কেন বারবার ভূমিকম্প? কতটা পিছিয়ে গেল আফগানিস্তান?

Afghanistan earthquake: বিশেষজ্ঞদের মতে-ভারতীয় প্লেটের উত্তরমুখী গতি এবং ইউরেশীয় প্লেটের বিরুদ্ধে এর চাপ আফগানিস্তানের অসংখ্য ভূমিকম্পের জন্ম দেয়।

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
কেন বারবার ভূমিকম্প? কতটা পিছিয়ে গেল আফগানিস্তান?

৩১ অগাস্ট রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের পড়শি দেশ, আফগানিস্তান। পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কুনার পার্বত্য প্রদেশে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে দেড় হাজারের বেশি মানুষ, আহত হাজার তিনেকেরও বেশি। রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার এই ভূমিকম্পে সাধারণত এত প্রাণহানি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল নানগারহার প্রদেশের জালালাবাদ শহর থেকে ২৭ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তরপূর্বে এবং এর গভীরতা ছিল মাত্র ৮ কিলোমিটার। প্রথমবার আঘাতের পরে নেমে আসে আরও তিনটি আফটারশক, যেগুলোর তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৪.৫ থেকে ৫.২-এর মধ্যে।

ভূমিকম্প কেন হয়?

গঠনগত দিক দিয়ে আমাদের পৃথিবী তিনটি স্তরে গঠিত– কোর, ম্যান্টল ও ক্রাস্ট। একেবারে কেন্দ্রে ধাতব গলিত পদার্থ নিয়ে গঠিত হয় কোর, যাকে ঘিরে থাকে উত্তপ্ত কঠিন শিলার স্তর বা ম্যান্টল। একেবারে বাইরের স্তরে, পরিবর্তনশীল টেকটোনিক প্লেটে তৈরি অংশটির নাম ভূত্বক। ম্যান্টলের উপরে থাকা এই প্লেটগুলি যে কোনো গতিতে যে কোনো দিকে চলাচল করতে পারে, যার ফলে শক্তি উৎপন্ন হয়। চলমান এই প্লেটগুলি মাঝে মধ্যে একটির উপর থেকে সরে গেলে, বা একটি অন্যটির উপর উঠে গেলে প্রচুর পরিমাণে শক্তি নির্গত হয় এবং ভূপৃষ্ঠ কেঁপে ওঠে, যাকে আমরা ভূমিকম্প বলি। একই ঘটনা সাগর বা মহাসাগরের তলদেশে দেখা গেলে সুনামির জন্ম হয়। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ভূমিকম্পের ফলে পৃথিবীতে চাপের পরিবর্তন হয়, যার জন্য মূল প্রকম্পনের পরেও বেশ কয়েক ঘন্টা মাঝারি থেকে মৃদু কম্পনের সম্ভাবনা থাকে, এটিই ‘আফটার শক’ বা পরাঘাত।

ভূ-অভ্যন্তরের যে বিন্দুতে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, তাকে বলে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বা হাইপোসেন্টার, আর সেই বিন্দু থেকে ভূপৃষ্ঠে লম্ব টানলে যেখানে মিলিত হয়, তাকে বলে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
NISAR: ভূমিকম্প থেকে জলবায়ুর পরিবর্তনের কথা জানাবে স্যাটেলাইট! ‘নিসার’-র থেকে কী কী জানা যাবে?

NISAR satellite : মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই পৃথিবীর সমগ্র ভূখণ্ড, এমনকি তুষারাবৃত অঞ্চলের বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি করে ফেলবে।

যে ভূমিকম্পের কেন্দ্রের গভীরতা যত কম, অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি অংশে উৎপন্ন হলে তার প্রলয় ক্ষমতা তত বেশি, তুলনামূলক ভূপৃষ্ঠের অনেক নীচে উৎপত্তি হলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হয়। ভূমিকম্পের তরঙ্গগুলি (Seismic Wave) ব্যাসার্ধ বরাবর বিস্তার লাভ করে, ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠের অনেক গভীরে সৃষ্টি হওয়া কম্পন গুলো ভূত্বকে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রায় প্রতিবছরই কেন আফগানিস্তানে ভূমিকম্প হয়?

দুর্গম পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত দেশটি বরাবরই ভূমিকম্পপ্রবণ। এর আগেও বারবার ভূমিকম্পের স্বীকার হয়েছে ছোট্ট এই দেশটি। ২০২৩ সালে হেরাট প্রদেশে পরপর তিনটি ভূমিকম্পে প্রায় ১৩০০ লোক প্রাণ হারিয়েছিলেন। তার আগের বছর, দেশটির দক্ষিণ পূর্বে ৫.৯ তীব্রতার ভূমিকম্পে প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ মারা যায়। গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫৬০ জন মানুষ ভূমিকম্পে প্রাণ হারান এবং বার্ষিক হারে আনুমানিক ৪ কোটি ডলার ক্ষতির শিকার হয় গরিব এই দেশটি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সুনামির ‘ T’ কেন উচ্চারিত হয় না?

Tsunami: প্রসঙ্গত “সুনামি” শব্দটির উৎপত্তি জাপানি ভাষায়, যেখানে এটি 津波 (tsunami) হিসেবে লেখা হয় এবং উচ্চারিত হয় “tsu" "ˈnami”। ‘tsu’ এর অর্থ “বন্দর” এবং ‘nami’, যার অর্থ “ঢেউ”।

ঠিক কী কারণে বছর বছর ভূমিকম্পের কবলে পড়ে আফগানবাসিরা?

ভৌগোলিক দিক থেকে আফগানিস্তান হিন্দুকুশ পর্বতমালা সংলগ্ন অঞ্চলের ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত, ফলে এই দুই প্লেট একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতে পারে বা একে অপরকে অতিক্রম করতে পারে। আবার এরা, এদের দক্ষিণে অবস্থিত আরব প্লেট দ্বারাও প্রভাবিত হয়। সে কারণে অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম টেকটোনিকভাবে সক্রিয় অঞ্চলে পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে-ভারতীয় প্লেটের উত্তরমুখী গতি এবং ইউরেশীয় প্লেটের বিরুদ্ধে এর চাপ আফগানিস্তানের অসংখ্য ভূমিকম্পের জন্ম দেয়। উচ্চ পর্বতমালা থেকে গভীর উপত্যকা কি নেই আফগানিস্তানে। এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক এবং ভূসংস্থানিক বৈচিত্র্য, সাথে ঘন পাললিক শিলার উপস্থিতি দেশটিকে আরও ভূমিকম্প প্রবণ করে তুলেছে।

এছাড়া প্রতি বছর পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার হারও বাড়ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই শতাব্দীর শেষের দিকে এই অঞ্চলটি তার হিমবাহের ৮০% পর্যন্ত হারাতে পারে। বরফের ভর হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ওজন হ্রাসের প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবীর লিথোস্ফিয়ারটি উপরের দিকে বা নীচের দিকে সরে যেতে শুরু করে। সেই সঙ্গে বরফ গলা জলও মাটিতে প্রবেশ করে, যা টেকটোনিক প্লেটগুলির মধ্যে ঘর্ষণ কমায় এবং ভূমিকম্পের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে তোলে।

মূলত পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তান, অর্থাৎ উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান এবং পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলি ভূমিকম্প প্রবণ। রাজধানী, কাবুল এই অঞ্চলেই পড়ে।

এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে কীভাবে রেহাই পেতে পারে দেশটি?

ভূমিকম্পের কবল থেকে বাঁচা সহজ কথা নয়। তবে বেশ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমানো যায়। আফগানিস্তানের বাসিন্দারা ভূমিকম্পের সময় বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় (কাঠ, কাঁচা ইট বা দুর্বল কংক্রিট দিয়ে তৈরি বাড়ি) বাস করেন। এগুলোর কোনো ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই, তার পরিবর্তে যদি পরিকল্পনা করে এমন পরিকাঠামো তৈরি করা যায় যা মৃদু বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, তাহলে কিছুটা সুরাহা হয়। সেই সঙ্গে, স্বয়ংক্রিয় রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফল্ট লাইনগুলি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক দেখলেই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে থাকা মানুষজনকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া দরকার। বারবার ভূমিকম্পের সম্মুখীন হওয়ার পরেও তালিবান সরকার কবে এই সব পরিকল্পনা গ্রহণ করবে তারই প্রহর গুনছেন আফগানরা।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।