NCERT-এর নতুন বই থেকে উধাও দক্ষিণ ভারত! পাঠ্যপুস্তক রাজনীতি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে

NCERT Class 8 Textbook Controversy: হায়দর আলি এবং টিপু সুলতান উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে প্রথম বড় প্রতিরোধ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের নিয়ে কোনো আলাদা অধ্যায় নেই।

inscript
৩ মিনিট
NCERT-এর নতুন বই থেকে উধাও দক্ষিণ ভারত! পাঠ্যপুস্তক রাজনীতি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে

ভারতের স্কুলশিক্ষার ভিত গড়ে দেয় যে পাঠ্যপুস্তকগুলি, তার মধ্যে অন্যতম NCERT-র বই। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে অষ্টম শ্রেণির নতুন একটি সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তক— 'Exploring Society: India and Beyond (Part 1)। বইটি বাজারে আসার পরই একের পর এক শিক্ষাবিদ, গবেষক ও ইতিহাসবিদদের অভিযোগ, দক্ষিণ ভারতের ইতিহাস প্রায় পুরোপুরি উধাও। এই বইয়ে নাকি 'উত্তর ভারত-কেন্দ্রিক ভারতের ইতিহাস' লেখা, সেই অভিযোগও উঠছে।

বইটি পড়তে শুরু করলে প্রথমেই চোখে পড়ে দিল্লির সুলতান, মুঘল সাম্রাজ্য, উত্তর ভারতের প্রশাসনিক কাঠামো, ঔপনিবেশিক শাসন এগুলোই ইতিহাস অংশের কেন্দ্রে। কিন্তু ভারতের ইতিহাস তো শুধু দিল্লি, আগ্রা, পাটনা অথবা লখনউ-এর গল্প নয়। ভারতের ঐতিহ্য, বিজ্ঞানচর্চা, সাম্রাজ্য নির্মাণ, সামুদ্রিক বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই দক্ষিণ ভারত ছিল অগ্রগণ্য। অথচ এই বইয়ে বিজয়নগর সাম্রাজ্য নেই বিস্তৃতভাবে। চোল, পাণ্ড্য, চেরা— এই তিন প্রাচীন ও মহান রাজ্যের প্রশাসন, স্থাপত্য, বাণিজ্য, শিল্প আর সামাজিক কাঠামো প্রায় গায়েব।

হায়দর আলি এবং টিপু সুলতান উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে প্রথম বড় প্রতিরোধ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের নিয়ে কোনো আলাদা অধ্যায় নেই। চারটি অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধ ভারত ও ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এর একটিও নেই পাঠ্যবইয়ে। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ ভারতের সাহিত্য, জ্ঞানচর্চা, দ্রাবিড় ভাষার বিকাশ, সমুদ্রপথের বাণিজ্য কোনোটিকেই বিস্তারিত অধ্যায়ে রাখা হয়নি। অর্থাৎ, দক্ষিণ ভারতের পুরো সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস একধরনের ছায়াপথে তোলা হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইতিহাস ও ইতিহাসচর্চার আলোকে পলাশীর যুদ্ধ ও সিরাজদ্দৌলা  

Siraj ud-Daulah: পলাশী যুদ্ধের কারণের সঙ্গে সিরাজের চরিত্র নিয়েও ঐতিহাসিক-গবেষক মহলে তর্কবিতর্ক প্রচুর। আসুন দেখা যাক সেই তর্কবিতর্কের কিছু ঝলক।

ইতিহাসবিদদের মতে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের সংস্কৃতি চেনার অনেকটাই নির্ভর করে তারা স্কুলজীবনে কী শেখে তার উপর। এখানেই সমস্যার শুরু। দক্ষিণ ভারতের ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারছে না। আর অন্যদিকে উত্তর ভারতের ছাত্রছাত্রীরাও ভাববে, ভারতের ইতিহাস মানেই উত্তর ভারতের ইতিহাস। এতে ভারতের বহুত্ববাদী চেতনাকে একরকম দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে NCERT-র এই বই।

সমালোচকরা বলছেন, ইতিহাস তো শুধু যুদ্ধ বা রাজবংশের গল্প নয়; ইতিহাস হলো মানুষের, সমাজের, ভাষার, নদীর, স্থাপত্যের গল্প। দক্ষিণ ভারত বাদ পড়লে ভারতের ইতিহাস মানেই ‘দিল্লি-আগ্রা কেন্দ্রিক একখানি গল্প’ এটাই মনে গেঁথে যাবে। তবে NCERT-এর ব্যাখ্যা, এই বইটি ‘খণ্ড ১’। পরবর্তী খণ্ডে নাকি দক্ষিণ ভারতের ইতিহাস ও অন্যান্য বাদ পড়া অধ্যায় যোগ করা হবে। তাদের দাবি, বইটিকে খুব বেশি জটিল না করতে কিছু অধ্যায় কমানো হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজে বুঝতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়েছে, সেগুলো কি সত্যিই বইটিকে জটিল করত? নাকি এই বাদ দেওয়ার পেছনে রয়েছে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য?

শিক্ষাবিদদের দাবি, এই পরিবর্তনগুলি আকস্মিক নয়। কয়েক বছর ধরে পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের কাঠামো বদলানো, কিছু বিষয় বাদ দেওয়া ও কিছু বিষয় বাড়ানো এসব চলছে একটি নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য নিয়েই। দক্ষিণ ভারতের সমৃদ্ধ ইতিহাস বাদ দেওয়া আসলে সেই পরিবর্তনেরই অংশ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইতিহাসে উপেক্ষিত রয়ে গেলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের যে শহিদ নারীরা

অনেক অজানা নাম আজও ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে আছে, যাঁরা দেশের জন্য প্রাণপাত করেছিলেন।

এই বাদ দেওয়া কেন বিপজ্জনক? ভারতকে বোঝার জন্য শুধু দিল্লি জানলেই হয় না। কেরল, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলিও ভারতের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাঠ্যবই সেই ইতিহাসকে স্থান না দিলে জাতীয় পরিচয় একপেশে হয়ে যায়। আর উপনিবেশ-বিরোধী ইতিহাসও বিকৃত হবে; কারণ ভারতের প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ— টিপু সুলতানের লড়াই এই বইয়ে নেই। তাহলে উপনিবেশবাদের প্রকৃত গল্প কীভাবে জানবে শিক্ষার্থীরা?

এছাড়া দ্রাবিড় স্থাপত্য, দক্ষিণ ভারতীয় লিপি, মন্দিরশিল্প, করমণ্ডল উপকূলে সামুদ্রিক বাণিজ্য এসব বাদ গেলে ভারতকে বোঝাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এতে অঞ্চলভিত্তিক বঞ্চনা তৈরি হয়; যে অঞ্চলের মানুষরা দেশের জন্য এত ভূমিকা রেখেছে, তাঁরা পাঠ্যপুস্তকে এগুলোকে বঞ্চনা বলেই উল্লেখ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

NCERT-এর নতুন ক্লাস ৮ পাঠ্যপুস্তক ভারতের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরলেও দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসকে কার্যত অদৃশ্য করে দিয়েছে। এটি একদিকে যেমন শিক্ষাগত ত্রুটি, তেমনই দেশের ইতিহাস-চরিত্রকে একমুখী করে দেওয়ারও আশঙ্কাজনক প্রবণতা। ভারতকে বোঝার জন্য দক্ষিণ ভারতকে বাদ দেওয়া যায় না। পাঠ্যপুস্তক যখন সেই প্রয়োজনীয়তাকেই অস্বীকার করে, তখন তার ক্ষতি শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, সমস্ত প্রজন্মের চিন্তা-চেতনায় প্রভাব ফেলে।

প্রশ্ন উঠছে, সমালোচকদের আশঙ্কাই কি ঠিক? ভারতের ইতিহাস কি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? ভারতের বহুত্ববাদী, বহু-অঞ্চলীয় ইতিহাসকে কি সত্যিই ধীরে ধীরে একক ও উত্তর-কেন্দ্রিক ভাবে সাজানো হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার নয়, এগুলি দেশের গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাসচর্চা এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।