গাজায় মৃতদেহ সরাতে বুলডোজার ব্যবহার করল ইজরায়েল? সামনে এল যে তথ্য

Israel Bulldozes Palestinian Bodies: রাস্তার পাশে একের পর এক চাপা পড়া দেহ, কবরের কোনো চিহ্ন নেই, নাম নেই, কোনো তালিকাভুক্ত পরিচয়ও নেই। পশুপাখি এসে মৃতদেহ খাচ্ছে, এমন দৃশ্যও বহু ভিডিওতে দেখা গিয়েছে।

inscript
৩ মিনিট
গাজায় মৃতদেহ সরাতে বুলডোজার ব্যবহার করল ইজরায়েল? সামনে এল যে তথ্য

গাজার উত্তরাংশে জিকিম সীমান্তপথ। এখানে খাদ্য, ওষুধ কিংবা সামান্য ত্রাণ নিতেও মানুষ প্রতিদিন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ছুটতেন। যুদ্ধের কারণে চারদিকে তখনও ধ্বংসস্তূপ, বাজারে খাবার নেই, ঘরে শিশুরা না খেতে পেয়ে কাঁদছে। এই অসহায় মুহূর্তে ত্রাণের গাড়ি দেখলেই ভিড় জমে যেত হাজার মানুষের। কিন্তু সেই যাত্রাপথই হয়ে উঠেছিল মৃত্যুর ফাঁদ। বহু মানুষ গোলাগুলিতে নিহত হন, বহু দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় রাস্তায়, উল্টে পড়ে থাকা ট্রাকের পাশে বা ভগ্নপ্রায় বহুতলের কোনো কোণে।

সিএনএন-এর সাম্প্রতিক এক দীর্ঘ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন উঠে এসেছে, যারা গুলিতে মারা গিয়েছে তাদের পরিবারের কাছে কোনো খবরই পৌঁছায়নি। অধিকাংশ দেহই সঠিক ভাবে কবর দেওয়া হয়নি। বহু সময় দেহগুলি রাস্তার উপর পড়ে থেকেছে দিনের পর দিন। পরে বুলডোজার দিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কোথাও আংশিক মাটিচাপা, কোথাও সম্পূর্ণভাবে অচিহ্নিত কবরের মতো মাটির নিচে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ভিডিও, স্যাটেলাইট ছবি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং প্রাক্তন ইজরায়েলি সেনাদের মতামত নিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

ত্রাণ নিয়ে যাওয়া এক গাড়ির চালক সিএনএন-কে বলেন,

প্রতিবার ওই রাস্তা দিয়ে গেলেই দেহ পড়ে থাকতে দেখতাম। কখনও দেখেছি বুলডোজার দেহ ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। জানালা বন্ধ করে রাখতাম, নইলে সহ্য করা যেত না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৯৬৭ থেকে ২০২৫! যেভাবে গাজায় বারবার নিশানা করা হচ্ছে সাংবাদিকদের

Israel’s killing of journalists: ইজরায়েল ১৯৬৭ সালে দখলদারিত্বের প্রথম দিন থেকেই, মিডিয়া রিপোর্টিংয়ের উপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছে। পরে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে সেন্সরশিপ আনা হয়।

অন্য এক চালক জানিয়েছেন, জুলাই মাসে পুরো এলাকা যেন মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠেছিল। তাঁর কথায়,

যেখানে তাকানো যায়, দেহ। আমরা এগোতে পারতাম না, উদ্ধার দলও পারেনি।

তথ্য অনুযায়ী, শুধু জিকিম নয়, গাজার অন্যান্য এলাকাতেও একই চিত্র ছিল। রাস্তার পাশে একের পর এক চাপা পড়া দেহ, কবরের কোনো চিহ্ন নেই, নাম নেই, কোনো তালিকাভুক্ত পরিচয়ও নেই। পশুপাখি এসে মৃতদেহ খাচ্ছে, এমন দৃশ্যও বহু ভিডিওতে দেখা গিয়েছে। গাজার সিভিল-ডিফেন্স কর্মীরা জানান, তাঁরা যখনই কোনো মৃতদেহ উদ্ধার করতে যেতেন, পরিস্থিতি এত বিপজ্জনক থাকত যে অনেক দেহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হত না। তিনি বলেন,

আমরা যা পেয়েছি, তা সম্পূর্ণ শেষ অবস্থায়। কারো বাবা, কারো ছেলে কিন্তু কারোর চেনার উপায় নেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৪৪ দিনে প্রায় ৪৯৭ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন! এখনও কেন অশান্ত গাজা?

Gaza Under Fire: যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বলা ছিল, গাজায় চিকিৎসা, খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য সহায়তা স্বাভাবিক ভাবে প্রবেশ করতে দিতে হবে। কিন্তু অভিযোগ, ইজরায়েল সীমান্তে বারবার বাধা দিচ্ছে।

প্রতিবেদনটইতে দু’জন প্রাক্তন ইজরায়েলি সেনার সাক্ষাৎকারও রয়েছে। তারা মুখ না দেখিয়ে ক্যামেরায় বলেন, তাঁদের ইউনিটেও মৃতদেহ ব্যবস্থাপনার কোনো প্রটোকল ছিল না। বরং প্রায়ই বলা হত, “রাস্তা পরিষ্কার করতে হবে” এবং তাতেই বুলডোজার দিয়ে দেহ সরিয়ে মাটি চাপা দেওয়া হত। কোনো পরিচয় সংরক্ষণের প্রচেষ্টাই নাকি ছিল না। পরিবারের কাছে দেহ হস্তান্তরের প্রশ্নই ওঠেনি।

২০২৪ সালে নেটজারিম করিডোরে এমনই এক ঘটনায় নয়জন অসশস্ত্র ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন এক প্রাক্তন সেনা। তাদের দেহ দু'দিন রাস্তায় পড়ে থাকে, পরে বুলডোজার দিয়ে মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়। তিনি বলেন,

কুকুর এসে দেহের অংশ টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের কেউ ছবি তুলতে দেয়নি।

এই ঘটনাগুলি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন কি না, এ প্রশ্ন উঠেছে জোরালোভাবে। আইনজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ হলেও মৃতদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। মৃতদেহ শনাক্ত করা, পরিবারের কাছে খবর পৌঁছানো এবং ঠিকমতো কবর দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যতামূলক নিয়ম। যদি দেহ অচিহ্নিত কবরের নিচে চাপা পড়ে বা বিকৃত হয়ে যায়, সেটাই মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।

গাজার বহু পরিবার আজও আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ত্রাণ নিতে বেরিয়ে অনেকেরই স্বজন আর বাড়ি ফিরে আসেনি। কেউ জানে না তারা আদৌ বেঁচে আছে কি না। হয়ত তারা কোনো অচিহ্নিত কবরের নিচে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে। এই অজানা সত্যের ভার তাদের পরিবারের মানুষদের প্রতিদিনই কষ্ট দিচ্ছে। পুরো শহরটি যেন হারানো নামের আর্তনাদে ডুবে আছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, কীভাবে এতগুলো দেহ অচিহ্নিত ভাবে মাটির নিচে চাপা পড়ল, কেন সঠিকভাবে সৎকার করা হলো না, এসব প্রশ্নের স্বাধীন তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। মৃতদের পরিচয় জানা, ঠিকভাবে কবর দেওয়া, আর যারা দায়ী তাদের বিচার করা— এসব দাবি এখন আন্তর্জাতিকভাবে আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন হলো, যারা শুধু ত্রাণ নিতে গিয়েছিল, তাদের উপর কেন গুলি চলল? কেন তাদের এমনভাবে অচিহ্নিতভাবে কবর দেওয়া হলো? নিখোঁজদের পরিবারের কাছে কি কখনও তাদের প্রিয়জনের খবর পৌঁছাবে? তারা কি কোনোদিন জানতে পারবে তাদের প্রিয় মানুষটি শেষ মুহূর্তে কোথায় ছিল, কীভাবে প্রাণ হারাল? গাজার আকাশে প্রতিদিনই ধুলো আর ধোঁয়ার সঙ্গে ভেসে বেড়ায় এই প্রশ্নগুলি।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।