কয়লার কালো ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে হাসদেওয়ের সবুজ ভবিষ্যৎ!

Arand forest: বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আদানি এন্টারপ্রাইজেস ও তাদের সহযোগী সংস্থা RRVUNL PEKB। পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, কোম্পানি পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ড উপেক্ষা করছে।

Sonia Sarban
৩ মিনিট
কয়লার কালো ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে হাসদেওয়ের সবুজ ভবিষ্যৎ!

মধ্য ভারতের ফুসফুস ছত্তিশগড়ের হাসদেও আরন্দ বনাঞ্চল। প্রকৃতির সুইস ব্যাংক। তবে এই ব্যাংকে এখন কেবল সবুজ নয়, জমছে ধোঁয়া। সুরগুজা থেকে সুরজপুর, কোরবা এই বিস্তীর্ণ বনভূমি অসংখ্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের আবাসভূমি। গোঁড আর ওঁরাওরা এই বনকে ধরে রেখেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাদের জন্য বন মানে কেবল গ্রিনজোন নয়, ধাত্রীদেবতাও। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে এই অরণ্যসংকুল অঞ্চল যেন রণভূমির চেহারা নিচ্ছে। একদিকে সরকারের শিল্পোন্নয়নের প্রচেষ্টা, বিশেষত কয়লা খনির প্রসার, অন্যদিকে, বনাধিকার আইন ২০০৬-এর মাধ্যমে স্বীকৃত বনবাসী আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম, উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বনাঞ্চলের আকাশ-বাতাস।

গত কয়েক বছরে ছত্তিশগড় সরকার একাধিক বেসরকারি সংস্থাকে এই বনাঞ্চলে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি দেয়। যার মধ্যে অন্যতম আদানি এন্টারপ্রাইজেস। সবচেয়ে বিতর্কিত প্রকল্প পার্সা ইস্ট ও কান্টা বাসান কয়লাখণ্ড, যা আদানি এন্টারপ্রাইজেস ও রাজস্থান রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগম লিমিটেড -এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত। এই অঞ্চলের সালহি, হরিহরপুর ও ঘাটবারা গ্রামগুলিতে বন অধিকার আইন (FRA)-এর অধীনে কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস বা সম্প্রদায়িক বনাধিকার স্বীকৃত হয়েছিল। FRA, ২০০৬-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বনবাসী আদিবাসী ও প্রথাগত বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অধিকার আইনগতভাবে স্বীকার করা। কোনো বনভূমিকে শিল্প বা খনির কাজে রূপান্তর করতে হলে সংশ্লিষ্ট গ্রামসভাগুলির শর্ত সম্মতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু হাসদেওর ক্ষেত্রে এই শর্ত উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে ব্যাপক প্রতিবাদ ও আইনি লড়াই শুরু হয়েছে।

সদ্য এক ঘটনায়, ছত্তিশগড় উচ্চ আদালত এই অঞ্চলের গ্রামবাসীদের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের সাম্প্রদায়িক বনাধিকার বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। আদালতের মতে, এই জমি “জনস্বার্থে” অর্থাৎ কয়লাখনির জন্য প্রয়োজনীয়। রাজ্য সরকারের দাবি, গ্রামবাসীদের কমিউনিটি ফরেস্ট রিসোর্স অধিকার নাকি ভুলবশত দেওয়া হয়েছিল। আদালত রাজ্যের এই যুক্তি মেনে নেয়। কিন্ত এই রায়ের বিরোধিতা করেছেন আইনবিদ, পরিবেশবিদ ও মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের মতে, এটি FRA-এর চরম অবমাননা, কারণ FRA তে স্পষ্টভাবে গ্রামসভার সম্মতি বাধ্যতামূলক করেছে। ইতিমধ্যেই অনুমোদিত CFR বাতিল করা মানে আদিবাসীদের আইন স্বীকৃত অধিকার অগ্রাহ্য করা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারত বিশ্বের নবম বৃহত্তম বনভূমি! FAO রিপোর্টে নতুন যে তথ্য উঠে এল

India environment news: FAO-র গ্লোবাল ফরেস্ট রিসোর্সেস অ্যাসেসমেন্ট (GFRA) ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের মোট বনভূমি বর্তমানে প্রায় ৭২.৭৩ মিলিয়ন হেক্টর, যা বিশ্বে শীর্ষ দশ দেশের তালিকায় এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।

কাউন্টারকারেন্টস -এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসদেও অঞ্চলে আদানিকে খনির অনুমতি দেওয়া সংবিধানের পঞ্চম তফসিলের সরাসরি লঙ্ঘন। একইসঙ্গে PESA আইন (১৯৯৬) গ্রামসভাকে স্থানীয় ভূমি ও সম্পদ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, তবে হাসদেওর ক্ষেত্রে দেখা গেছে জোর-জবরদস্তি ও ভ্রান্ত তথ্য দিয়ে তা আদায় করা হয়েছে। অনেক গ্রামবাসী অভিযোগ করেছেন, তাদের চাকরি ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্মতি নিতে বাধ্য করা হয়েছিল, কিন্তু পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। হাসদেও আরন্দ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অঞ্চল। এখানে হাতি, চিতা সহ বহু বিরল প্রজাতির প্রাণীর আবাস। এই বন একটি বিশাল কার্বন সিঙ্ক হিসেবেও কাজ করে।

কয়লা খনির ফলে প্রায় দুই লক্ষাধিক গাছ কাটা হতে পারে। এর ফলে শুধু জীববৈচিত্র্যই নয়, বরং মানব-প্রাণী সংঘাতও বাড়বে। খনির কারণে উচ্ছেদ, জীবিকা হারানো, পর্যাপ্ত পুনর্বাসনের অভাব এইসব কিছু মিলিয়ে স্থানীয়দের অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে‌‌।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আদানি এন্টারপ্রাইজেস ও তাদের সহযোগী সংস্থা RRVUNL PEKB। পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, কোম্পানি পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ড উপেক্ষা করছে। অভিযোগ, আদানির প্রভাবেই রাজ্য সরকার FRA ও PESA-এর বিধান উপেক্ষা করেছে। জলদূষণ, অবৈধ বর্জ্য ফেলা ইত্যাদি অভিযোগও উঠেছে। কোম্পানির দাবি, তারা সমস্ত আইন ও পরিবেশগত নিয়ম মেনে কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবে সরকারের সিদ্ধান্তে কর্পোরেট প্রভাবের আশঙ্কা স্পষ্ট।

হাসদেও বনবিতর্ক আসলে ভারতের উন্নয়ন মডেল ও আদিবাসী অধিকারের মধ্যে গভীর টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছে। FRA আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল আদিবাসীদের ক্ষমতায়নের জন্য, কিন্তু বাস্তবে তা প্রায়ই উপেক্ষিত। সুপ্রিম কোর্টের উচিত উচ্চ আদালতের রায় FRA ও সংবিধানের মধ্যে কোনো বিরোধাভাসের জায়গা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা । গ্রামসভার প্রকৃত সম্মতি নিশ্চিত করাও জরুরি। পাশাপাশি স্বাধীন ও কঠোর পরিবেশগত আইন প্রয়োজন। তবেই যদি আদিবাসীরা এই অধিকারের পথ খুঁজে পায়।

লিখেছেন
Sonia Sarban
Sonia Sarban
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?