হিন্দু-মুসলিমের ঐক্যের প্রাঙ্গণ রজিম ফকিরের মেলা

Festival: সাতদিনের এই মেলা হিন্দু ও মুসলিমের মহামিলনের প্রাঙ্গন হয়ে ওঠে। প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মনস্কামনার মঞ্চ হয়ে উঠেছে এই মেলা।

Suvankar Das
৩ মিনিট
হিন্দু-মুসলিমের ঐক্যের প্রাঙ্গণ রজিম ফকিরের মেলা

সারিবদ্ধ ভাবে বিভিন্ন রঙের ঘোড়া দাঁড়িয়ে রয়েছে শান্ত হয়ে। তাদের শরীরে কোথাও ধর্ম ও জাতপাতের বিভেদ নেই। সাধারণ মানুষের মনের ইচ্ছে ও শিল্পীর সুষমামণ্ডিত সরল তুলির টানে শীতের মিঠে রোদের মধ্যে ভালোবাসা ও আশ্বাসের বার্তা দিয়ে চলেছে ঘোড়াগুলো। প্রতিবছর ৭ অগ্রহায়ণে নদীয়ার পূর্ব শিমুলিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় রজিম ফকিরের মেলা। রানাঘাট রেলস্টেশন থেকে বনগাঁগামী ট্রেনে মাঝেরগ্রাম স্টেশন নেমে টোটো করে যেতে হয় এই মেলায়। সাতদিনের এই মেলা হিন্দু ও মুসলিমের মহামিলনের প্রাঙ্গন হয়ে ওঠে। প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মনস্কামনার মঞ্চ হয়ে উঠেছে এই মেলা।

কোনও এক কালে রজিম ফকির নামে এক পীরের বাস ছিল এখানে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিনি সকলের চিকিৎসা করতেন। লোকসংস্কৃতি গবেষক আকাশ বিশ্বাসের মতে, "সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষের আরোগ্য নিকেতনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন রজিম ফকির। তিনি সকলের চিকিৎসা করতেন। লোকবিশ্বাস মতে ৭ অগ্রহায়ণে তাঁর তৈরি করা ওষুধগুলো অলৌকিক ভাবে সবথেকে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতো। মানুষ দ্রুত আরোগ্য লাভ করত। রজিম ফকিরের মৃত্যুর পর একটি নিম গাছের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। সমাধি চত্তরের মধ্যেই একটি থান তৈরি করা হয়। সেখানেই প্রতিবছর ৭ অগ্রহায়ণ মানুষ নিজের মনের ইচ্ছে পূরণের জন্য জোড়া ঘোড়া রেখে মনস্কামনা ও প্রিয়জনের দ্রুত আরোগ্যের কথা জানায়। কালক্রমে এই বিশ্বাস মেলায় পরিণত হয়।"

রজিম ফকিরের কবরের পাশে অবস্থিত থান।

আর এই মেলাকে কেন্দ্র করেই বাংলার প্রান্তিক শ্রেণীর শিল্পীরা নিজের শিল্পসম্ভার নিয়ে আসেন। যেহেতু রজিম ফকিরের উদ্দেশ্যে নিজের মনস্কামনা পূরণের জন্য জোড়া ঘোড়া দেওয়া হয়, তাই স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা প্রতিবছর ৭ অগ্রহায়ণের সকাল থেকে বিভিন্ন রঙ ও উচ্চতার ঘোড়া নিয়ে বসে। লাল, হলুদ, সাদা, গোলাপি রঙের ঘোড়ার গায়ে সরু তুলির টানের রেখা দিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলেন শিল্পীরা। বাস্তবধর্মী ও বিমূর্ত দুই শৈলীর ঘোড়া এখানে পাওয়া যায়।

থানের ঘোড়া।

পুরুলিয়া, বীরভূম, বাঁকুড়া, হুগলি ও অবিভক্ত মেদিনীপুরে রঙহীন ঘোড়া গ্রামীণ দেবতার থানগুলো আলো করে থাকে। সেগুলোর মধ্যে পুতুল সুলভ আকর্ষণ নেই। কিন্তু এই ঘোড়াগুলোর মধ্যে সেই আকর্ষণটি রয়েছে। একেবারে নিজস্ব শৈলীতে শিল্পিরা এই ঘোড়াগুলো তৈরি করেন। ধর্মগুরুদের ভিড় এখানে নেই। বিশেষ ভিআইপি পাসের চাহিদা এখানে দেখা যায় না। দক্ষিণার জন্য জোড়াজড়ি করা পরিবেশ এখনও এই থানকে স্পর্শ করতে পারেনি। নির্ভুল মন্ত্রচারণ ও রীতিনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ থাকার অবয়বহীন পরিবেশ এই তীর্থভূমিকে আরও মানবিক করে তুলেছে। মনের ইচ্ছে আর হৃদয়ের চাওয়াই জোড়া ঘোড়ার মধ্যে দিয়ে রজিম ফকিরের কাছে পৌঁছে দিতে চায় মানুষ। শ্রমজীবী মানুষের ভরসা ও ভালোবাসা নিয়ে আজও এগিয়ে চলেছে এই মেলা।

মৃৎশিল্পী।

বছর ৭৫-এর মৃৎশিল্পী নারায়ণ পাল প্লাস্টিকের চাদরের উপর তার তৈরি লাল রঙের ঘোড়া পেতে বসে রয়েছেন। তিনি এসেছেন আদিত্যপুর থেকে। ঘোড়ার পাশাপাশি রঙিন মাটির খেলনা বাটি ও সাংসারিক কাজে ব্যবহৃত মাটির হাড়ি, কলসি, লক্ষীর ভান্ডার নিয়ে বসেছেন। শিল্পীর কথায়, প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মেলায় নিজের শৈল্পিক সম্ভার নিয়ে তিনি বসেন। বিশ্বায়নের যুগে মেলার গায়েও লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। চিনা পণ্যের দাপট প্রবেশ করেছে এই মেলার মাঠে। কিন্তু পরিচ্ছন্ন মাটির রাস্তার ক্ষণস্থায়ী দোকানের পসরাগুলো গ্রাম বাংলার লৌকিক ও সরল সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে চলে।

রঙিন মাটির খেলনা বাটি।

উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া থেকে বেতের তৈরি ধামা, কূলো, ঝাঁপি, কঙ্কে, ঝুড়ি, ফুলের ঝুড়ি নিয়ে আসেন শিশির দাসের মতো শিল্পীরা। আবার নদীয়ার সিলিন্দা, দরাপপুর থেকে কৃষকদের জন্য বিশেষ ভাবে নির্মিত গোল টুপি নিয়ে বসেন রমলা বিশ্বাস। উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরের প্রথাগত শৈলীতে তৈরি হওয়া হুকো বা মেদেবাজারের শিল্পীদের তৈরি করা কাঠের তৈরি খেলনা গাড়িগুলো সরল শৈশবের কথা মনে করিয়ে দেয়।

মেলায় গ্রামীণ হস্তশিল্পের সমাহার।

সোনালী হাল্কা রোদের তলায় সদ্য ফসল কেটে তোলা ধানক্ষেতের মধ্যে বসেছে মেলার আসর। এর থেকে কিছুটা দূরে হাল্কা জঙ্গল পেরিয়ে দেখতে পাওয়া যায় রজিম ফকিরের সমাধিস্থল। নিমগাছের তলায় সমাধিটি রয়েছে। তারই পাশে থান। আর সেখানেই আলো করে রয়েছে ঘোড়াগুলো। এখানে যেন অখণ্ড অবসর।

রজিম ফকিরের কবর।

স্নেহশীল অনুভূতির কাছে পৌঁছতে গেলে মনকে এই হালকা সবুজে ঘেরা জঙ্গলের মতই নবীন ও প্রাণবন্ত রেখে দিতে হয়। কার কি গোত্র বা কে বেশি অর্থবান ও ক্ষমতাশালী সবই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে গ্রাম্য সরলতা ও বিশ্বাসের কাছে। তাই রজিম ফকিরের মেলা ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবকেই আরও স্পষ্ট ও সুতীব্রভাবে প্রতিষ্ঠা করে চলে।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা লোকসংস্কৃতি গবেষক আকাশ বিশ্বাস মহাশয়কে

লিখেছেন
Suvankar Das
Suvankar Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।