ভাঙা নাকের দুর্গা! বোলপুলের দেউলির পুজো যে কারণে অনন্য

Deuli Durga Puja: বলা হয়, দেউলির এই দুর্গামূর্তিও কালাপাহাড়ের তরবারির কোপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দেবীর নাকের অংশ কেটে যায়। তারপর থেকেই গ্রামবাসী দেবীকে ডাকতে থাকেন ‘খ্যাঁদা পার্বতী’।

Mukut Tapadar
২ মিনিট
ভাঙা নাকের দুর্গা! বোলপুলের দেউলির পুজো যে কারণে অনন্য

যে শক্তির আদি বা অন্ত নেই, বিশ্বে তিনি সর্বশক্তিমান রূপে প্রকাশিত। যে শক্তি অসুর নিধনে আবির্ভূতা, চন্ডীমাহাত্ম্যে দেবীরূপে তিনিই দুর্গা। শত বাধা, বিঘ্ন ও নৈরাশ্যের মধ্যে দেবীর আগমনী বার্তা উদ্ভাসিত হয়। সর্বব্যাপী তাঁর বন্দনা লক্ষিত হয়।

ভারতের প্রাচীনতম দুর্গামূর্তি বোলপুর শহরের কাছে অজয় নদের পাড়ে দেউলি গ্রামে পাওয়া যায়। যাকে ঘিরে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন বহু কাহিনী। দেউলি জনপদ ও চারপাশের এলাকা এক পুণ্যক্ষেত্র। এখানকার পাথরের দেবীমূর্তি প্রধান আকর্ষণ, যা পাল যুগের সময়কার। নীরবে নিভৃতে এখনও বয়ে চলেছে তাঁর ইতিহাস। দেবী মন্দিরের পাশে উঁচু ইঁটের এক শৈব দেউল— দেউলেশ্বর মহাদেব। সেই থেকেই এ জনপদের নামকরণ দেউলি। এখানেই মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব কবি লোচন দাসের সিদ্ধাসন।

প্রাচীন দেউলি জনপদে লুকিয়ে রয়েছে নানা অজানা অধ্যায়। নীহাররঞ্জন রায় জানিয়েছেন, বোলপুরের অনতিদূরে সিয়ান গ্রামের শাহজানপুর পাড়ার এক দরগায় জীর্ণ দুটি শিলালেখ পাওয়া গেছে। এগুলি পালবংশীয় রাজা নয়পালের সময়কার। ওই শিলালেখ থেকে তাঁর ধর্মকর্ম সংক্রান্ত নানা কীর্তির তথ্য মেলে। দীনেশচন্দ্র সেন মশাই শিলালেখগুলির পাঠোদ্ধার করেন। প্রথম দিকে নয়পালকে শৈব ও বৌদ্ধ উভয়ই মনে করা হত।

দেউলি জনপদের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে অজয় নদ

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এসেছেন বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথও! মানকরের কবিরাজ বাড়ির দুর্গাপুজোর ৩০০ বছর

Durga Puja at Kabiraj's house in Mankar: এ বাড়ির দুর্গাপুজোর বয়স ৩০০ বছরেরও বেশি। এখনও প্রথা মেনে চলে পুজো। প্রতিমা একচালার তলায় স্থাপিত হয়, যেখানে দুর্গা ও তাঁর পরিবার থাকেন।

জানা যায়, পালবংশীয় এই রাজা পাথরের একাধিক দুর্গামূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রথমে নয়টি পাথরের দুর্গামূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন, পরবর্তীতে চৌষট্টি মাতৃকা মূর্তিরও প্রমাণ মেলে। নয়পালের উপাস্য ছিলেন শিবের পরেই দুর্গা। দেউলির মন্দির ও প্রাচীন দুর্গামূর্তিটি অজয়ের পাড় ঘেঁষে রয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছে যা পরিচিত ‘খ্যাঁদা পার্বতী’ মন্দির নামে।

বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের শিষ্য ছিলেন রাজা নয়পাল। সুশাসক হিসেবে তিনি খ্যাত ছিলেন। তিনি প্রথম মহিপালের পুত্র। বোলপুরের আশেপাশে শৈব ক্ষেত্র, মন্দির এবং অজয়ের নৌবন্দর বহু ঐতিহাসিক স্মৃতি ধারণ করে আছে। এককালে এই নৌবন্দর দিয়ে কার্পাস, রেশম, তসর, নীল, লাক্ষা রফতানি হত দেশ-বিদেশে, এমনকি তিব্বতেও। দেউলির স্থানীয় পুকুর খননকালে পাল ও সেন আমলের বহু মূল্যবান প্রাচীন মূর্তি উদ্ধার হয়।

পুরাতত্ত্ববিদদের মতে, দেউলিতে বৃহৎ দুর্গার প্রস্তরমূর্তিটি পাল যুগের। পাদপীঠের উপর দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করছেন। মূর্তির পিছনের অংশে দুইপাশে অপ্সরা, মাথায় কীর্তিমুখ। নীচে মহিষের মাথা থেকে বেরিয়ে আসছেন মহিষাসুর। বামদিকে রয়েছে শার্দুল। পাথরের এই মূর্তির শিল্পশৈলী আজও তাক লাগায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জঙ্গলেই প্রথম পুজো করেন রাজা সুরথ! কেমন ছিল প্রথম দুর্গাপুজো?

Raja Surath Durga puja: পুজোর সময় এই জঙ্গলে বহু পুণ্যার্থী ছুটে আসেন। দুর্গাপুজোর চারদিন মহা সমারোহে পুজো হয়। প্রতি বছর পুজো আসে পুজো যায়, তবে তাকে কেন্দ্র করে বহু দূর দূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষের জমায়েত হয়।

দেউলি গ্রাম

দেউলি জনপদে একসময় মারাঠা বর্গীদের হানা হয়েছিল। তাঁদের অভিযানে এখানকার বহু বাড়িঘর ও দেবালয় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তবে ‘খ্যাঁদা পার্বতী’ নামকরণের পিছনে রয়েছে অন্য ইতিহাস। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মুঘল-পরবর্তী সময়ে কালাপাহাড় এখানে মন্দির ধ্বংস করতে আসেন। আজও বাংলার বিভিন্ন জায়গায় ভাঙা মূর্তির নিদর্শন দেখা যায়, যেগুলো তাঁর ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীক। তবে সব মূর্তি তিনি ভাঙেননি— অনেকসময় অন্য কারণে তাঁর নামে দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়, দেউলির এই দুর্গামূর্তিও কালাপাহাড়ের তরবারির কোপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দেবীর নাকের অংশ কেটে যায়। তারপর থেকেই গ্রামবাসী দেবীকে ডাকতে থাকেন ‘খ্যাঁদা পার্বতী’। বর্তমানে সংস্কার হওয়া এই মন্দিরেই মূর্তির পুজা হয়।

দেউলেশ্বর মহাদেব ঠাকুরের দেউল

কথিত আছে, গোটা দেউলি গ্রামে আর কোথাও দুর্গোৎসব হয় না। এ এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। প্রতি শরৎকালে শাস্ত্রমতে এই মূর্তির পূজা হয়। পূজাকে ঘিরে দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ ভিড় জমান। পুজোর দিনগুলোতে বর্ণাঢ্য পরিবেশে মুখরিত হয় দেউলি। স্থানীয় মানুষের উন্মাদনা গড়ে ওঠে একমাত্র এই পূজাকে কেন্দ্র করে।

লিখেছেন
Mukut Tapadar
Mukut Tapadar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।