বাংলাদেশের কোটা আন্দোলন, মৃত্যু নিয়ে কেন চুপ হাসিনার 'বন্ধু' ভারত?
India on Bangladesh Quota Protest: বাংলাদেশে যেমন মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবস্থা রয়েছে ভারতেও নানা রাজ্যে নানারকম সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। দেশজুড়ে পূর্ণসময়ের শাটডাউন চলছে। এএফপি সূত্রে ৩২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। নিহতদের বেশিরভাগই ছাত্র। এরই মধ্যে শুক্রবারও দফায় দফায় সংঘর্ষের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান ঠিক কী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বাংলাদেশের সরকার ভারতের ‘বন্ধু-সরকার’। ভারত সচরাচর তাই বাংলাদেশের বিদেশ নীতির বিরুদ্ধে কোনও বক্তব্য রাখে না। কোটা আন্দোলনে বাংলাদেশে ৩৯ জনের মৃত্যু, হিংসার পরে নিজের অবস্থান জানানোর আগে কি জলই মেপে যাচ্ছে ভারত সরকার? গত বুধবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বিষয়ে আদালতের রায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। ৭ অগাস্ট এই বিষয়ে আদালতে শুনানি থাকলেও, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শুনানি এগিয়ে আনা হয় ২১ জুলাই, রবিবার। রবিবার বাংলাদেশের আদালত কী রায় দেয় ভারত কি সেই অপেক্ষাই করছে? তারপরেই 'বন্ধু' দেশের কোটা আন্দোলনের পক্ষ বা বিপক্ষ অবস্থান নেবে ভারত? নাকি উদাসীন থেকেই বজায় রাখবে দুই কুল?

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bangladesh Quota Case Hearing: "আমার মনে হয় আজ থেকে আর আন্দোলন করার কোনো প্রয়োজন নেই," বলেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
আদালতের রায় কোনদিকে যেতে পারে তার আভাস ইতিমধ্যেই দিয়েছে হাসিনা সরকার। সেদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বৃহস্পতিবার জানিয়ে দিয়েছেন, "যেহেতু সরকার আন্দোলনকারীদের বিষয়গুলো বিবেচনা করে এই দাবিগুলোতে রাজি হয়েছে, আমার মনে হয় আজ থেকে আর আন্দোলন করার কোনও প্রয়োজন নেই।" আন্দোলন প্রত্যাহার বা স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন মন্ত্রী। সরকার যদি আন্দোলনকারীদের মতোই কোটা সংস্কার চেয়ে থাকে তাহলে কেন গুলি চলল? পড়ুয়াদের সঙ্গে সরকারের ঐক্যমত হয়ে থাকলে কেন বাংলাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করতে হল? কেন মানুষের মৃত্যু হলো? হাসিনা সরকার যদি আন্দোলনকে ভয় না পেয়ে থাকে তাহলে রাজধানী ঢাকায় সমস্ত সভা মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞা কেন জারি করল?
বাংলাদেশে যেমন মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবস্থা রয়েছে ভারতেও নানা রাজ্যে নানারকম সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই তপশিলি জাতি ও উপজাতি অর্থাৎ এসসি ও এসটিদের বিরুদ্ধে সাধারণ শ্রেণির ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভকে নানা রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারও করে। অন্যদিকে, কিছুদিন আগেই কর্ণাটক সরকার ভূমিপুত্র-ভূমিকন্যাদের জন্য বেসরকারি চাকরি সংরক্ষণের লক্ষ্য বিল পেশ করে। যদিও বাংলাদেশের এই বিক্ষোভের আঁচে তা আপাতত স্থগিত রাখা হয়। এদেশে নানারকমের জাতিগত সংরক্ষণ ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি। রাজনৈতিক পালাবদলে এই সংরক্ষণ নীতির ভূমিকা রয়েছে। এমনকী নরেন্দ্র মোদির আমলে ওবিসি সংরক্ষণ, সংখ্যালঘু সংরক্ষণ নিয়ে তুলকালাম হয়েছে। সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন কমে যাওয়ার পিছনে তপশিলি জাতি-উপজাতিদের জন্য সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার আশঙ্কা অন্যতম কারণ ছিল। এই অবস্থায় পড়শি দেশের কোটা নিয়ে ভারত নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে বিপদ বাড়াবে না স্বাভাবিকই।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Shahidul Alam on Bangladesh Quota Protest: আমি নিজে চোখে দেখেছি, ৪ টি মাত্র ছাত্রকে দমন করতে ৪০০-র বেশি পুলিশ বন্দুক নিয়ে, প্রিজন ভ্যান নিয়ে ঘিরে ধরছে।
কিছুদিন আগেই শেখ হাসিনা চিন সফর করে এসেছেন। এই মুহূর্তে ভারত ও চিনের সম্পর্ক তিক্ততম। চিন ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা প্রকল্প, রোহিঙ্গা সমস্যা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য চিনের ঋণ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তিস্তা মহা-পরিকল্পনা নিয়ে অবশ্য কোনও কথাই হয়নি দুই দেশের। বাণিজ্য, বিনিয়োগ কিংবা পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও চিন বিশাল কোনও সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দেয়নি।
২১টি সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে চার ধরনের ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে চিন। চিনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ইউয়ান আর্থিক সহায়তার আশ্বাসও দিয়েছেন। গত চার অর্থবর্ষে বাংলাদেশে তিন বিলিয়ন ডলার এসেছে চিন থেকে। হাসিনা চিনের কাছে হাত পেতে ভারতকে খানিক বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তান ও চিনের ভালো সম্পর্ক, ভারত ও বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক, আর চিন ও বাংলাদেশের ভালো সম্পর্কের মাঝে ভারত-চিনের 'শত্রুতায়' বাংলাদেশকে হাতছাড়া করা ভারতের পক্ষে ভালো হবে না। তাই আপাতত হাসিনা সরকারের বিষয়ে মুখে কুলুপ আঁটাই শ্রেয়। তাছাড়া বাংলাদেশের কোটা আন্দোলনকে বিরোধী বিএনপির ঘাড়ে ঠেলে দিতে চেয়েছিলেন হাসিনা। অভিযোগ করেছিলেন, কোটা আন্দোলনের আড়ালে মিশে গিয়েছে নানা বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি। বিএনপি প্রত্যক্ষভাবে ভারত বিরোধী, এমন বক্তব্য বারবার উঠে এসছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে জল্পনা, এই বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে তারেক রহমান দেশে ফিরে ক্ষমতায় আসার ছক কষছেন। সেই ছকে ভারত কখনই ইন্ধন জোগাবে না।

ভারত জানে, ইন্দিরার আমলে হলেও, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশে যে কিঞ্চিৎ আবেগ আছে, এদেশের রিফিউজি মানুষদের যে আবেগ আছে তাকে হারালে আখেরে ক্ষতিই। তবে বাংলাদেশকে যতই না চটাতে চাক ভারত, প্রতিবেশী দেশটিতে কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই ভারত বিদ্বেষী হাওয়াও উঠেছে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্র সাংবাদিক শহিদুল আলম ইনস্ক্রিপ্টকে এক সাক্ষাৎকারে জানান, "ভারত বয়কটের ডাক তীব্র হচ্ছে এখন। এবং ভারত সরকারের কিন্তু মনে রাখা দরকার শেখ হাসিনা তাদের জন্য এখন একটা 'লায়াবিলিটি'। হাসিনা সরকার জনগণকে ভারতের বিরুদ্ধে এতটা তিক্ত করে দিয়েছে যে সেটা মোটেও ভারতের পক্ষে ভালো বিষয় নয়।" বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অর্থাৎ ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ভারতের বড় ভূমিকা ছিল। সেই ভারতকেই এখন বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে কারণ আম জনতা মনে করে বাংলাদেশকে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে ভারতের কাছে। এই অবস্থায় ভারত দাঁড়িপাল্লার কোন দিকে নিজস্ব বাটখারাটি বসাবে তা আপাতত রবিবারের পরেই সম্ভবত স্পষ্ট হবে।






