এসআইআর বিরোধী আন্দোলন কি তৃণমূলকে শক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে?

Mamata Banerjee Leads Massive Rally Against SIR: তাঁর ব্যাখ্যা, “বিজেপির অন্যতম ভিত্তি মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক, এখন এসআইআর প্রক্রিয়ার চাপের মুখে। ভোটার তালিকা নিয়ে যত বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, মানুষের তত অসন্তোষ বাড়ছে।”

Tanvia Barua
৩ মিনিট
এসআইআর বিরোধী আন্দোলন কি তৃণমূলকে শক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের নতুন ইস্যু। এবার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনী’ বা এসআইআর (Special Intensive Revision)-এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বে কলকাতার রেড রোড থেকে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি পর্যন্ত বিশাল র‍্যালি করে তৃণমূল স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— ভোটাধিকার রক্ষাই এখন তাদের লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য। প্রশ্ন হলো, এসআইআর বিরোধী আন্দোলন করে তৃণমূল কি শক্তি বাড়াতে চাইছে?

প্রতি বছর ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করে নির্বাচন কমিশন। এ বছর সেই কাজের অংশ হিসেবেই চালু হয়েছে এসআইআর প্রক্রিয়া। ৪ নভেম্বর থেকে বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO) বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের নাম, ঠিকানা ও জন্মতারিখ যাচাই করছেন। তবে তৃণমূলের দাবি, এই প্রক্রিয়া ‘স্বচ্ছ নয়’। অনেক প্রকৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “একজন ভোটারও যদি বাদ পড়ে, তবে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার পড়ে যাবে।” তাঁর অভিযোগ, এই এসআইআর প্রক্রিয়ার আড়ালে গোপনে ভোটার তালিকা থেকে বাংলার নাগরিকদের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।

রেড রোডের ড. বি.আর. অম্বেডকর মূর্তির সামনে থেকে শুরু হয়ে র‍্যালিটি শেষ হয় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হাজার তৃণমূল কর্মী-সমর্থক রাস্তায় নেমে স্লোগান তুলেছেন— “ভোটার বাদ পড়লে গণতন্ত্র হারাবে”, “আমার ভোট আমার অধিকার”, “বাঙালির নাম কেটে দেওয়ার চেষ্টা চলবে না।”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিহার এসআইআর: কেন সবচেয়ে বেশি বাদ পড়লেন মহিলারা?

Bihar SIR: সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়— বিহারের ২৪৩ টি আসনের মধ্যে ২৪০ টিতেই মহিলা ভোটারের সংখ্যা কমেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার কুচাটকোটা কেন্দ্রে।

রাজ্যজুড়ে চালু করা হয়েছে ৬,২০০-এর বেশি ভোটার সহায়তা কেন্দ্র। মানুষ যাতে অনলাইনে বা সরাসরি গিয়ে নিজেদের নাম যাচাই করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করছে তৃণমূল। মমতা বলেন, “এই বাংলার মানুষ এখানে জন্মেছে, এখানেই বড় হয়েছে। এখন তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে— এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

তৃণমূল মনে করছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানে সরাসরি বিজেপির সুবিধা। কারণ, প্রান্তিক বা দরিদ্র ভোটাররা অনেক সময় কাগজপত্র দেখাতে পারেন না, এবং এই শ্রেণিই তৃণমূলের ভোটভিত্তির বড় অংশ। তাই আগেভাগেই দল পথে নেমে ভোটারদের সতর্ক করতে চাইছে। তবে বিজেপি এই অভিযোগ মানতে নারাজ। রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, তৃণমূল অযথা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের কাজ সম্পূর্ণ নিয়মমাফিক হচ্ছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এসআইআর শেষে বিহারের চূড়ান্ত ভোটার লিস্ট: অজস্র অসঙ্গতির উত্তর নেই

SIR: এইসব গোঁজামিল, অসম্পূর্ণতা ছাড়াও বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় এমন কিছু আছে যাকে কাকতালীয় বলে মেনে নেওয়া মুশকিল। এই এসআইআর নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক দানা বেঁধেছে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া (deletion) নিয়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেবাশিস চক্রবর্তী দ্য হিন্দু-কে বলেন, “এই র‍্যালি তৃণমূলের জন্য দু'দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ— একদিকে এটি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বার্তা, অন্যদিকে আগামী বিধানসভা ভোটের আগে সংগঠনকে চাঙ্গা করার কৌশল। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই এসআইআর ইস্যুতে আন্দোলন তৃণমূলের জন্য নতুন ‘গ্রাউন্ড কানেকশন’ তৈরি করতে পারে। ২০১৯-এর লোকসভা ও ২০২৪-এর নির্বাচনে বিজেপি যে হারে ভোট বাড়িয়েছে, তার জবাব দিতে তৃণমূলকে আবার প্রান্তিক বা দরিদ্র ভোটারদের মধ্যে পৌঁছতে হবে। এই র‍্যালি সেই প্রক্রিয়ারই সূচনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুমন সেনগুপ্ত ইনস্ক্রিপ্ট-কে বলেন, “বিহারে আমরা দেখেছি প্রায় ৪৭ লক্ষ মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের সময় অনেকেই আশা করেছিলেন, তাঁদের নাম নিশ্চয়ই আছে। কারণ সেই সংশোধিত তালিকা ঠিকভাবে জনসমক্ষে আনা হয়নি। ভোটের দিন বুথে গিয়ে দেখা যায়, নাম নেই। ফলে বহু মানুষ হতাশ হয়ে ফিরে গিয়েছেন, বিভিন্ন জায়গায় গন্ডগোলও হয়েছে।” তাঁর কথায়, “আগামী নির্বাচনে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে। তাই যখন পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘একটিও বৈধ ভোটার যেন বাদ না যায়’, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের ভরসা তৈরি হয়। এতে তৃণমূলের সংগঠন ও রাজনৈতিক শক্তি— দুই-ই আরও দৃঢ় হয়।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুমন ভট্টাচার্য ইনস্ক্রিপ্ট-কে বলেন, “পুরো এসআইআর বিরোধী প্রক্রিয়াই রাজনৈতিক ভারসাম্যে নতুন প্রভাব ফেলছে। এতে তৃণমূল ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, আর বিজেপি তার নিজস্ব ভোটভিত্তি হারাচ্ছে।” তাঁর ব্যাখ্যা, “বিজেপির অন্যতম ভিত্তি মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক এখন এসআইআর প্রক্রিয়ার চাপের মুখে। ভোটার তালিকা নিয়ে যত বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, মানুষের তত অসন্তোষ বাড়ছে। নাম বাদ যাওয়া, যাচাইয়ে জটিলতা, এমনকি মৃত্যুর মতো ঘটনা— এসবই তৃণমূলের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও মজবুত করছে।”

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এসআইআর ইস্যু এখন নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে চলে এসেছে। তৃণমূলের কাছে এটি শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশ্ন নয়, বরং নিজেদের ভোটভিত্তি রক্ষার কৌশলগত লড়াই। অন্যদিকে, বিজেপি এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক নাটক বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে, সামনে যে আরও জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা স্পষ্ট। তবে এর মধ্য ভোটার পরিচয়ের প্রশ্ন— কে ‘বৈধ নাগরিক’, কার নাম থাকবে বা বাদ যাবে। সেই বাস্তবতাকে ঘিরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন এক রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাইছেন: ‘ভোটাধিকার মানেই নাগরিক অধিকার’। এই স্লোগান যদি মানুষের মনে পৌঁছায়, তাহলে আসন্ন নির্বাচনগুলিতে তৃণমূল আবারও মাঠে নিজের প্রভাব পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।

রামলীলার সভার জন্য ক্ষতি হয়েছে ছোট দোকানদারদের, কতটা প্রচার, কতটা সত্যি?

loss claim for Ramlila rally: রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে ছোট দোকানদারদের ‘২.৫ লক্ষ দোকান বন্ধ’ ও ‘১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’র দাবি আসলে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠন সিটিআই-এর অনুমান আসলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিজেপি-কংগ্রেস পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই সংখ্যাগুলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার।