রাহুলের তীর জ্ঞানেশের দিকে, কেন বিদ্ধ হলেন অনুরাগ ঠাকুর?

Anurag Thakur accuses Rahul Gandhi: তীর যখন নির্বাচন কমিশনের দিকে, তখন খামোখা সেই তীরকে নিজেদের দিকে কেন টেনে নিয়ে গেল বিজেপি?‌‌ কেন বিজেপির অন্দরে অতিতৎপর হয়ে উঠল? ঠাকুরঘরে কে বলার আগেই আমি কলা খাইনি আর্তি কেন ধ্বনিত হলো?‌‌

Rajib Dey
৩ মিনিট
রাহুলের তীর জ্ঞানেশের দিকে, কেন বিদ্ধ হলেন অনুরাগ ঠাকুর?

ভারতের গণতন্ত্রের মূল ভরকেন্দ্র নির্বাচন। সেই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযোগে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে এই সংস্থার নিরপেক্ষতা। রাহুল গান্ধীর এক ‘‌প্রি হাইড্রোজেন বোমা’‌ বিস্ফোরণে ভারত জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিস্ফোরণের লক্ষ্য সরাসরি জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এক কথায় রাহুলের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার ‘‌ভোট চোর’‌দের জেনেবুঝে আড়াল করছেন। যদিও এই অভিযোগ নতুন নয়। রাহুল বেশ কিছুদিন ধরেই সরব। শুধু এবার তিনি নির্বাচন কমিশনারকে নিজের ‘‌ভুল’‌ শুধরে নেওয়ার জন্য রীতিমতো ৭ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন । ‌এই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। তারপর যা ঘটল তা নিয়ে নানা মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম নিচ্ছে। এই যেমন, রাহুল সকাল ১১টায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জ্ঞানেশ কুমারের মুণ্ডপাত করার ঠিক পরেই বেলা ১টায় সাংবাদিক সম্মেলন ডাকল বিজেপি। দলের সাংসদ তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর রাহুলের অভিযোগগুলি একে একে খণ্ডন করার চেষ্টা করলেন। এখানেই প্রশ্ন, তীর যখন নির্বাচন কমিশনের দিকে, তখন খামোখা সেই তীরকে নিজেদের দিকে কেন টেনে নিয়ে গেল বিজেপি?‌‌ কেন বিজেপির অন্দরে অতিতৎপর হয়ে উঠল? ঠাকুরঘরে কে বলার আগেই আমি কলা খাইনি আর্তি কেন ধ্বনিত হলো?‌‌

আসলে এই দ্বন্দ্ব আস্থা এবং প্রশ্নের। সকলেই মানবেন, ভারতের গণতন্ত্রের প্রাণভ্রমরা নির্বাচন। সেই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা রক্ষার দায় সাংবিধানিক সংস্থা জাতীয় নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর অভিযোগে সেই নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। রাহুল অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমারকে। অভিযোগ, ভিন রাজ্যে বসে কেন্দ্রীয় ভাবে সংগঠিতভাবে কংগ্রেসপন্থী, দলিত-আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। কর্ণাটকের আলন্দ কেন্দ্রে ছ’হাজারেরও বেশি নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জমা পড়েছিল বলে অভিযোগ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রাহুলের অভিযোগে কমিশনের অস্বীকার! জনগণ কাকে বিশ্বাস করবে?

Commission denies Rahul's allegations: রাহুল গান্ধী আগের সাংবাদিক সম্মেলনেও অভিযোগ করেছিলেন, তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে মেশিন পড়তে পারে এমন ভোটার তালিকা চাওয়া সত্ত্বেও তা তাঁকে দেওয়া হয়নি।

রাহুল গান্ধীর মতে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া আসলে নিতান্তই এক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। নির্দিষ্ট সফটওয়্যার, কল সেন্টার এবং আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করে নকল আবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর হাতে ফোন নম্বর ও প্রমাণ আছে বলেও দাবি। অন্যদিকে বিজেপি’‌র বক্তব্য, সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন। কংগ্রেসের তৈরি রাজনৈতিক নাটক। নির্বাচনে পরাজয়ের অজুহাত আগেভাগেই দাঁড় করানো ছাড়া কিছুই নয়। নানা মহলের প্রশ্ন, অভিযোগ কেবল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। তাহলে বিজেপি তড়িঘড়ি পাল্টা সাংবাদিক বৈঠক করল? কমিশন সাংবিধানিক সংস্থা, তারাই তো সাফাই দেবে। শাসক দলের এই তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়া অনেককেই ভাবাচ্ছে। বিরোধী শিবির বলছে, এই তৎপরতা আসলে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রমাণ।

আবার নির্বাচন কমিশনের যুক্তি, ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন ও বিয়োজনের প্রক্রিয়ায় কোনও রকম অস্বচ্ছতা নেই। এমনকী, প্রত্যেক ভোটারকে শেষ পর্যন্ত শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়। কর্ণাটকের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জানিয়েছেন, অধিকাংশ আবেদনই খারিজ হয়েছে। মাত্র কয়েকটি বৈধ প্রমাণিত হয়েছে। একটি এফআইআরও দায়ের হয়েছে। ঠিক এখানেই সমগ্র বিরোধী শিবিরের প্রশ্ন, অভিযোগ এবং ‌এফআইআর-‌এর তদন্তে অসহযোগিতা করছেন খোদ নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এই ঘটনাই প্রমাণ করছে ভোটার তালিকা নিয়ে ছলচাতুরি চলছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুছে ফেলা হচ্ছে বিরোধী ভোটারদের নাম! প্রমাণ সামনে আনলেন রাহুল গান্ধী

Rahul Gandhi’s ‘hydrogen bomb’: নাগরাজ, আরেক ব্যক্তি নাকি ৩৬ সেকেন্ডে দু'টি নাম বাতিলের চেষ্টা করেছেন ভোর চারটেয়। রাহুলের যুক্তি এত কম সময়ে এমনটা সম্ভব নয়।

এখানে এমন প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক, নির্বাচন কমিশনের কাছে সরাসরি প্রমাণ না দিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে অভিযোগ করলেন কেন রাহুল গান্ধী? আসলে রাহুল গান্ধীও জানেন, সরাসরি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে লড়াইয়ে নামলে তা আইনগত প্রক্রিয়ায় আটকে পড়বে। জনতার সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার কাজ স্থগিত থাকবে। বরং জনসমক্ষে রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করা গেলে চাপ অনেক বাড়বে। সেই জন্যইএমন কৌশল। ‘‌হাইড্রোজেন বোমা’‌ ফাটিয়ে ধাপে ধাপে ‘‌ভোট চুরি’‌র তথ্যপ্রমাণ জনসমক্ষে এনে শাসক দলকে চাপে রাখা ও কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি করাই কংগ্রেসের লক্ষ্য।

কমিশনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিরোধী নেতার অভিযোগ যখন এত মারাত্মক, তখন কমিশনের উচিত স্বচ্ছতার সঙ্গে সব তথ্য প্রকাশ করা। কোন কোন আবেদন এসেছে, কীভাবে খারিজ করা হয়েছে, কার বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে, এইসব তথ্য জনগণের সামনে আনা গেলে বিতর্ক অনেকটাই থামানো যেত। কিন্তু কমিশনের বক্তব্য তুলনামূলকভাবে সীমিত ও প্রতিরক্ষামূলক। ফলে মানুষের মনে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এখন জনগণকে আশ্বস্ত করাই কমিশনের মুখ্য কর্তব্য। কোন কোন আবেদন খারিজ হয়েছে, কোনটি বৈধ হয়েছে, কোথায় এফআইআর হয়েছে, রাহুলের অভিযোগ খণ্ডন করতে এই সমস্ত তথ্য প্রকাশ্যে আনাই কাম্য। অন্তত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন প্রত্যাশা মোটেই অমূলক নয় বৈকি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সম্মান জানিয়ে কংগ্রেস-‌শাসিত কর্ণাটক রাজ্যের সিআইডি বা তদন্ত সংস্থাকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করা উচিত। অর্থাৎ যেখানেই সংশয়, সেখানেই তা নিরসনের প্রয়াস থাকতে হবে। তা না হলে ক্রমশ এই সংশয়ই গণতন্ত্রকে দুর্বল করবে।

খুব ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় সংকট আস্থার সংকট। যদি ভোটার তালিকা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহে থাকে, তবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও সংশয় বাড়বে। বিরোধী শিবির হোক বা শাসক দল, দুপক্ষের দায়িত্বই হল এই বিশ্বাস রক্ষা করা। নির্বাচন কমিশন যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হয়, তবে তার প্রমাণ তাকে জনগণের কাছেই দিতে হবে। অন্যথায় “ভোট চুরি” বিতর্ক শুধু বিহার বা কর্নাটকেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, সমগ্র ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তি প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়াবে। সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

লিখেছেন
Rajib Dey
Rajib Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।