বারাসাত কাল্পিক-এর 'অদ্ভুত লাইব্রেরি'! একটি পাঠ অভিজ্ঞতা

Barasat Kalpik: লাইব্রেরিয়ানের কন্ঠে যখন শোনা যায় “শোক ছাত্রদের মানায় না”— তখন তা হয়ে ওঠে এই প্রযোজনার সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত।

inscript
৩ মিনিট
বারাসাত কাল্পিক-এর 'অদ্ভুত লাইব্রেরি'! একটি পাঠ অভিজ্ঞতা

শিক্ষা জ্ঞানচক্ষুর কপাট দড়াম করে খুলে দেবে- এই প্রত্যাশা আদি অনন্তকালের। কিন্তু সেই শিক্ষা যদি শিকল পরিয়ে দেয়, তবে? হারুকি মুরাকামির মূল উপন্যাস 'অদ্ভুত লাইব্রেরি' থেকে বারাসত কাল্পিকের সাম্প্রতিক নাট্যপ্রযোজনা হয়ে উঠল সেই দ্বন্দ্বেরই এক রূপক উপস্থাপনা। দেবব্রত ব্যানার্জির সংযমী অথচ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নির্দেশনায়, সুদীপ বসুর রূপান্তরে,অভি চক্রবর্তীর সুচারু কলমে এই নাটক হয়ে উঠেছে আত্মার অনন্ত গ্রন্থাগারে প্রবেশের এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। এই রূপান্তর এক স্বপ্নময় অথচ হাড়-হিম করা দার্শনিক অনুসন্ধানে রূপ নিয়েছে অচিরেই।

শিক্ষা, শৃঙ্খল, প্রেম, মৃত্যু, ইতিহাস, বর্তমান— এই সবকিছুর জটিল সংলাপে মঞ্চে রচিত হয়েছে মানব-অভিজ্ঞতার এক দুর্বোধ্য প্রতিচ্ছবি। আর সেই বার্তালাপে অর্ণব কুমার রায়ের আলো যেন এক নীরব চরিত্র। ভয়, নিঃসঙ্গতা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় আলো-আঁধার দর্শককে টেনে নিয়ে যায় অনন্ত শূন্যতায়। লাইব্রেরিয়ানের মুখে পরা ক্ষীণ আলোর আঁচড়ে বা শূন্য খাঁচার আর্তিতে ফুটে ওঠে মিথ আর আতঙ্কের রসায়ন। শেষে হঠাৎ সাদা আলোর প্লাবনে মুক্তির মতো কিছু আসলেও, তার ভিতরেই যেন বেজে চলে অমোঘ এক মৃত্যু-স্মরণ। সুসান সন্টাগ যেমন বার্গম্যানকে নিয়ে বলেছিলেন, আলো কখনও কখনও চরিত্র হয়ে ওঠে—এই নাটকের আলো-ছায়া তেমনই মুক্তির দীপ্তি আর মৃত্যুর বেদনাবোধে দার্শনিক ওজন বহন করে। নীলাংশুক দত্তের আবহ বাজে হৃদস্পন্দনের মতো। কখনও নীরবতার প্রান্তে থেমে থেমে, কখনও মাটির ঘ্রাণে ভিজিয়ে দেয় ভয় আর আশা। যেন ফিলিপ গ্লাসের মিনিমালিস্ট রচনার প্রতিধ্বনি, অথচ তার মধ্যেই কোথাও উঁকি মারে বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের অন্তর্লীন সুর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শশী তোমার শরীর নাই, ঘর নাই? পুতুলনাচের ইতিকথা ছবির নিবিড়পাঠ

Putul Nacher Itikatha: আজকের দুনিয়ায় মানুষ আধুনিকতার যান্ত্রিক উন্নাসিকতায়, তার গণনানির্ভর জীবনে বার বার ভুলে যায় বিপন্ন প্রকৃতি ও মানুষকে, এমনকি দায়ে না পড়লে সে ভুলে থাকে নিজের রোগ ব্যাধি জড়া সম্বলিত বিপন্ন শরীরটিকেও।

চরিত্ররূপে ভেড়ামানুষের (অজয় বিশ্বাস) ভয়ংকর দ্ব্যর্থতা ফুটে ওঠে সারা নাটক জুড়ে। সে না সম্পূর্ণ দানব, না নিছক রক্ষাকর্তা—বরং জ্ঞানের এক দ্বৈত রূপ। মুক্তির প্রতিশ্রুতি, দাসত্বের ছায়া—দুই-ই তার শরীরী ভাষায় উপস্থিত। অ্যান্টোনিন আর্তোর থিয়েটার অফ ক্রুয়েলটি–র মতোই এই চরিত্র যেন বাস্তবতার অতীত আর ভীতির আনুষ্ঠানিক প্রতিমূর্তি। অন্যদিকে নার্সের (অভিনন্দনা দে) চরিত্রটি মঞ্চে আনে মমতা আর ভালোবাসার সামান্য আলো। কিন্তু সেই আলোও দ্বিধাময়—ব্রেখটের ভেরফ্রেমডুংর বা (Verfremdungseffekt) মতো, সহজ ক্যাথারসিস থেকে দূরে সরিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন তোলে মনে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সলিল চৌধুরীকে কেন বুঝতেই পারল না সেকালের কমিউনিস্ট পার্টি?

Salil Chowdhury: সলিল বলেছিলেন, "কেবল রাজনীতির কথা বলে মানুষের কাছে দলীয় বার্তা কার্যকরীভাবে পৌঁছবে না।"

মঞ্চশিল্প নাটকে ভেসে ওঠে স্বপ্নদৃশ্যের মতো। অটোমান সাম্রাজ্যের শাসকদের কাটআউট, ভাসমান মেঘ, ভাঙাচোরা সিলুয়েট— সব মিলিয়ে এই দৃশ্যশিল্প যেন টাদেউস কান্টরের পরীক্ষামূলক মঞ্চভাষাকে স্মরণ করায়। সময়, স্থান, ইতিহাস— সবই এখানে দ্রবীভূত হয়ে যায় কালাতীত যাত্রায়।

কিশোর নায়কের (অনুভব সেনগুপ্ত) ওপর চাপানো হয় জীবনের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক শিক্ষাব্যবস্থার নির্বিচার বোঝা—সাবমেরিন তৈরির খুঁটিনাটি, মেষপালনের পদ্ধতি, অটোমান সাম্রাজ্যের কর আদায়ের ইতিহাস ইত্যাদি। ফুকো যেমন Discipline and Punish–এ বলেছিলেন, শিক্ষা শুধু জ্ঞান দেয় না, শরীর-মনকে শাসনের যন্ত্রে পরিণত করে—তেমনই এই নাটকে বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ানের (প্রসুন ব্যানার্জি) সংলাপ “শীত অভ্যাস হয়ে যাবে” বা “মানুষ মানুষকে খায়” হয়ে ওঠে নাটকের সবচেয়ে নির্মম উচ্চারণ, শোষণের নগ্ন স্বীকৃতি। পুঁজি যেমন তরুণ প্রতিভাকে গ্রাস করে, লাইব্রেরি তেমনি গিলে খায় কিশোর মস্তিষ্ককে। এই নাটক স্মরণ করায় তাজমহলের শ্রমিকদের অজ্ঞাত মৃত্যুর কথা—যারা হারিয়ে গিয়েছিল সৌন্দর্যের পেছনে। তাদের রক্তে গড়ে ওঠা ঐতিহ্য আজও নীরব। গ্যাস চেম্বারের ইতিহাস শেখায়—মানুষকে মানুষ হতে হলে অতীতের বেদনাকে জানতে হয়। অ্যাডর্নো বলেছিলেন, “আউশভিৎসের পর কবিতা লেখা নিষ্ঠুর, কিন্তু আউশভিৎস ভুলে যাওয়া তার চেয়েও ভয়ংকর।” কেবল বিশ্বজনীন ইতিহাস নয়, স্থানীয় ঘটনাবলীও জুড়ে গেছে নাটকের চলনে। আরজি কর মেডিকেল কলেজের ছাত্রী ধর্ষণ বা আহমেদাবাদের বিমান দুর্ঘটনায় হোস্টেলের ছাত্রদের মৃত্যু—প্রমাণ করে যে অতীতের নৃশংসতা ও বর্তমানের ট্র্যাজেডি একই স্রোতে বহমান। মুরাকামির সেই উক্তির মতোই, “অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ একই সঙ্গে ঘটে চলে।”

লাইব্রেরিয়ানের কন্ঠে যখন শোনা যায় “শোক ছাত্রদের মানায় না”— তখন তা হয়ে ওঠে এই প্রযোজনার সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত। যে শিক্ষা শোককে নিষিদ্ধ করে, তা মানুষকে যন্ত্রে রূপান্তরিত করে এবং শেষে কিশোর যখন উপলব্ধি করে— “লাইব্রেরি আর শ্মশান একই পথে ছিল ”— তখন স্পষ্ট হয় উপলব্ধিহীন জ্ঞানের ভাণ্ডারই হয়ত হয়ে ওঠে মৃত্যুর রাস্তা। কিন্তু সবশেষে নাটকের পর্দা নামে সন্তান আর মায়ের বিচ্ছেদে, মায়ের মৃত্যুতে। কোনো প্রতীক নয়, কোনো আলঙ্কারিতা নয়— কেবল এই নাটক বলে চলে জ্ঞান যদি প্রেমহীন হয়, তবে তা কেবল মৃত শূন্যতা, শূন্য সঞ্চয়। ভালোবাসার মধ্য দিয়েই মৃত্যু হয়ে ওঠে জীবনের শেষ পাঠ। দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অদ্ভুত লাইব্রেরি শুধু নাট্যরূপ নয়— এ যেন আধুনিক মানবসভ্যতার প্রশ্নপত্র, এক দার্শনিক উপাখ্যান।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।