'বর্জ্যের উপনিবেশবাদ'! আমেরিকার ই-বর্জ্যে ডুবে যাচ্ছে এশিয়া

Electronic waste: প্রতি বছর বাড়ছে ইলেকট্রনিক্স ‘ডেড বডি’র সংখ্যা। আর এই বর্জ্যের সুনামি এখন ছড়িয়ে পড়ছে মার্কিন বন্দর পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে।

Sonia Sarban
৩ মিনিট
'বর্জ্যের উপনিবেশবাদ'! আমেরিকার ই-বর্জ্যে ডুবে যাচ্ছে এশিয়া

আজকের স্মার্ট দুনিয়ায় স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবের নতুন মডেল প্রতিদিনই বাজারে আসছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির চকচকে আয়নার আড়ালেই জমছে এক অদৃশ্য বিপর্যয়: ই-বর্জ্য। প্রতি বছর বাড়ছে ইলেকট্রনিক্স ‘ডেড বডি’র সংখ্যা। আর এই বর্জ্যের সুনামি এখন ছড়িয়ে পড়ছে মার্কিন বন্দর পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে। বাসেল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (BAN)-এর সর্বশেষ রিপোর্টে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২,০০০ কুইন্টাল ই-বর্জ্য রফতানি হচ্ছে, যার ওজন প্রায় ৩৩,০০০ মেট্রিক টন। নামমাত্র ‘রিসাইক্লিং’-এর আড়ালে চলছে এক বিশাল আন্তর্জাতিক ব্যবসা। ২০২২ সালে বিশ্বে উৎপন্ন ই-বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ৬২ মিলিয়ন টন। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৫ সালের মধ্যে তা পৌঁছাতে পারে ৮২ মিলিয়ন টনে। এই বর্জ্যের বড় অংশই জমা হচ্ছে এশিয়ায়, যেখানে ইতিমধ্যেই বিশ্বের মোট ই-বর্জ্যের প্রায় অর্ধেক প্রক্রিয়াকরণ হয়।

এই ই-বর্জ্যের মধ্যে ফেলে দেওয়া ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস যেমন- মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টিভি এগুলিতে একদিকে যেমন মূল্যবান উপকরণ থাকে, তেমনই সিসা, ক্যাডমিয়াম ও পারদের মত মারাত্মক বিষাক্ত ধাতুও থাকে। এই আধুনিক যুগে প্রযুক্তি দ্রুত পুরনো হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষও আগের চেয়ে অনেক দ্রুততার সঙ্গে যন্ত্র বদলে ফেলছে। যে কারণে বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্যের পরিমাণ পাঁচগুণ হারে বাড়ছে, আর এই বর্জ্যের খুব অল্প অংশই সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হচ্ছে। ই-বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে বলে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য তা বড়ো বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জিয়নকাঠি! যেভাবে পরিবেশের সর্বনাশ করছে কার্বন ডাই অক্সাইড

Global Warming: সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নিত্য নতুন কলকারখানা বাড়তে থাকল, আর পাল্লা দিয়ে বাড়ল গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎপাদন, বিশেষত কার্বন ডাই অক্সাইড।

আমেরিকার এই ই-বর্জ্য বা ‘ইলেকট্রনিক আবর্জনার’ গন্তব্য এখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, এমনকি ভারতও। অনিরাপদ কারখানায় শ্রমিকেরা কোনও সুরক্ষা ছাড়াই ভাঙছে টিভি, পুড়িয়ে ফেলছে মোবাইল। আর সেই সঙ্গে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করছে সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদের মতো বিষাক্ত কণা। পরিবেশে মিশছে মারাত্মক রাসায়নিক। প্রযুক্তির আলোয় পুড়ছে প্রকৃতি আর মানুষের ফুসফুস! এই বর্জ্যের একটি বড়ো অংশ সরাসরি ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়, আবার কিছু ই-বর্জ্য পৌঁছে যায় "অনানুষ্ঠানিক স্ক্র্যাপইয়ার্ড"-এ, এটি এমন জায়গাকে বোঝায় যেখানে পুরনো বা অকেজো ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র যেমন- ফোন, কম্পিউটার, টিভি ইত্যাদি ভেঙে বা পুড়িয়ে ধাতু ও অন্যান্য উপাদানকে আলাদা করা হয়, কিন্তু কোনও সরকারি নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম-কানুন বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া। এই জায়গাগুলোতে সাধারণত দরিদ্র মানুষ কাজ করেন, যাদের সুরক্ষা না থাকার ফলে তারা বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে এসে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।

অন্যদিকে, বেশ কিছু মার্কিন কোম্পানি, যেমন: আত্তান রিসাইক্লিং কর্পোরেট ই ওয়েস্ট সলিউশনস( CEWS), ক্রিয়েটিভ মেটালস্ গ্রুপ, ইডিএম, ফার্স্ট আমেরিকা মেটাল কর্পোরেশন, আয়রন অ্যান্ড মেটাল, পিপিএম, গ্রিনল্যান্ড রিসোর্স এবং সেমসোটাই BAN-এর অভিযোগ অস্বীকার করলেও, পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। মাত্র দশটি কোম্পানি ২০২৩-২৫ সালের মধ্যে ১০,০০০-এর বেশি কন্টেইনার ই-বর্জ্য রফতানি করেছে, যার বাজারমূল্য এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি! মাসিক হিসেবে এই বাণিজ্য ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে আটটিরই R2V3 সার্টিফিকেশন থাকলেও বাস্তবে এই সনদ কার্যকরভাবে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সক্ষম নয়। এছাড়া, ক্যালিফোর্নিয়ার কঠোর ই-বর্জ্য আইনের বাধ্যবাধকতা এড়াতে অনেক প্রতিষ্ঠান সে রাজ্যের বাইরে কাজ করছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হল, অনেক চালানই ‘কাঁচা ধাতু’ বা ‘পণ্য সামগ্রী’ নামে ভুল কোডে পাঠানো হচ্ছে, যাতে শনাক্ত করা না যায়। যুক্তরাষ্ট্র বাসেল কনভেনশনের অধীনে আমদানি নিষিদ্ধ করেছে, রফতানিও। থাইল্যান্ড ইতিমধ্যেই ২৩৮ টন, আর মালয়েশিয়া ১১৮ মিলিয়ন ডলারের ই-বর্জ্য বাজেয়াপ্ত করেছে। তবু এই ই-বর্জ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়। স্থানীয় কর্মী সিপেং ওং-এর কথায়, “ধনী দেশের এই বর্জ্য রফতানি শুধু পরিবেশের ওপর চাপ নয়, এটা এক নতুন ‘বর্জ্য উপনিবেশবাদ’।” প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, স্মার্ট দুনিয়া এগোচ্ছে, কিন্তু এই স্মার্ট যুগের ই-বর্জ্যের পাহাড় হয়তো হয়ে উঠবে পৃথিবীর পরবর্তী ‘অদৃশ্য মহামারী’।

লিখেছেন
Sonia Sarban
Sonia Sarban
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?