তপন সিংহ বলতেন, 'চারুলতার থেকেও তোমার আরতিকে আমার বেশি ভালো লাগে'

Madhabi Mukherjee
৩ মিনিট
তপন সিংহ বলতেন, 'চারুলতার থেকেও তোমার আরতিকে আমার বেশি ভালো লাগে'

প্রথম 'মহানগর'-এর আরতির জন‍্য ডাক পাওয়াটা মনে পড়ে। সত্যজিৎ রায়ের তরফ থেকে দূর্গা সেন এব‌ং অনিল চৌধুরী এসে বলেন, সত্যজিৎ রায় ডেকে পাঠিয়েছেন, বাড়ির ঠিকানা ৩ নম্বর লেক টেম্পল রোড। তখন সত্যজিৎ রায় ওই ঠিকানায় থাকতেন, মেনকা সিনেমা হলের কাছাকাছি। আমি তখন মাকে বলেছিলাম, "এখান থেকে ট্যাক্সিভাড়াও অনেক। আমাকে দেখে সত্যজিৎ রায়ের পছন্দ হবে না। গিয়ে লাভটা কী হবে?" মা বললেন, "ডেকে পাঠিয়েছেন যখন, তখন একবার যাওয়া উচিত!" এই কথোপকথন চলছে যখন, তখন দুর্গাবাবু আর অনিলবাবু আবার ফিরে এলেন, এসে বললেন, ট্যাক্সিভাড়াটা রাখুন। তখন যেন একটু লজ্জা পেয়ে ওটা নিতে চাইনি, কিন্তু ওঁরা জোর করে ট্যাক্সিভাড়াটুকু দিয়ে গেলেন।

সত্যজিৎ রায় তখন তিনতলা বা চারত‍লায় থাকতেন সম্ভবত, যত দূর মনে পড়ে। আমি গেলাম, ওঁর সঙ্গে কথাবার্তা বললাম। তখন 'অভিযান'-এর আউটডোর চলছে। সত্যজিৎবাবু বললেন, "আমি আউটডোর থেকে ফিরে এসে আবার কথা বলব।" আমি তখন ভাবলাম, পাত্র-পাত্রী দেখার সময়ও তো এমন কথা হয়, পরে কথা হবে বলে আর হয় না। ওই নিয়ে আমি আর বিশেষ ভাবিনি। কিন্তু ফিরে এসে আবার ডাকলেন আমাকে। 'মহানগর'-এর চিত্রনাট্যটা শোনালেন এবং আমার হাতে দিলেন সেই চিত্রনাট্য। তখন বুঝলাম, হয়তো সত্যিই আমি কাজটা করছি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'যে তোমার গায়ে হাত তোলেনি কক্ষনও, সে এসেছে', ফিসফিস করে বললেন মানিককাকা

Aparna Sen: যেহেতু আমরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তাম, মা বাংলা শেখানোর জন্য খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।

চিত্রনাট্য পড়লাম। নরেন্দ্রনাথ মিত্রর গল্প। গল্পটা সময়োপযোগী। তখন সময়টা এমনই ছিল, বাড়ির মেয়েরা কাজে বেরলে তা নিয়ে সংসারে অশান্তি হত। আমার তো তখন সংসার ছিল না। ফলে, আরতির মতো অশান্তি আমার ক্ষেত্রে হয়নি। যাই হোক, দশ দিন বা বারো দিন টানা শুটি‌ং হয়েছিল, মনে পড়ে। সেই সময় চোখে একটা আঞ্জনি হল। আমি খুবই ভয় পেয়েছিলাম, সিনেমায় যদি দেখা যায়! কিন্তু এমনভাবেই শট নিয়েছিলেন, কিছুই বোঝা যায়নি ছবিতে।

'মহানগর'-এর আরতি সংসারের প্রয়োজনেই কাজ করতে বেরিয়েছে। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, সকলের আপত্তি আছে তাতে। সেসব আপত্তি এড়িয়েও যখন সে বেরল, তখন আস্তে আস্তে তার আত্মবিশ্বাস তৈরি হল। একটা দৃঢ় প্রত্যয়ও তৈরি হচ্ছিল তার। আরতির খ্রিস্টান সহকর্মী এডিথ সিমনস-কে অসম্মান করা হল যখন, তখন সে রেজিগনেশন দিয়ে দিতেও দেরি করেনি। তার স্বামী সুব্রতরও তখন চাকরি নেই, চাকরি ছেড়ে তার মুখোমুখি হতে ভয় পেয়েছিল আরতি। কিন্তু তারপর সেই শেষ দৃশ্য, যেখানে আরতি বলে, "এত বড় শহর, এতরকম চাকরি, দু'জনের একজনও কি পাব না একটা?" সুব্রত বলে, "চেষ্টা তো করি, আমার বিশ্বাস, দু'জনেই পাব।" বলে দু'জনেই হাঁটতে থাকে শহরের রাস্তায়। এই যে আরতির যাওয়া-আসা, মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা মেয়ের অভিনয়, এটা করতে অসুবিধে হয়নি। কারণ, আমি তো সেই ছোটবেলা থেকেই অভিনয় করছি। সেই ছ'সাত বছর বয়স থেকেই। তাছাড়া 'মহানগর'-এর আগে ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের ছবি করেছি। তাই একটা শিক্ষালাভও হয়েছিল। আর আমি তো এই মধ্যবিত্ত পরিসরটাকে চিনি, কাজেই আরতির অভিনয় আমার কাছে খুব কঠিন মনে হয়নি। আর অভিজ্ঞতার কথা ভেবে তো অভিনয় করি না আমরা, চরিত্র নিয়ে ভাবি, অভিজ্ঞতা আপনিই হয়ে যায়। বাকিটা ভাবেন পরিচালক, কীভাবে তিনি প্রেজেন্ট করবেন, সেটা তাঁরই ওপর। সেক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায় ছিলেন নিখুঁত।

আরতির চরিত্রায়ণ অনেকেরই খুব প্রিয়। আরতি যেমন ওই সময়ের, তেমন আবার সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়েই। তপন সিংহ বলতেন, "চারুলতার থেকেও তোমার আরতিকে আমার বেশি ভালো লাগে।" আমার কাছে 'মহানগর'-এর আরতি, 'চারুলতা', বা 'কাপুরুষ'-এর করুণা- সবক'টাই খুব প্রিয়। প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা। আর সত্যজিৎ রায়ের কাজ বলে এগুলো বেশি প্রিয়। সত্যজিৎ রায়ের কাজের বিশেষত্ব ছিল, তাঁর ছবিতে প্রেম আছে, সম্পর্ক আছে, কিন্তু তার শালীনতা কখনও মাত্রা ছাড়ায়নি। ওঁর কোনও ছবিতে এমন অশালীন কিছু নেই, যা সকলে মিলে বসে দেখা যায় না। এবং, প্রতিটি চরিত্র কোথায় বিলং করে, তা বোঝা যায়। বোঝা যায়, এটা আমার দেশেরই ছবি, আমার ভাষারই ছবি। এখন তো চরিত্রদের শিকড় বোঝা যায় না, সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কিন্তু তা স্পষ্ট।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।