কেন্দ্রে কার্নিভাল আর প্রান্তে মৃত্যুমিছিল! নেতারা আর কবে দায়বদ্ধ হবেন?

Kolkata’s Carnival and Bengal’s Pain: যে মানুষেরা উত্তরবঙ্গ, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, বর্ধমানে থাকেন তাঁদের বুঝিয়ে দেওয়া হলো প্রান্তবাসীর বিপর্যয়ে কেন্দ্রের বিনোদন যজ্ঞ বন্ধ করা যায় না।

Suman Kalyan Moulik
৩ মিনিট
কেন্দ্রে কার্নিভাল আর প্রান্তে মৃত্যুমিছিল! নেতারা আর কবে দায়বদ্ধ হবেন?

"আমরা মেয়ে বেচতে যাবো না কলকাতায়/ কোলকাতা কিনে আনবো মেয়ের বিয়েতে"

—তারক সেন

শব্দ ব্রহ্ম কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে বোধহয় তা সত্যি নয়। তাই তো অঙ্গারভূমির উল্লেখযোগ্য কবির প্রত্যয় ভরা লাইনগুলো মলাটবন্দি হয়েই থেকে গেছে। আমরা কলকাতাকে কিনতে পারিনি বরং আমাদের যাবতীয় স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্খা, কল্পনা নিয়ে রোজ সেঁধিয়ে যাচ্ছি এক ভয়ঙ্কর হাঁ করা গহ্বরে, যার নাম কল্লোলিনী কলকাতা। সম্প্রতি এ বঙ্গভূমে ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনা আরেকবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে এ রাজ্যের সব মানুষের ভালো-মন্দ, আনন্দ-দুঃখ ঠিক করবে কলকাতা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বৃষ্টি, ধসে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গ, কার্নিভাল স্থগিত করা গেল না কেন?

Uttarbanga Disaster: শনিবার উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর রবিবার সারাদিন কেটে গেলেও মুখ্যমন্ত্রীর দেখা মেলেনি উত্তরবঙ্গে। তিনি ব্যস্ত ছিলেন পুজো কার্নিভালে, কলকাতায়।

শারদ উৎসবের ঠিক আগে কলকাতায় এক রাতের রেকর্ড বৃষ্টি, অসহায় মানুষের তড়িতাহত হয়ে মৃত্যু, জলমগ্ন কংক্রিটের জঙ্গল এবং বইপাড়ার অপূরণীয় ক্ষতির কোলাজ যে বিষাদ প্রতিমা তৈরি করেছিল, তার উদযাপন ছিল সার্বজনীন। সেই শোকে আমরা যাতে অংশ নিতে পারি, টিভি চ্যানেলের রাত-দিনের ধারাবিবরণী যাতে আমাদের চোখ এড়িয়ে না যেতে পারে, তার জন্য সরকার বাহাদুর দু-দিনের ছুটি ঘোষণা করলেন। আমরা অংশত মেঘলা আকাশকে সঙ্গী করে দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টিহীন আগাম শারদ উৎসবে মাতলাম। আর দুর্গাপুজোর সমাপ্তি লগ্নে যখন প্রবল বর্ষণে বানভাসি উত্তরবঙ্গ, চারদিক ধ্বংসস্তুপ, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত মানুষের সারি, আর্ত মানুষেরা রাস্তায় তখন কার্নিভালে মেতেছে শহর কলকাতা। ক্ষমতার কেন্দ্রে ও উপকেন্দ্রে থাকা রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী, বণিকসভার কর্তাব্যক্তি সুসজ্জিত মঞ্চে দন্ডায়মান, পাশে রঙ মাখা সঙের দল এবং অবশ্যই শহর কলকাতার আমোদগেঁড়ে প্রিয় সহনাগরিকেরা- সবাই এই জনগণের করের টাকায় হওয়া বিনোদন যজ্ঞে সামিল। এই কার্নিভাল মানবিক না অমানবিক, শ্লীল না অশ্লীল, সেই প্রশ্ন অবান্তর। মূল বিষয় হলো এই কার্নিভালের বার্তা। যে মানুষেরা উত্তরবঙ্গ, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, বর্ধমানে থাকেন তাঁদের বুঝিয়ে দেওয়া হলো প্রান্তবাসীর বিপর্যয়ে কেন্দ্রের বিনোদন যজ্ঞ বন্ধ করা যায় না। কলকাতার বানভাসি হওয়ার ঘটনা দাবি করে সার্বজনীন প্রতিক্রিয়া, উত্তরবঙ্গের বন্যা নেহাৎই এক আঞ্চলিক ঘটনা, যেমনটা ঘাটালে প্রতিবছর হয়। আলিপুরে গগনচুম্বী ফ্ল্যাটের বাসিন্দার জলমগ্ন হওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্যে যে মেট্রোপলিটন শোভনতা আছে তার সঙ্গে ভূতনির চরের সব হারানো মানুষটার অসংস্কৃত যন্ত্রণার তুলনা চলে না।

উত্তরবঙ্গে এই বিপর্যয়ের মধ্যে কলকাতায় এই কার্নিভাল হওয়া কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। এই ঘটনায় যার সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তাদের স্মরণ করাতে চাই যে আমাদের প্রতিবাদও আজ কলকাতা কেন্দ্রিক। অভয়ার নৃশংস হত্যার ঘটনা কলকাতার এক মেডিক্যাল কলেজে ঘটেছিল বলেই সারা কলকাতা পথে নেমেছিল। ক'দিন আগে রামপুরহাটে এক আদিবাসী কিশোরীর ধর্ষণ নৃশংস হত্যায় আমাদের অখন্ড নীরবতা কলকাতার মাহাত্ম্যকে মনে করিয়ে দেয়। আমাদের যাবতীয় প্রশাসনিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ভাষ্যে কলকাতার এই শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত। আমরা যারা প্রান্তে থাকি তারা সবাই কলকাতার নিজস্ব উপনিবেশের অঘোষিত প্রজা। বিকেন্দ্রীকরণ নেহাৎই এক কথার কথা, আদতে কলকাতার শংসাপত্র ছাড়া সব কিছুই অচল। নগর পরিকল্পনা হোক বা পরিবহন, সবকিছু কলকাতাকে ঘিরেই। কলকাতা বানভাসি হওয়ার পরে দৈনিক সংবাদপত্রের পাতায়, টিভির আলোচনায়, উত্তর সম্পাদকীয় নিবন্ধে যে পরিমাণ উদ্বেগ ও সুচিন্তিত আলোচনা লক্ষ্য করেছি তার কণামাত্র নজরে পড়ে না আসানসোল-রানীগঞ্জের ধ্বস কবলিত হওয়ার নিত্য দিনের আখ্যানে বা মালদায় গঙ্গাবক্ষে একের পর এক গ্রাম তলিয়ে যাওয়ার আর্তনাদে।

এই আধিপত্যবাদের ইতিহাস সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকে লেখা হচ্ছে। আজ শাসক পাল্টেছে কিন্তু নীতি ও কৌশল একই থেকে গেছে। এই আধিপত্যের গল্পের অনেকটা জুড়ে আছে সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা। কলকাতার মানুষের বাচনভঙ্গী, বেশবাস, পাতাল রেল, কফি হাউস, ফিশ কবিরাজি, বিরিয়ানি, নন্দন, পার্ক স্ট্রিট- সব মিলিয়ে একটা মাপকাঠি যার নিরিখে মফস্বলের মানুষ তার ভদ্রবিত্তের সংস্কৃতিতে অংশীদারিত্ব বিচার করে, তৈরি হয় নতুন নতুন কলকাতা তৈরির প্রয়াস। এই আগ্রাসন ইতিমধ্যেই গ্রাস করেছে বারাসত, বারুইপুর, ব্যারাকপুর, শ্রীরামপুর, চন্দননগরের মতো একদা সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ঐতিহ্যবাহী জনপদকে। মিনি কলকাতা বানাবার নেশাকে মান্যতা দেবার জন্য আনা হচ্ছে বৃহত্তর কলকাতার ধারণাকে।

পরিবর্তনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যে বিদ্বৎজনেরা এই সরকারের মধ্যে সাব-অল্টার্ন বৈশিষ্ট্য দেখে রীতিমত সন্দর্ভ রচনা করেছিলেন, আধিপত্যের এই নির্লজ্জ প্রদর্শন নিয়ে তারা কী ভাবছেন তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। আর এই কলকাতার সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের গল্পকে মস্তিষ্কে ধারণ করে মফস্বলের যাবতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে পৌরোহিত্য করতে আসেন কলকাতার বিদ্বৎজনেরা। কবিতা উচ্চারিত হয় :

"আমরা সবাই সেই দিনটির প্রতীক্ষায় / যেদিন তিনি আসবেন,/ সবাইকে শুনিয়ে বলবেন: 'এই গ্রীষ্মে কাসুন্দি খুবই ভালো!'/ আর আমরা সবাই মাথা নেড়ে জানাবো/ এ সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতাটি তাঁর মুখ থেকেই উচ্চারিত হলো।( বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।"

কলকাতার ভালো হোক।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।