নারদ চরিত্রে যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছিলেন নজরুল

Kazi Nazrul Islam: নজরুল জন্মের ১২৫ বছর পর নজরুলের এই কীর্তির দিকে তাকিয়ে মনে হয় সত্যিই তিনি ছিলেন সর্বগুণের অধীশ্বর। অথচ তাঁকে নির্দিষ্ট মাপের বাক্সবন্দি করেই তুলে ধরা হলো।

Sounak Thakur
৩ মিনিট
নারদ চরিত্রে যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছিলেন নজরুল

মাথায় চুড়ো করে বাধা চুল। জটায় সাদা ফুলের মালা। কপালে তিলক। গোঁফ দাড়ি কামানো। সুন্দর মুখশ্রী। বাম হাতে তাম্বুরা। ডান হাতে রুদ্রাক্ষ। গলায় মালা। পরণে শিল্কের লম্বা কুর্তা। ধুতি। সুদর্শন যুবক। সুরেলা কন্ঠ। ভক্ত-প্রাণ ধ্রুবর সামনে ধীরে ধীরে প্রবেশ ঘটছে নারদের। এই দৃশ্য দেখে বোঝাই যাবে না এই নারদ আসলে কাজী নজরুল ইসলাম। কবি নজরুলের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিদ্রোহী কবিসত্তা। এক দুর্বার আবেগ। এক দুর্নিবার অনুভূতি। এক বাঁধন হারা উত্তাল নদীর ঢেউ। কিন্তু কবি সত্যিই সব্যসাচী। একাধারে কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, অন্য দিকে অভিনয়। কিন্তু অভিনয়ের দিকটি চিরকাল আড়ালেই। তার উপর, তাঁর কম বয়সের ছবিও জনপরিসরে খুব বেশি নেই। কিন্তু যে কোনো পাঠক তাঁর নাটকগুলি পড়লেই নতুন নজরুলকে আবিষ্কার করতে পারবেন। বুঝতে পারবেন অভিনয় সম্পর্কে তাঁর ধারণা কত গভীর ছিল।

এই গভীরতার হাতেকলম প্রমাণ নজরুল অভিনীত সিনেমা ভক্ত ধ্রুব। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি। পায়োনিয়ার ফিল্ম কোম্পানি ছবিটি প্রযোজনা করেছিলেন। গিরিশ ঘোষের লেখা ‘ধ্রুব চরিত’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমার চিত্রনাট্য। মূল কাহিনি পৌরাণিক। কবি-অভিনেতা নজরুল এই ছবির জন্য গান লেখেন, সেই সঙ্গে ছবির সংগীত পরিচালনাও করেন। ছবিটির ১৮টি গানের মধ্যে ১৭ টি-ই তাঁর লেখা। দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল নজরুল অভিনীত এই সিনেমা। সিনেমাটির মধ্যে যে দৃশ্যে নজরুলের প্রবেশ ঘটছে, সেখানে দেখা যায়, বালক ধ্রুব শ্রীবিষ্ণুর উদ্দেশ্যে কাতরস্বরে বলছে , “দেখা দাও দেখা দাও”। সেই সময় নারদবেশে নজরুলের প্রবেশ ঘটছে। শুভ্র বসন। ধীরে ধীরে তিনি বালকের সামনে এলে। দেখলেন। তারপর সংলাপ। তাঁর প্রবেশ, হাঁটা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি অভিনয়ে স্বচ্ছন্দ ছিলেন। কবির সংলাপ, “নিঝুম কান্তারে কে হরি গান গায়…”

একের পর এক কথোপকথন। নিখুঁত টাইমিং। মাপা ডায়লগ ডেলিভারি। মনেই হবে না এটি তাঁর প্রথম অভিনীত সিনেমা। সংলাপের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে বাম হাতের আঙুল সঞ্চালনা।‌ চোখ প্রশান্ত। মুখ সর্বদায় হাস্যময়। অভিনয় মানে যে শুধু ডায়লগ ডেলিভারি নয়,প্রবেশ, প্রস্থান, দাঁড়ানো,শরীরের ভাষা— সবই যে অভিনয়ের অঙ্গ তা তাঁর অভিনয় দেখলে বোঝা যায়। সেই সঙ্গে তিনি যখন ভগবান বিষ্ণুর কথা বলছেন তখন তাঁর চোখের অভিব্যক্তি অন্যরকম, অর্থাৎ নীরবতার ভাষাও রপ্ত করেছিলেন তিনি। আবার শিশু ধ্রুবর সঙ্গে কথা বলার সময় হাসির সঙ্গে ঝড়ে পড়ছে স্নেহমাখা সংলাপ। নারদ চরিত্রে নজরুলের সাজসজ্জা নিয়ে পত্রিকায় নানা সমালোচনা হয়। তাঁর জবাবে তিনি বলেন, “আমি চিরতরুণ ও চিরসুন্দর প্রিয় নারদের রূপই দেবার চেষ্টা করেছি।” বলাই বাহুল্য, পৌরাণিক চরিত্রটির প্রতি নজরুলের এক ধরনের ভাললাগা ছিল। ফলে ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও নজরুল নারদের উদাহরণ তুলে ধরেন বারবার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিশ্বের কাছে এখনও অধরাই থেকে গিয়েছেন নজরুল

Kazi Nazrul Islam: শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থরক্ষায় 'লাঙল'-এর প্রস্তাবনায় যে কথাগুলি লিখলেন নজরুল তাকে কীভাবে সরিয়ে রাখা সম্ভব হল?

বলতেই হয়, গানের সুর ভক্ত ধ্রুব সিনেমাকে আলাদা মাত্রা দেয়। সেই সময়ে দেখা গিয়েছে অনেক সিনেমা শুধুমাত্র গানের জোরেই হিট করেছে। সেসব সিনেমার বহু গানের সুর তিনি দিয়েছেন। সেই সঙ্গে দিয়েছেন কণ্ঠ। শিশু অভিনেতা প্রবোধের সাথে একটি একক, একটি যুগলবন্দিতে তাঁকে দেখা যায়। গানের ক্ষেত্রে নজরুলের অভিব্যক্তি ছিল স্বতন্ত্র। গানের এক একটি শব্দকে তিনি সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভক্ত ধ্রুব চলচ্চিত্রের জন্য নজরুলের সুর দেওয়া গানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

"হৃদিপদ্মে চরণ রাখো", "ফিরে আয় ওরে ফেরে আয়", "নাচো বোনমালি", "জয় পিতাম্বর শ্যাম সুন্দর" এবং "কাদি না" "জাগো ব্যাথার ঠাকুর", "অবিরতা বাদল বরষিছে", "চমকে চপলা মেঘে মগন গগন", "ধুলার ঠাকুর", "হরিনার সুধা" ইত্যাদি।

পরবর্তীকালে পাতালপুরী, গোরা, গৃহদাহ, চৌরঙ্গীর মতো কালজয়ী সিনেমায় সঙ্গীতপরিচালক নজরুল ইসলামের সঙ্গে বারবার পরিচয় ঘটে সাধারণ মানুষের। আবার ধূপছায়ার ছবিতে ধরা দিয়েছেন অভিনেতা নজরুল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিশু পাগলের চরিত্রে কাজী নজরুল! যে ‘রক্তকরবী’-র খোঁজ জানেন না অনেকেই

Kazi Nazrul Islam in Raktakarabi : নন্দিনী যদিও বা হলো, এবার খোঁজ চলল বিশু পাগলের। শিশিরকুমারের একমাত্র পছন্দের নাম ছিল- কাজী নজরুল ইসলাম।

আজ নজরুল জন্মের ১২৫ বছর পর নজরুলের এই কীর্তির দিকে তাকিয়ে মনে হয় সত্যিই তিনি ছিলেন সর্বগুণের অধীশ্বর। অথচ তাঁকে নির্দিষ্ট মাপের বাক্সবন্দি করেই তুলে ধরা হলো। অনেক কিছুই জানা বাকি রয়ে গেল। সাহিত্য বা সংগীতের জগতে পাশাপাশি চলচ্চিত্রে জগতের যে নজরুল, তাঁকে আরেকবার জানার চেষ্টা করা যেতে পারে।

সূত্রনির্দেশ

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
স্রেফ শ্যামাসংগীতই নয়, স্বতন্ত্র শাক্তদর্শন ছিল নজরুলের

Kazi Nazrul Islam: দেবীকে সামরিক সজ্জায় সজ্জিত হতে আহ্বান করছেন এক ভক্তকবি। মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর প্রলয়ঙ্করী রূপ।

১. ‘নজরুল-কাব্যে পুরাণ-ঐতিহ্যের প্রাসঙ্গিকতা’: ড. শ্যামলকান্তি দত্ত (লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক বাংলা বিভাগ, সিইউএফ)

২. ‘নজরুল ও জীবনানন্দের কবিতায় পুরাণ ও চিত্রকল্প’: মাওলা প্রিন্স

৩. Introduction to the Puranas: Encyclopedic Literature From Ancient India (500-1500 CE)

৪. ‘পদচিহ্ন সাহিত্য পত্রিকা’: লাভপুর : তারাশঙ্কর সাহিত্যসভার মুখপত্র

লিখেছেন
Sounak Thakur
Sounak Thakur
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।