কেন বৌদ্ধধর্মেও আজ পালিত অশোক বিজয়া দশমী! দশমীর এ কাহিনি অজানাই

Durgapuja 2022: বৌদ্ধধর্মের‌ও আবার বিজয় দশমীর এক তাৎপর্য রয়েছে। বিজয়া দশমীর অন‌্য এক নাম অশোক বিজয়া দশমী। আজকের দিনেই সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধে জয়লাভ করেন।

Arunima Mukherjee
৩ মিনিট
কেন বৌদ্ধধর্মেও আজ পালিত অশোক বিজয়া দশমী! দশমীর এ কাহিনি অজানাই

‘নবমীর নিশি গো তুমি আর যেন পোহাইয়ো না

দুঃখিনী মায়ের প্রাণে আর ব‍্যথা দিও না’

দেখতে দেখতে পুজোর চারটে দিন পেরিয়ে আজ দশমী । উমার আবার স্বামীর ঘরে ফেরার দিন চলেই এল। সারা বছর পুজোকে ঘিরে গোটা বাঙালির যে আশা আনন্দ থাকে, কত সহজেই তা কয়েক মুহূর্তেই ফুরিয়ে যায়। এই চারটে দিন, সময় যেন আলোর চেয়েও দ্রুত বেগে ছোটে। দশমী মানেই বাঙালির এক ভীষণ মনখারাপের দিন, উমাকে পানপাতা দিয়ে বরণ করে, মিষ্টি দিয়ে কান্নাভেজা হাসিমুখে আবার ভোলানাথের কৈলাসে পাঠানো আসলে উমা যে ঘরের‌ই মেয়ে। তবে দশমীর এই বিষাদের সঙ্গেই আসে বিজয়ার পালা। দশমীর দুঃখ ভুলে বাঙালি আবার মেতে ওঠে মিষ্টি খাবার উৎসবে। বিজয়া দশমীর এই ধারণা আমাদের সকলের‌ই জানা কিন্তু বিজয়া দশমীর যে কাহিনি আজ বলব তা যে কেবল বাঙালিদের, তেমন কিন্তু নয়। আজ বলব বিজয়া দশমীর এক বৃহত্তর ক্ষেত্রের কথা।

পুরাণে মহিষাসুর বধের কাহিনি অনুসারে, দেবী দুর্গা মহিষাসুরের সঙ্গে টানা নয় দিন, নয় রাত্রি যুদ্ধ চালান। তার মধ‍্যে ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছিল চারদিন। তিথি অনুযায়ী এই চারদিন ছিল, আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং আজ অর্থাৎ শুক্লাপক্ষের দশম দিন। আজ‌ই দুর্গা মহিষাসুরকে হত‍্যা করতে সক্ষম হন। দুর্গার এই যুদ্ধে বিজয় লাভের কারণে এই দিনকে ‘বিজয়া’ বলা হয়ে থাকে। আবার শ্রীশ্রীচণ্ডী কাহিনি অনুযায়ী, দেবীর আবির্ভাব হয় আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে। পরে শুক্লা দশমীতে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন তিনি, বিজয়া দশমী এই বিজয়কেই চিহ্নিত করে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মৃৎশিল্পীর ভুলে দেবী হয়ে গেলেন নীল, কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর ইতিহাস আজও বিস্ময় জাগায়

Durgapuja 2022: নদিয়া জেলার বহু বনেদিবাড়ি যুগ যুগ ধরে শামিল হচ্ছে এই উৎসবে। আজ মায়ের বিদায়-লগ্নে ছুঁয়ে দেখা সেইসব ঐতিহ্যকে।

এবার আসা যাক, রামায়ণের প্রসঙ্গে। সীতাহরণকে কেন্দ্র করে রাম এবং রাবণের যে যুদ্ধ লঙ্কায় হয়েছিল, সেই যুদ্ধেও রাম আজকের দিনেই রাবণকে বধ করেছিলেন। সেখান থেকেও আবার আজকের দিনটি চিহ্নিত 'বিজয়া' হিসাবে। আজকের দিনে তাই উত্তর এবং মধ‍্য ভারতে বিজয়া দশমীর পাশাপাশি পালিত হয় আরও একটি উৎসব, ‘দশেরা’। এই দশেরার সঙ্গে দশমীর কোনও সম্পর্ক নেই। ‘দশেরা’ কথাটির উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ ‘দশহর’ থেকে। এই দশহর, দশানন রাবণের মৃত‍্যুকে চিহ্নিত করে। বাল্মীকির রামায়ণে বলা হয়েছে, আশ্বিন মাসের ত্রিশতম দিনে শ্রী রামচন্দ্র, সীতা এবং লক্ষ্মণ সহযোগে চোদ্দ বছর পর অযোধ‍্যায় প্রত‍্যাবর্তন করেন। এই দিনেই পালিত হয় দীপাবলি উৎসব। মহাভারত বলে আবার অন‍্য কথা । ১২ বছর অজ্ঞাতবাসে থেকে আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী তিথিতে পাণ্ডবরা শমীবৃক্ষে তাঁদের লুকনো অস্ত্র উদ্ধার করে এবং ছদ্মবেশ ছেড়ে পুনরায় সাধারণ জীবনে পদার্পণ করেন।

বৌদ্ধধর্মের‌ও আবার বিজয় দশমীর এক তাৎপর্য রয়েছে। বিজয়া দশমীর অন‌্য এক নাম অশোক বিজয়া দশমী। আজকের দিনেই সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধে জয়লাভ করেন। এই যুদ্ধে জয়লাভ করার পরে তিনি টানা দশ দিন ধরে যে বিজয় উৎসব পালন করেছিলেন তাই অশোক বিজয় দশমী হিসাবে পরিচিত। এই কলিঙ্গ যুদ্ধের পর একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুককে দেখে তিনি এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং চিরকালের জন‍্য হিংসার পথ থেকে দূরে সরে আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অসংখ‍্য বৌদ্ধ স্থানে ভ্রমণ করেন এবং বহু শিলালিপি, ধর্ম-স্তম্ভ স্থাপন করেন। বুদ্ধের জীবনচর্চা এবং সেই জীবনকেই অতিবাহিত করেন তিনি। সম্রাট অশোক রাজপরিবারের সঙ্গে ভন্তে মোজ্ঞলিপুত্ত নিষ্পের থেকে বৌদ্ধধর্মের দীক্ষা নিয়েছিলেন।

হিন্দুশাস্ত্র মতে, দুর্গাদেবীকে পুজোর জন‍্য আহ্বান করে আসার পরেই মাটির প্রতিমা প্রস্তুতির কাজ শুরু করা হয়। আবার দশমীতে, পুজো শেষ হলে দেবীর উদ্দেশ্যে বলা হয়, তিনি এখন যেখানে ইচ্ছা যেতে পারেন। তখন প্রতিমা থেকে দেবীর মুক্তি ঘটে। তারপর সেই প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়ে থাকে, তাই বিসর্জন অর্থে বিনাশ নয় বরং মুক্তি দেওয়া। অনেক জায়গাতেই আবার দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় না। বছরান্তে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে নতুন প্রতিমা ঘরে আনা হয়। আবার ধাতব প্রতিমা হলে তা কখনই বিসর্জন দেওয়া হয় না। অর্থাৎ বিজয়া অর্থে একাধারে দেবী দুর্গা এবং রামচন্দ্রের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভ করা।

অতি সাধারণভাবে দেখতে গেলে, দশমী যেন বাঙালিদের সামাজ জীবনের কথাই বলে। বিয়ের পর যেভাবে বাপের বাড়িতে কয়েকদিনের অতিথি হয়ে থাকতে হয় এখনও কিছু মেয়েকে, আবার নির্দিষ্ট সময় ফিরে যায় শ্বশুরঘরে, দশমীর কাহিনিও যেন সেই সমাজ জীবনের চিত্র‌ই আমাদের সামনে অন‍্যভাবে তুলে ধরে। তাই তো বাঙালি মায়েরা যেন দেবীকে বিদায় জানান না, বিদায় জানান নিজের ঘরের কন‍্যাসন্তানকে আর আশা করে থাকেন আবার পরের বছরের, কবে আবার ঘরে ফিরবে উমা?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুম্বইয়ের রঙ কোম্পানি বদলে দিল বাংলার দুর্গাপুজো! কীভাবে শুরু হল থিমের পুজো?

Theme Durga Puja Kolkata: ১৯৮৫ সালে পুজোয় এশিয়ান পেইন্টসের ট্যাগলাইন ছিল, ‘শুদ্ধ শুচি, সুস্থ রুচি’। এর অর্থ হল, প্যান্ডেল-প্রতিমা-আলোকসজ্জা সবকিছুর মধ্যেই থাকতে হবে শুদ্ধতা এবং সুস্থ রুচির পরিচয়

তথ্যসূত্রঃ

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাই কেন পেলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার?

Navi Pillay Nobel Peace Prize 2026: ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক দরিদ্র ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। তাঁর ঠকুমা-ঠাকুরদা ১৮৯০-এর দশকে ভারত থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার নাতাল প্রদেশের চিনি বাগানে কাজ করতে এসেছিলেন।

বাড়িতে এক নারীর আগমন, তারপর স্বপ্নাদেশ: যেভাবে শুরু হয়েছিল দে বাড়ির দুর্গাপুজো

Dey Bari Durga Puja Bhawanipur: কথিত আছে, একবার ২৬ নম্বর চন্দ্রনাথ স্ট্রিটের বাড়িতে লালপাড়-সাদা শাড়ি পরিহিতা একজন সধবা নারী তাঁর ছেলেমেয়েদের নিয়ে এই বাড়িতে এসেছিলেন চাল-ডাল ভিক্ষা করতে। বাড়িরই এক সদস্যা অন্দরমহল থেকে চাল-ডাল নিয়ে আসার পর আর সেই সধবা মহিলাকে দেখতে পাননি।

শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক গঙ্গাপ্রসাদ সেনের বাড়ির দুর্গাপুজো: পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্য যেভাবে এল কুমারটুলিতে

Gangaprasad Sen Bari Durga Puja: গঙ্গাপ্রসাদ সেন ছিলেন বিখ্যাত আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও তাঁর কাছে চিকিৎসা করাতে আসতেন। তাঁর বাবা নীলাম্বর সেন অবিভক্ত বাংলার এক নামকরা কবিরাজ ছিলেন। কলকাতায় আসার পর সেন পরিবার কুমারটুলিতে বসতি গড়ে এবং সেখানেই ১৮৫৭ সালে শুরু হয় দুর্গার আরাধনা।

১৩ বছর বয়সে ফুটপাথে থাকা, কার্গিলে জওয়ানদের পাশে, ‘পরিন্দা’য় আগুনে পুড়ে যাওয়া: নানা পাটেকর আসলে কেমন মানুষ ছিলেন?

Nana Patekar unknown facts: প্রকাশ রাজের ভাষায়, নানা কেবল একজন প্রবীণ সহকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক অভিভাবক-বন্ধু, যাঁর সঙ্গে তীব্র তর্কে জড়িয়ে পড়া যেত, আবার একই টেবিলে বসে তাঁর হাতের রান্না করা খাবার ভাগ করে নেওয়া যেত। মদ বা মুম্বইয়ের তথাকথিত হাই-প্রোফাইল পার্টি কালচারের প্রতি তাঁর চিরকালই ছিল তীব্র অনীহা।

নানা পাটেকর: ফিরে দেখা অনন্য জীবন

Nana Patekar: ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বোম্বে রাজ্যের রায়গড় জেলার মুরুদ-জানজিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্মেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। পরে সিনেমার দুনিয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘নানা পাটেকর’।

মাছ-ভাত খেয়েই বোধন, দশমীতে মৎস্যমুখ! বাগবাজার হালদার বাড়ির সাড়ে চারশো বছরের পরম্পরা

Bagbazar Haldar Bari Durga Puja: পুজোর ইতিহাসের সূত্রপাত ওড়িশার বালেশ্বরের কাছে সাহেবপুর বা রহনপুরে। হালদার পরিবারের পূর্বপুরুষরা চন্দননগরের নোয়াপাড়ার জমিদার ছিলেন। তাঁদেরই এক পূর্বপুরুষ কৃষ্ণপ্রসাদ হালদার প্রমোদভ্রমণে ওড়িশার ওই এলাকায় গেলে স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নের বর্ণনা অনুযায়ী মাটি খুঁড়ে সত্যিই উদ্ধার হয় মহিষমর্দিনীর কষ্টিপাথরের মূর্তি।

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।