সারদা দেবী: নারীমুক্তির প্রশ্নে আজও সমান প্রাসঙ্গিক

Sarada Devi: লেডি ডাফরিন হাসপাতালে একটি নার্সের পদ খালি হয়। মা সারদা তখন একটি মেয়ের নাম সেই কাজের জন্য প্রস্তাব করেন। কিন্তু সমাজ প্রতিবাদে গর্জে ওঠে।

inscript
৪ মিনিট
সারদা দেবী: নারীমুক্তির প্রশ্নে আজও সমান প্রাসঙ্গিক

বাঁকুড়ার জয়রামবাটীতে, ছোট্ট একটি গ্রাম্য বাড়িতে, ১৮৫৩ সালের ২২শে ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করে একটি কন্যাসন্তান। নাম রাখা হল 'ক্ষেমঙ্করী'। পরে ক্ষেমঙ্করী নামটি পালটে 'সারদামণি' রাখা হয়। কে জানত, এই সাধারণ গ্রাম্য বালিকা একদিন 'মা সারদা' নামে পরিচিত হয়ে উঠবেন?

ভগিনী নিবেদিতা একবার বলেছিলেন, "Is she the last of an old order? Or a beginning of a new?" অর্থাৎ, তিনি কি পুরনো যুগের শেষ প্রতিনিধি? না কি নতুন যুগের শুরু? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে, মা সারদার জীবন আমাদের নিয়ে যায় এক অসাধারণ যাত্রায়– যেখানে পুরনো রীতি-নীতি এবং আধুনিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

সেই যাত্রার শুরু হয় জয়রামবাটীর সেই ছোট্ট বাড়িতে। সারদামণির বাবা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক ও পুরোহিত, আর মা শ্যামাসুন্দরী দেবী ছিলেন গৃহিনী। দরিদ্র হলেও রামচন্দ্র ছিলেন পরোপকারী ও দানশীল। ছোটবেলা থেকেই সারদামণি ছিলেন অসাধারণ। সারদা দেবীর প্রথাগত বিদ্যালয় শিক্ষা একেবারেই ছিল না বললেই চলে। ছোটবেলায় মাঝে মাঝে ভাইদের সঙ্গে পাঠশালায় যেতেন, তখন তাঁর অক্ষরজ্ঞান হয়েছিল। পরবর্তী জীবনে কামারপুকুরে রামকৃষ্ণদেবের ভ্রাতুষ্পুত্রী লক্ষ্মী দেবী ও শ্যামপুকুরে একটি মেয়ের কাছে পড়াশোনা শেখেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রামকৃষ্ণ-সারদা-স্বামীজির স্মৃতি ছড়িয়ে, উইকএন্ডে ঘুরে আসুন ঘরের কাছের এই তীর্থে

স্বামী বিবেকানন্দর স্মৃতিধন্য এই গ্রামে এলে মনের মধ্যে ভক্তিরস জারিত হবেই, তা নিশ্চিত।

১৮৫৯ সালের মে মাসে, সেকালে প্রচলিত গ্রাম্য প্রথা অনুসারে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে। তিনি তখন কামারপুকুরের ২৩ বছর বয়সি এক যুবক। কিন্তু এই বিয়ে সাধারণ দাম্পত্যের মতো ছিল না। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে দেখতেন মায়ের রূপে। আর সারদা দেবী হয়ে উঠলেন তাঁর আধ্যাত্মিক সঙ্গিনী। দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে এসে তিনি শুরু করলেন এক নতুন জীবন– পূজা-পাঠ, ধর্মকর্ম, সেবা। একদিকে দেখলে মনে হয়, এ তো পুরনো যুগের ছবি। মেয়েরা ঘর সামলাবেন, পূজা করবেন, স্বামীর সেবা করবেন। কিন্তু সত্যিই কি তাই? ভগিনী নিবেদিতার প্রশ্ন এখানেই চিন্তার জন্ম দেয়। মা সারদা কি সেই পুরনো ব্যবস্থার শেষ প্রতিনিধি? না, তিনি তো নতুন যুগের প্রথম আলো!

সেই সময়, লেডি ডাফরিন হাসপাতালে একটি নার্সের পদ খালি হয়। মা সারদা তখন একটি মেয়ের নাম সেই কাজের জন্য প্রস্তাব করেন। কিন্তু সমাজ প্রতিবাদে গর্জে ওঠে। "হিন্দু ঘরের মেয়ে গিয়ে রোগীদের মল-মূত্র ঘাঁটবে? এটা অসম্ভব!" কিন্তু মা সারদা? তিনি তখন শান্তভাবে বললেন, "না না, ও গিয়ে শিখুক না, তারপর শিখে এসে তো আমাদেরই সেবা করবে।" এই কথায় লুকিয়ে ছিল এক নীরব বিপ্লব। সেই মেয়েই ছিলেন পরবর্তীকালের সারদা মঠের প্রথম প্রেসিডেন্ট প্রভাজিকা ভারতীপ্রানা মাতাজী। যেখানে, আজকের দিনেও অনেকে নার্সিং নিয়ে নাক সিটকোন। সেখানে, তখনকার দিনে তো, ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়েরা ঘরের বাইরে পা রাখত না, মা সারদা ভাঙলেন সেই ট্যাবু। সেই মেয়ে গেলেন নার্সিং শিখতে, এবং পরে প্রেসিডেন্ট হয়ে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত হলেন। মা সারদা যেন দেখিয়ে দিলেন, আধুনিকতা মানে শুধু পশ্চিমী পোশাক বা চাকরি নয়, আধুনিকতা মানে সমাজের সেবা, দৃঢ়তা, এবং সমাজের পুরনো বাধা, চিন্তা-ভাবনা ভাঙা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যু রহস্য!?

মা সারদার কথা হলেই,সঙ্গে আসে মাতৃত্বের কথা। এ এক অন্তর্নিহিত গুণ। তাঁর জীবনে দেখা যায়, কীভাবে তিনি সকলকে মায়ের মতো আদর, যত্ন, স্নেহ, ভালবাসায় মুড়ে রাখতেন। তিনি কাউকে জন্ম না দিলেও, সকলের মা ছিলেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে তিনি একইরকম স্নেহ করতেন, সকলেই ছিল তাঁর সন্তান। শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যরা, স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিরা– সবাই তাঁকে 'মা' বলে ডাকতেন। এবং এই 'মা' ডাক গুরুপত্নী হওয়ার কারণে ছিল না। তাঁর মাতৃত্ব সুলভ আচরণই এর কারণ ছিল। অচেনা মানুষকেও তিনি আপন করে নিতেন।

উনিশ শতকের গ্রামীণ বাংলার এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও, তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল যুগোত্তীর্ণ এবং আধুনিক। তাই, মা সারদার গল্প শুধু এখানে থেমে থাকে না। স্বামী বিবেকানন্দ একবার তাঁর ভাতৃস্থানীয় একজনকে চিঠিতে লিখেছিলেন, "দাদা, মা ঠাকরুন কী বস্তু, তোমরা এখনও কেহই বুঝতে পারনি, ক্রমে পারবে। তিনি ভারতে এসেছেন মহাশক্তি জাগাবেন বলে, তাঁকে কেন্দ্র করে গার্গী, মৈত্রেয়ী, আবার সব জগতে জন্মাবে।"

অর্থাৎ, তিনি বলতে চেয়েছেন, গার্গী এবং মৈত্রেয়ী– প্রাচীন যুগের সেই দুই কিংবদন্তী নারী দার্শনিক ও ঋষি, যাঁরা খোলা মনে, সভায় সকলের সামনে ঋষি-মুনিদের সঙ্গে তর্ক করতেন, দার্শনিক চিন্তাভাবনা ভাগ করতেন। আজকের দিনে, যাকে আমরা বলি 'মাথা উঁচু করা মহিলা'– যাঁরা বুদ্ধি, দৃঢ়তায় পুরুষদের থেকে কোনও অংশে কম নন, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি। মা সারদা যেন সেই শক্তির প্রতীক। তাঁর শান্ত, কোমল রূপের আড়ালে ছিল অটল দৃঢ়তা। এক যুগোত্তীর্ণ নারী, যিনি ভারতে নারীজাগরণের আলো জ্বালিয়েছেন। তাঁর কর্ম এবং উপদেশে নারী-পুরুষের সমতা, নারীশিক্ষা, সামাজিক কুসংস্কারের বিরোধিতা এবং নারীর স্বাধীনতার প্রতি গভীর বিশ্বাস প্রকাশ পায়।

আধুনিক ভারতের মেয়েরা– যাঁরা বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ এবং অন্যান্য পেশায় নিযুক্ত নারীবাদী চিন্তাভাবনার আধিকারী– তাঁদের মধ্যে গার্গী-মৈত্রেয়ীর ছায়া দেখা যায়। সারদা দেবী নীরবে যে বিপ্লব করেন, তাই আজকের মেয়েদের নারীবাদী হওয়ার রশদ। তিনি কি কেবল একটি পুরনো যুগের শেষ? না, নতুনের অগ্রদূত। তাঁর জীবন যেন এক গল্প, যা আমাদের বলে, পরিবর্তন ধীরগতিতে আসে, কিন্তু তা অটল।

মা সারদার জীবন ছিল নারী জাগরণের এক জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রাসঙ্গিক, যা নারীদের শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং সমতার পথ দেখায়। তাঁর দর্শনের সার পুরনো বন্ধন ভেঙে নতুন আলোর যুগের সূচনা করে। মা সারদা শুধু একজন মাতৃস্বরূপা নন, তিনি নারীমুক্তির পথপ্রদর্শক।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।