এই মৃত্যু উপত্যকা

Arka Chatterjee
৩ মিনিট
এই মৃত্যু উপত্যকা

শ্যামবাজার এর পাঁচ মাথার মোড়-এর একটু আগে, সকাল বেলা ৮:৩০ হবে ,৭৮ রুট এর বাস, হুট করে ফাঁকা হওয়া প্রতিবন্ধীর সিট, আমি চেয়ে আছি, সিট ও চেয়ে আছে, আর চেয়ে আছে আমার পাশের ছোঁড়াটি ও। অতঃপর বাঙালির এগিয়ে যাওয়ার মনবৃত্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে এভারেস্ট জয় করার মত হাসি নিয়ে জানলার ধারে বসে, নেতাজির ঘোড়া, গোলবাড়ি এইসব দেখতে দেখতেই বাস টা চলে গেলো রাজপথ দিয়ে সোজাসুজি শিয়ালদা। ট্রাম লাইন-ভালোবাসা-ঠেলা গাড়ি....তারপর সোজাসুজি শিয়ালদা।

গতানুগতিক নিয়ন্ত্রিত সু-পরিকল্পিত ভালো মানুষটির মত অফিস করে ঘরে ফেরা ছেলে, মা থালা ভরে ভাত দিয়েছে, বউ আদর করে টিফিন। এই ভাবেই জীবনটা পেনশন-এর টাকায় চলে যাবে এই ভেবে বোকা বোকা সময় কাটিয়ে দেওয়া বাবা। এই নিয়েই চলছিল ভালোই আবেগ হীন জীবন।তারপর একদিন হঠাৎ করে সেই শ্যাম বাজার, পাঁচ মাথার মোড়,নেতাজি। দুম করে কি যেন মনে হলো একটা,আবেগ টা নাড়া দিয়ে উঠলো।

আবার বছর পাঁচেক বাদে, ব্যারাকপুর-বারাসাত রোড,বারাসাতের একটি ইউনিভার্সিটির কাজে যাচ্ছি। এইবারে বাহনটা আর পাবলিক বাস নয়।আমারই এক সহকর্মী দাদা অতনু মিত্র-র দুই চাকা, ঠিক যেন জয় আর বীরু । যেতে যেতে নীলগঞ্জ এর ঠিক আগে সাহেব বাগান এর জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউট , বিশাল বড়মাপের জায়গা।দেখে বেশ ভালই লাগলো, যদিও মফস্বলের ছেলে,তাই গ্রামের ফাঁকা জায়গা দেখলে ভালই লাগে। তারপর হঠাৎ করে ডান দিকে চোখ পড়তে দেখি একটি শহীদ বেদী গোছের ।

বাইকটা আস্তে হওয়াতে লক্ষ করলাম লেখা "একতা-বিশ্বাস-বলিদান " আরো ছোটো করে দু এক লাইন সেটা পড়তে পারলাম না। দাদার কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, "ব্যাপার টা সম্পর্কে কিছু জানো ?"

দাদা বললেন-"ভারতবর্ষের সবথেকে বড় হত্যা কাণ্ড কি জানো?"

আমি বললাম- "জালিয়ানওয়ালাবাগ"

দাদা - "ঠিকই বলেছো"

আমি বললাম- "কেন ? কোনো সন্দেহ আছে ?"

দাদা বললো-" হ্যাঁ,সময় টা ১৯৪৫ সাল,২৫ সে সেপ্টেম্বর, 'মেনন' নামক মাদ্রাস রেজিমেন্ট-এর একজন ক্যাপ্টেন,যিনি নীলগঞ্জ ক্যাম্প-এর দায়িত্বে ছিলেন। তিনি রাত ১০টা নাগাদ,বন্দীদের ক্যাম্প এ ঢোকেন ও নিয়ম মাফিক রোল কল করার চেষ্টা করেন।বন্দীরা তার বিরোধিতা করেন।তখন ক্যাপ্টেন মেনন গারদের বাইরে এসে বিপদ সংকেত (সাইরেন) বাজান ও তৎকালীন কুখ্যাত গুলি ভর্তি টমিগান নিয়ে ভেতরে ঢোকেন, তার সাথে সাথে ঢোকে ক্যাম্পের পাহারায় থাকা সৈনিকরা।

ব্রিটিশদের মতানুযায়ী বন্দীরা বাঁশ ও পাথর নিয়ে গার্ড দের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারপর তারা গুলি চালাতে বাধ্য হন।

আর তাতে মারা যান প্রায় ২২০০ সৈনিক।

ইতিহাস ঘাঁটলে শুধু এইটুকুই পাওয়া যায়।

প্রশ্ন জাগলো... কোন সৈনিক ? কারাই বা বন্দি ?

তদানিন্তন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের সবথেকে বড় আসন টা যাঁর প্রাপ্য সেই নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস তার তৈরি করে যান "ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি" বা "আজাদ হিন্দ ফৌজ" ।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ব্রিটিশ বিরোধী আজাদ হিন্দ বাহিনী যাদের সাহায্যে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিল তাদের ভরাডুবি হয়। বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব পড়ে, আজাদ হিন্দ বাহিনীর ওপর । যে লক্ষ্য নিয়ে আজাদ হিন্দ বাহিনী বা ' INA ' তৈরী হয় তার পুরোটাই নস্যাৎ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এর মিত্র বাহিনীর জয়ের পর।বন্দী বানিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাচার করা হয় এই তরুণ আগুন দের।

প্রায় ৩০০০ এর ও বেশী INA সদস্য,কে এনে রাখা হয় নীলগঞ্জ ক্যাম্পে, বর্তমানে যেটা 'ইন্ডিয়ান নেশানাল জুট ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টর' নামে বারাসাত-ব্যারাকপুর রোডের সাহেব বাগান এলাকার কাছে অবস্থিত।

৩০০০ এর কিছু বেশি INA সৈনিক দের মধ্যে কিছু সৈনিক দের নিয়ে যাওয়া হয়"ফোর্ট উইলিয়াম"এর কারাগারে বন্দি করার জন্য, আর বাকি সৈনিকদের যুদ্ধ বন্দী হিসেবে রাখা হয় নীলগঞ্জ-এ ।

এলাকার তদানীন্তন সময়ের মানুষ শিব শংকর ঘোষ বলেন, তিনি দেখেছিলেন লরি করে লাশ গুলো কে নিয়ে যেতে , আর রক্তে ভেসে যেতে সারা রাস্তা ।

২২০০ মানুষ কে এক রাতের মধ্যে মেরে ফেলার ঘটনা বোধ করি ভারত তথা পৃথিবীতে আর কখনো হয়নি, ('জার্মান কনসেন্ট্রেশন' ক্যাম্প বাদে)।

এই বার দেখা যাক তাদের মৃতদেহ গুলির কি পরিনতি হলো।

এই বিষয় কথিত আছে বহু মৃতদেহ পার্শ্ববতী "নোয়াই " খালে ফেলে দেওয়া হয়, আর ক্যাম্প এর ভিতরে সাতটি তালগাছের এর গোড়ায় মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়।

( তথ্য : ন্যাশনাল্ আর্কাইভ )

অতনু দার সাথে পরিচয় টা এখন দাদা-ভাই এর সম্পর্কে পরিণত হয়েছে।আসলে আবেগ টা দুজনেরই এক ই ছিলো এবং আছেও। আমার মত হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ ভারতীয়র আবেগ অন্তরালে ই

থেকে যায়।

আমাদের আবেগ গুলো কে আমরা বড্ডো চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছি প্রতিদিন, আমাদের আবেগ গুলো কে খেলো ভাবছি প্রতিনিয়ত ।

..........আর কি অদ্ভুত ব্যাপার এই আবেগ গুলোই হলো 'ভিত', যাকে পাথেও করে চলছে পুরো দেশ।

এই আবেগ এর ফল 'এই মৃত্যু', চিরকাল এই মৃত্যুর খেলা চলেছে।

তাই বার বার মাথায় আসে, হাজার বার মাথায় আসে নবারুণ ভট্টাচার্য এর লেখা টি ....."এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়"

লিখেছেন
Arka Chatterjee
Arka Chatterjee
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।