মুখ্যমন্ত্রী জড়িয়ে, তবু বিধানসভার ভোটাভুটিতে কেন নেই তৃণমূলের বেশিরভাগ বিধায়ক? জল্পনা তুঙ্গে

এমন ঘটনা কেন ঘটল তৃণমূল পরিষদীয় দলের অভ্যন্তরে? রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন কাণ্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ, জটিল এবং চিন্তারও বটে।

Kanad Dasgupta
৩ মিনিট
মুখ্যমন্ত্রী জড়িয়ে, তবু বিধানসভার ভোটাভুটিতে কেন নেই তৃণমূলের বেশিরভাগ বিধায়ক? জল্পনা তুঙ্গে

রাজ্যপালের পরিবর্তে রাজ্যের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য পদে আসবেন মুখ্যমন্ত্রী, এমনই বিষয় ছিল ‘দ্য ওয়েস্টবেঙ্গল ইউনিভার্সিটি ল অ্যামেন্ডমেন্ট ২০২২ বিল-এর। বোঝাই যাচ্ছে, এই বিলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। খোদ মমতাকেই আচার্য পদে আনার লক্ষ্যে সংশোধন করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনটির। সোমবার বিলটি বিধানসভা অধিবেশনে পেশ করা হয়। এবং অধিবেশনের প্রথম দিনেই ভোটাভুটিতে পাস হয়ে যায় এই 'আচার্য-বিল'।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কে হবেন রাষ্ট্রপতি! বিরোধী ঐক্যের সর্পছিদ্রই বিজেপির পোয়াবারো?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের সর্বসম্মত প্রার্থী স্থির করতে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের ও মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি লিখেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আপাতদৃষ্টিতে এই বিল পেশ এবং পাস হওয়ার ব্যাপারটি খুবই সহজ-সরল মনে হলেও আদতে সত্যিই কি তেমন হয়েছে? বিধানসভায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে সরকার পক্ষের। যে কোনও বিল সরকারের তরফে বিধানসভায় সাবলীলভাবে পাস হয়ে যাওয়ারই কথা। আচার্য বিলের ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেস তথা দলের সুপ্রিমোর কপালে ভাঁজ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে গিয়েছে সোমবারের বিধানসভায়। যার ফলে একাধিক প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে।

বিধানসভায় তৃণমূলের মোট সদস্যসংখ্যা এখন ২২০-র কাছাকাছি। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী যুক্ত যে বিলের সঙ্গে, এদিন সেই বিলের পক্ষে ভোট পড়েছে মাত্র ১৬৭টি। অর্থাৎ ৫৩ জন তৃণমূল বিধায়ক হয় গরহাজির ছিলেন, অথবা উপস্থিত থেকেও ভোট দেননি। এমন ঘটনা কেন ঘটল তৃণমূল পরিষদীয় দলের অভ্যন্তরে? রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন কাণ্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ, জটিল এবং চিন্তারও বটে।

আরও আছে৷ এই বিল ভোটাভুটিতে যাওয়ার পর দু'বার দু'ধরনের ফল ঘোষিত হয়। প্রথমে ঘোষণা করা হয়, ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি ল অ্যামেন্ডমেন্ট ২০২২ বিলটি ১৮২-৪০ ভোটে বিল পাশ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি বিধায়করা দাবি করতে থাকেন, অধিবেশনে হাজির থাকা তাঁদের ৫৭ জন বিধায়কই বিলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তা হলে বিপক্ষে ৪০টি ভোট পড়ে কী করে? কোথায় গেল ১৭টি ভোট? বিজেপির তোলা অভিযোগ পত্রপাঠ উড়িয়ে দিয়ে সরকার পক্ষের চিফ হুইপ বলেন, "এদিন ১৮২জন তৃণমূল বিধায়ক হাউসে উপস্থিত ছিলেন, তাঁরাই এই ভোট দিয়েছেন।" এর অর্থ সরকার পক্ষের চিফ হুইপ নিশ্চিত ছিলেন, হাউজে ১৮২ জন তৃণমূল বিধায়ক হাজির ছিলেন। ওদিকে সন্ধ্যা নাগাদ বিধানসভার সচিবালয়ের তরফে জানানো হয়, আগের ঘোষণায় ভুল হয়েছিল। নতুন ফল বিলের পক্ষে ১৬৭, বিপক্ষে ৫৫। এটাই যদি চূড়ান্ত হয়, তাহলে সরকার পক্ষের চিফ হুইপ কীসের ভিত্তিতে জানালেন ১৮২ জন তৃণমূল বিধায়ক হাজির ছিলেন। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন তো উঠবেই, বিলের পক্ষে তৃণমূলের ১৫টি ভোট কম হলো কেন? আসলে কেউই কোনও বিষয়ে সিরিয়াস নন, সব দায় যেন মুখ্যমন্ত্রীরই!

এদিকে প্রথম দফায় ফল ঘোষণার পর গেরুয়া শিবিরের দাবি ছিল, বিল পেশের সময় তাঁদের ৫৭ জন বিধায়ক হাউজে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই বিলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাই বিলের বিপক্ষে ভোট পড়ার কথা ৫৭টি, সেক্ষেত্রে বিপক্ষে ৪০টি ভোট পড়ে কী করে? তাদের ১৭টা ভোট কোথায় গেল? তৎক্ষণাৎ শুরু হয় জল্পনা, ভোটদানে হয় পদ্ধতিগত ভুল করে ফেলেছেন বিজেপি বিধায়কদের একটি অংশ, অথবা ঢালাও ক্রসভোটিং? অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে বিজেপির তরফে নালিশ জানানো হয়। ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ। আর মঙ্গলবার অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় স্বীকার করেছেন, সোমবার বিধানসভায় আচার্য বিলের ভোট গণনায় ভুল হয়েছিল। স্পিকার বলেছেন, ‘‘আশা করব, এমন ভুল ভবিষ্যতে হবে না। কী করে ভুল হল, তা খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় তদন্ত হচ্ছে।”

বিধানসভার ইতিহাসে এমন ঘটনা বেনজির। গণনায় ভুলের কারণে প্রথমবার বিপক্ষের ১৫টি ভোট সরকার পক্ষের দিকে চলে গিয়েছিল। এভাবেই হিসেব করার ফলে বিলের পক্ষে ভোট দেখানো হয় ১৮২। কিন্তু দ্বিতীয় গণনায় বিপক্ষের সেই ১৫টি ভোট বিজেপির দিকেই চলে যাওয়ায় বিরোধীদের ভোট ৪০ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫-য়। তবে দ্বিতীয় গণনায় দেখা যায়, বিজেপির ২জন বিধায়কের ভোট বাতিল হয়েছে। সব মিলিয়ে চূড়ান্ত ফল, বিলের পক্ষে ১৬৭, বিপক্ষে ৫৫। গণনার এই ভুল না হলেই ভালো হতো, তবুও শেষ পর্যন্ত তা মেনে নেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এমন ভুল ভবিষ্যতে হবে না।

কিন্তু মূল বিষয়টি তো রয়েই গেল। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিল বিধানসভায় পেশ করা হচ্ছে, তৃণমূল বিধায়করা তা জানতেন না, এমন হতে পারে না। ভোটাভুটির হিসেব বলছে, বিলের পক্ষে আরও ৪৮-৫০টি ভোট পড়া উচিত ছিল, ২-৪ জন অনুপস্থিত থাকতেই পারেন, কিন্তু তেমন হয়নি। তৃণমূলের পক্ষে এটা অবশ্যই চিন্তার।

রাজনৈতিক মহলের অভিমত, এই চিন্তা অমূলক নয়। দেশের আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সহমতের ভিত্তিতে বিরোধী শিবিরের প্রার্থী দাঁড় করাতে সক্রিয় হয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই লক্ষ্যেই তিনি বুধবার, ১৫ জুন, দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে দেশের বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বের এক বৈঠক ডেকেছেন। সেই বৈঠকে যোগ দিতে মঙ্গলবারই দিল্লি গিয়েছেন মমতা। সেই আবহে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিল পাস করার দিনে এত সংখ্যক দলীয় বিধায়কের গরহাজিরা অন্য এক আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে কি না, তাও ভাবার বিষয় বলেই মনে করছে রাজনীতির জগতের লোকজন।

লিখেছেন
Kanad Dasgupta
Kanad Dasgupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।