ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে লড়াই কি এখানেই শেষ?

Brij Bhushan: তবে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে আগেই অভিযোগ উঠেছিল, সাক্ষীদের প্রভাবিত করার বা প্রমান লোপাট করার চেষ্টা করছেন তিনি।

Tanvia Barua
৪ মিনিট
ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে লড়াই কি এখানেই শেষ?

বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ তথা কুস্তি ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি ব্রিজভূষণ শরণ সিং-কে পকসো মামলা থেকে রেহাই দিল আদালত। জানা গিয়েছে, অভিযোগকারী এবং তাঁর বাবা স্বীকার করে নিয়েছেন, তাঁরা ভুয়ো অভিযোগ করেছেন। তাঁদের এই বয়ানের ভিত্তিতেই দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, এই মামলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। ইকোনমিক টাইমস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গতবছর এক শুনানিতে অভিযোগকারী নিজে জানিয়েছিলেন, তদন্ত নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। এই মামলা যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তিনি তাঁর বিরোধিতা করবেন না। তবে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে আগেই অভিযোগ উঠেছিল, সাক্ষীদের প্রভাবিত করার বা প্রমান লোপাট করার চেষ্টা করছেন তিনি। উল্লেখ্য, গত লোকসভা ভোটের আগে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর মন্তর-এ দীর্ঘদিন প্রতিবাদ করেছিলেন কুস্তিগিরেরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন- সাক্ষী মালিক, বিনেশ ফোগট, বজরং পুনিয়ারা। বিজভূষণের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে তাঁকে কুস্তি সংস্থার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যদিও পরে ব্রিজভূষণেরই ঘনিষ্ঠ সঞ্জয় সিং দায়িত্ব পান। যা নিয়ে আপত্তি ছিল কুস্তিগিরদের। এমন অবস্থায় গত বছর ২৪ ডিসেম্বর ভারতীয় কুস্তি সংস্থাকে সাসপেন্ড করেছিল কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রক। যদিও পরে তা তুলে নেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে কি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন বাহুবলী ব্রিজভূষণ?

ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে ৬ জন মহিলা কুস্তিগির যৌন হেনস্থার অভিযোগ করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে দিল্লি-পুলিশ চার্জশিট দাখিল করেছিল। অভিযোগকারীদের মধ্যে একজন নাবালিকাও ছিলেন। তার জন্য ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে পকসো ধারাতে মামলা করা হয়েছিল। আদালতে চার্জশিট দেওয়ার সময়েই পকসো মামলাটির বাতিলের আর্জি জানিয়ে আদালতে রিপোর্ট জমা দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ। এ বিষয়ে অভিযোগকারী নাবালিকা এবং তাঁর পিতাকে নোটিস দিয়েছিল আদালত। এই নিয়ে তাঁদের জবাব জানতে চাওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের অগস্ট মাসে তাঁরা সশরীরে হাজিরাও দিয়েছিলেন। এখন প্রতিবেদনে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, ওই অভিযোগকারী নাবালিকা এবং তাঁর বাবার বক্তব্যের ভিত্তিতেই মামলাটি বাতিল করার অনুরোধ করা হয়েছে।

কিন্তু ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মামলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এরপর সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্টেও লড়া যেতে পারে। কারণ, ২০২৪ সালের মে মাসে, দিল্লির রাউজ অ্যাভিনিউ আদালত এই মামলায় পর্যাপ্ত প্রমাণ দেখে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে চার্টশিট তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিল। প্রধান মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (এসএমএম) প্রিয়াঙ্কা রাজপুত ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে আইপিসি-র ধারা ৩৫৪ (মহিলার মর্যাদায় আঘাত করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ বা অপরাধ মূলক বল), ৩৫৪-এ (যৌন নির্যাতন), এবং (অপরাধমূলক হুমকি) এর অধীনে অভিযোগ দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিচারক বলেছিলেন যে অভিযুক্তর বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়টি যেমন বিদেশে টুর্নামেন্ট চলাকালীন হয়েছে, তেমনই ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের প্রধান দফতর, ব্রিজভূষণ শরণ সিং-এর আবাস-এও হয়েছে বলে অভিযোগ। এমনটাও অভিযোগ রয়েছে যে, প্রথমে দিল্লি পুলিশ এফআইআর দায়ের করেনি, বাধ্য হয়ে কুস্তিগীররা সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন। শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পর এফআইআর দায়ের করেছে পুলিশ। আন্তজার্তিক অলিম্পিক্স কমিটি, আইওসি ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হেনস্থার অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্তও দাবি করেছিল।

গত লোকসভা ভোটের আগে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর মন্তর-এ দীর্ঘদিন যে প্রতিবাদ করেছিলেন কুস্তিগিরেরা, সে সময়ও দীর্ঘ দিন পুলিশ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ। শেষে বাধ্য হয়ে যন্তর মন্তরে টানা ৪০ দিন ধর্না করেন বজরং, সাক্ষীরা। তখন এই পুরো ঘটনায় দেশের ক্রীড়া মন্ত্রী কোনো বয়ান দেননি। নতুন পার্লামেন্ট ভবন উদ্বোধনের দিন আন্দোলনরত কুস্তিগীরদের মিছিল পুলিশ আটকে দেয়, তারপর মাটিতে ফেলে, চ্যাংদোলা করে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়। এরপর আবার ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর, জাতীয় কুস্তি সংস্থার নির্বাচনে জয় লাভ করে ব্রিজভূষণের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সঞ্জয় সিং, যা প্রতিবেদনের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ক্ষোভে কুস্তি থেকে অবসর নেয় ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিক্সে পদকজয়ী প্রথম মহিলা প্রাক্তন কুস্তিগীর সাক্ষী মল্লিক। যন্তর মন্তরে আন্দোলনের সময় এই সাক্ষী-কেই টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানেও তোলা হয়েছিল। সে সময় হরিদ্বারে গঙ্গার জলে পদক ভাসিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। নারী কুস্তিগিরদের যৌন হেনস্থা এবং আন্তর্জাতিক স্তরের খেলোয়াড়দের প্রতিবাদের পর কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে ছিল বিজেপি সরকার।

১২ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিলেন ব্রিজভূষণ। এর পর যখন ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন সঞ্জয় সিং, সে সময় অনেকেই বলেছিলেন, জিতলেন ব্রিজভূষণই। কারণ, তিনি ব্রিজভূষণেরই ঘনিষ্ঠ এবং ব্যবসার অংশীদার। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ব্রিজভূষণই কেন্দ্রীয় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তা দিয়েছিলেন, "যাঁদের ভোটের ফলে শিক্ষা নেওয়ার, তাঁরা নিক! কুস্তিতে তাঁদের দাপট ছিল এবং আগামীতেও থাকবে। এটি সমস্ত দেশের পালয়ানদের জয়।" প্রশ্ন উঠেছিল, যাঁর জন্য অলিম্পিক্স পদকজয়ীদের ঘাড় ধরে প্রিজন ভ্যানে তোলা হলো, যাঁর জন্য হরিদ্বারে গঙ্গার জলে পদক ভাসিয়ে দিতে গেলেন কুস্তিগিরেরা তাঁরই ঘনিষ্ঠ কে ক্ষমতায় বসানো দেশের পালয়নদের জয় হতে পারে? শেষে সাক্ষী বলেছিলেন, আর কখনও মাঠে নামবেন না। এই নিয়ে ব্রিজভূষণ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে, তিনি সাংবাদিকদের বলেন- "তাই নাকি? কী জানি! এর সঙ্গে আমার কি যোগাযোগ আছে?"

গুজরাত দাঙ্গায় বিলকিস বানোর ধর্ষক এবং পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে খুনে ১১ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে মুক্তি দিয়েছে সে রাজ্যের বিজেপি সরকার। গুজরাটের বিজেপি সরকার তাদের মালা পরিয়ে বরণ করেছিল। অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই কিন্তু ওই রেমিশনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিলমোহর দিয়েছিল। পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস জাতীয় প্রেসিডেন্ট কবিতা শ্রীবাস্তব বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে গুজরাত সরকারের সঙ্গে অপরাধীদের যোগসাজশ ছিল। যদি গুজরাট সরকার বিলকিস বানোর জন্য ন্যায় বিচার চাইত, সুপ্রিম কোর্টের কাছে তার আগের রায়ের বিষয়ে জানতে চাইতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে গুজরাত সরকারের সঙ্গে দোষীদের মধ্যে যোগসাজশ ছিল।”

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।