নদিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জার্মানি, বাঘ-সিংহকে বশ মানাতেন এই বাঙালি

Debabrata Mondal
৩ মিনিট
নদিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জার্মানি, বাঘ-সিংহকে বশ মানাতেন এই বাঙালি

এই কাহিনি বাঙালির এক দুর্ধর্ষ নায়কের। যাঁর হাত ধরে কোনও একসময় বাঙালি পাড়ি দিয়েছিল সপ্তসমুদ্র, যার হাত ধরে বাঙালি এক লহমায় ঝেড়ে ফেলেছিল তার চিরাচরিত ‘ঘরকুনো’ অপবাদ। সত্যজিৎ রায়ের ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ গল্পে উল্লেখ আছে এই ব্যক্তিত্বের। তাঁর পরিচয় দেওয়ার আগে দু’টি ঘটনা বলে নেওয়া প্রয়োজন।

নদিয়া জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম নাথপুর। শেষ বিকেলের রোদ্দুর নব রঙে রঙিন করে তুলেছে গ্রামের মেঠো পথঘাটকে। গ্রামছাড়া রাঙা মাটির পথ ধরে ঘরে ফিরছে এক বছর বারোর কিশোর। হঠাৎই পাশের জঙ্গল থেকে ছুটে এল একটি বন্য শূকর, হিংস্রভাবে তেড়ে গেল সেই বছর বারোর কিশোরের দিকে। তারপর কিছুক্ষণের অসম লড়াই।কাছেই ছিলেন কিছু নীলকর সাহেব। তাঁরা যতক্ষণে ঘটনাস্থলে ছুটে এসেছেন ততক্ষণে শূকরটিকে মাটিতে ফেলে শরীরের ধুলো ঝাড়তে ব্যস্ত সেই অসমসাহসী কিশোরটি।

এর পরের ঘটনা বাংলার বাইরের। মাদ্রাজ তখনও চেন্নাই হয়ে ওঠেনি। রাতের নিয়ন আলোর রোশনাইকে তার অলংকার করে মাদ্রাজ প্রতি মুহূর্তে যেন আরও মোহময়ী হয়ে উঠছে। এমন সময় সস্তার এক ধর্মশালা থেকে বেরিয়ে এল সুঠাম এক যুবক। সকালের ট্রেনেই কলকাতা থেকে মাদ্রাজ এসেছে সে। রাতের অন্ধকারে সুন্দরী মাদ্রাজের রূপ-রস–গন্ধকে উপভোগ করতে রাস্তায় নেমেছে এই যুবক। এমন সময় পাশের গলিতে শোনা গেল এক মহিলাকণ্ঠের আর্তচিৎকার। শোনামাত্র একছুটে পাশের গলিতে হাজির যুবকটি। দেখতে পেল, একদল আততায়ীর আক্রমণে বিপন্ন এক মহিলা। ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। আততায়ীদের ধরাশায়ী করে কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্ধার করল সে এই মহিলাকে।

উপরের দু’টি ঘটনার অবিসংবাদিত নায়ক যিনি, তিনি হলেন কর্নেল সুরেশ বিশ্বাস। ঊনবিংশ শতকের বাংলা তখন নব চেতনার উন্মেষ ঘটাতে ব্যস্ত। এমন এক সময়, যখন কলকাতার জোড়াসাঁকোতে জন্ম নিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঠিক সেই সময়ই নদিয়ার এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নিচ্ছেন সুরেশ বিশ্বাস নামক এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। সুরেশের বাবা ছিলেন ছাপোষা চাকুরে, অন্যদিকে সুরেশ চিরদিনই ভিন্ন ধাতুতে গড়া। কিশোর বয়স থেকেই চূড়ান্ত অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় সুরেশের দৌরাত্ম্যে গ্রামের প্রায় প্রতিটি সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। ফলে, কিছুদিনের মধ্যেই একপ্রকার বাধ্য হয়ে নদিয়ার বাস ওঠাতে হল সুরেশের বাবাকে। কলকাতা এসে ডেরা বাঁধলেন বালিগঞ্জ অঞ্চলে। কিন্তু নতুন শহরটাকে বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে এক মুহূর্তে আপন করে নিয়েছিল সুরেশ। পাশে পেয়েছিল লন্ডন মিশন কলেজের প্রফেসর মি. আটসনকে। মূলত তাঁর উৎসাহেই সুরেশ আরও আকৃষ্ট হয় অ্যাডভেঞ্চারিজমের প্রতি। অন্যদিকে, সময় কিন্তু থেমে থাকেনি। কালের নিয়মে সময় সুরেশকে তৈরি করে নিচ্ছিল নিজের মতো করে। একদিকে চাকরির খোঁজ, অন্যদিকে দেশ-বিদেশের বইপত্র পড়া- দুইই চলছিল সমান তালে। তারই সঙ্গে তাল রেখে বাড়ির সঙ্গে, পরিবার–পরিজনের সঙ্গে সুরেশের দূরত্ব বাড়ছিল ক্রমাগত। অবশেষে একদিন বাড়ির সঙ্গে সমস্ত নাড়ির টান ছিন্ন করে দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়লো নদিয়ার সেই অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে সুরেশ বিশ্বাস।

এরপর চলে যাওয়া যাক জার্মানির হামবুর্গ শহরে। সময়টা বসন্তকাল, প্রেমের ঋতু।জার্মানির আকাশে-বাতাসে তখন নব প্রেমের সুসংবাদ। ঠিক এই সময়ই হামবুর্গের একপ্রান্তে একটি মাঠে দেখা মিলল বেশ কিছু তাঁবুর। বসন্তের সমাগমের সঙ্গে সঙ্গে সার্কাসের দলও হাজির, তাদের হরেকরকম মজার খেলার পসরা নিয়ে। এখানেই জার্মানরা পরিচিত হল এক বাঙালি যুবকের সঙ্গে। যে অভূতপূর্ব দক্ষতায় কাবু করে ফেলছে সার্কাসের ভয়াল সিংহকে, এমনকী, জার্মানির এই সার্কাসের মধ্যেই খোঁজ মেলে ফ্যানি নামক একটি বাঘের, যাকে অদ্ভুতভাবে নিজের বশে রাখতে সক্ষম হন কর্নেল সুরেশ বিশ্বাস।

তবে শুধু সার্কাস নয়, আরও একটি কারণে হামবুর্গ খ্যাত হয়ে আছে সুরেশের জীবনে।এখানেই তিনি দেখা পেয়েছিলেন তাঁর প্রেয়সীর। জার্মান তরুণীটি সুরেশের অসীম সাহস দেখেই তাকে মন দিয়ে ফেলেছিলেন কি না, তা জানা যায় না। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের প্রথম পর্বের সেই প্রেম পূর্ণতা পায়নি। কারণ সেই তরুণী ছিলেন সেই সময়ের এক ডাকসাইটে সুন্দরী। ফলে পানিপ্রার্থীর অভাব ছিল না তাঁর। তাঁর যসমস্ত প্রেমিকরা একনাগাড়ে খুনের হুমকি দিতে থাকে সুরেশকে। ফলে, একপ্রকার বাধ্য হয়ে জার্মানি ত্যাগ করতে হয় তাঁকে। না, এবার রেঙ্গুন বা কাছেপিঠের কোনও দেশ নয়। সুরেশ পাড়ি জমালেন সুদূর ব্রাজিলে। জার্মানি ছাড়ার আগে প্রেমিকার উদ্দেশ্যে তাঁর উক্তি ছিল: তোমার-আমার মাঝে আকাশ–পাতাল ব্যবধান। আমাদের বিয়ের সম্ভাবনা নেই।পারলে আমায় ভুলে যেও।

১৮৮৭ সালে ব্রাজিলের অশ্বারোহী বাহিনীর কর্পোরাল পদে অধিষ্ঠিত হলেন সুরেশ বিশ্বাস। ১৮৯৩ সালে হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল। এই সময়ই আধুনিক যুদ্ধবিদ্যা পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়ে মাত্র পঞ্চাশজন সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে ব্রাজিলের সেনা বিদ্রোহকে দমন করেন তিনি।

ঊনবিংশ শতকের বাংলা তথা সমগ্র ভারতের বুকে সাহসিকতার লেলিহান অগ্নিশিখা জ্বেলে দিয়েছিলেন এই বীর বাঙালি সন্তান সুরেশ বিশ্বাস। নদিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম নাথপুর থেকে ব্রাজিল– পথটা সহজ ছিল না। কিন্তু তারপরেও তাঁকে অবলীলায় অতিক্রম করেন এই অগ্নিপুরুষ। আত্মবিস্মৃতিতে জর্জরিত বাঙালি কি এই বীরত্বের কাহিনি মনে রেখেছে?

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ আগস্ট, ২০১৬

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।