল নেহরু মনে করেছিলেন বিসমিল্লাহ খানের এই উপলক্ষ্যে সানাই বাজানো উচিত।

এজেসি বোস রোডে গণশক্তি, পোদ্দার কোর্টে চব্বিশ ঘণ্টা, চাঁদনী চকে আনন্দবাজার-প্রতিদিন ঘুড়ে বেরিয়েছি। বায়োডাটার পর বায়োডাটা জমেছে, সদ্য শেখা অ্যাডোবিতে নকশা বেড়েছে সেই বায়োডেটার। তবু একবারের জন্য কেউ উঠিয়ে ফোন করেনি। পরীক্ষা নেয়নি। ডাকেনি একটা চাকরির ইন্টারভিউয়ের জন্য। রাজনীতি আর তাঁবেদারির ফস্কাগেরোর জনঅরণ্যে আমাদের বলা হয়ে ওঠেনি মানিকবাবুর সিনেমার মতো 'আর ইউ আ কমিউনিস্ট?'-এর উত্তর।

একবার এক পরিচিত সিনিয়র সাংবাদিককে ফোন করে একটি চাকরি চেয়েছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, "ববি হাকিম তোকে চেনে? তুই ফোন করলে চিনতে পারবে তো? কিংবা ববি হাকিম ছাড়াও যে কোনও একটা রাজনৈতিক দলের নেতার নাম বল, যে তোকে চেনে। ফোন করলে সাক্ষাৎকার দেবে।" উত্তরে সেদিন একটাও নাম বলতে পারিনি। তাই পাল্টা উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, "তাহলে তোকে কেন চাকরি দেবে বর্তমান-প্রতিদিন?"

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সমলিঙ্গে বিয়ে করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় দাবি নয়

Same Sex Marriage : পাঁচ বছরের মধ্যে সমলিঙ্গে বিবাহকে আদালত মান্য়তা দিয়ে দেবে, এমন ভাবনাটাও একটু বেশি রকমের প্রত্যাশা।

তারপর একদিন ইন্টারনেটের ব্যবহার সহজ হলো বাঙালির কাছে। পাড়ার মা মনসা স্টুডিও নয়, বরং ফেসবুক ঘেঁটে কেউ কেউ খুঁজল 'বেস্ট ওয়েডিং ফটোগ্রাফার ইন কলকাতা'। আমরাও সেই তালিকায় নাম লেখালাম। ভাড়ার ক্যামেরা একদিন নিজের হলো। ফেসবুকের নীল দেওয়ালে টুংটাং মেসেজে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, শিলিগুড়ি, কলকাতা থেকে মানুষ খোঁজ নিল, জানতে চাইল, "আপনাদের রেট কত?"

লাইক বাড়তে শুরু করল ফেসবুকের পাতায়। আমরাও লাইক করে ফেললাম মোটা অঙ্কের টাকা, পুরুতের মন্ত্রপাঠের সঙ্গে মিশে যাওয়া বিসমিল্লাহর সানাইকে। 'যা কামাই সব ইএমআই'-এর যুগে ক্যামেরার পেছনে লাইট ধরে একদিন নিজের ডিএসএলআর কিনে ফেলল বামুনগাছির পাপাই সাহা, নন্দীগ্রামের শিবশঙ্কর গিরি, হৃদয়পুরের রাজ পাল।

জয়ন্ত ঘোষাল, শেখর গুপ্ত, প্রণয় রায়, গৌতম ভট্টাচার্যরা বুড়ো হয়েছেন আজ। সাংবাদিকরাই আজ ঠিক করে দিচ্ছেন চট্টগ্রাম ভারতের সঙ্গে থাকবে না কি বাংলাদেশের। যে মেট্রোরেল সকাল সাড়ে দশটায় থামার কথা ছিল, স্বপ্ন ছিল হেঁটে যাব প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে, আজ সেই মেট্রো অগ্রহায়ণের শুরুতে এসপ্ল্যানেড থেকে ক্যামেরা গলি যায়। আমাদের না লিখতে পারা কলম আজ কালিকাপুরের কনে আর যাদবপুরের বরের গপ্পে বাইলাইন পায়।

সেই গল্পে ঠান্ডা খাসির মাংস থাকে। শিলিগুড়ি থেকে সরসুনা— কত মানুষের উৎসবে মিশে যাওয়া থাকে। হঠাৎ পাওয়া অপমান থাকে। মাঝরাতে খোঁজ থাকে "ম্যাডাম আমরা কোথায় থাকব?" নামক একটা আজব প্রশ্নের। কত মানুষের আপন করে নেওয়াও থাকে। থাকে "তুমি বিয়েবাড়ির ছবি তোলো। তোমার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেব না" নামের একটা অতি সরলীকরণ অপমান। তবু কিছুই কি পাইনি আমরা? নিশ্চয়ই পেয়েছি।

আজ কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে বাঙালি এই বিয়েবাড়ির ক্যামেরাম্যানদের পেছনে। বিয়েবাড়ির ভিডিও নয়, ওয়েডিং ফিল্ম বানাই আমরা। ২০১১-২০১২ সালে শিয়ালদহ-হাওড়া স্টেশনে মধ্যরাত্রে দাঁড়িয়ে আমরা শাটল ট্যাক্সি খুঁজতাম ২০ টাকার বিনিময়ে। আজ আমাদের মধ্যে কেউ কেউ গাড়ি কিনেছে। নইলে ওলা-উবরে ফিরছে হরিদেবপুর থেকে হৃদয়পুর। আমাদের তোলা ছবি ফেসবুক থেকে অবলীলায় চুরি করেছে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট! তবু সেই একটা আক্ষেপ 'আমরা সাংবাদিক হতে পারলাম না'! এটা কি স্বপ্নের মৃত্যু? না কি সব পেলে নষ্ট জীবন?

লিখেছেন
Panchanon Podder
Panchanon Podder
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।