নানা সময়ে বিশ্বজুড়ে যে রাজনৈতিক দলগুলি নিষিদ্ধ হয়েছে

Banned political parties: দেখা গেছে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পরও উক্ত সংগঠনগুলিকে তাদের নির্দিষ্ট ভাবাদর্শ বা রাজনীতি থেকে দূরে রাখা দুরুহ হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরও দলগুলি প্রকাশ্যে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছে।

Tanvia Barua
৪ মিনিট
নানা সময়ে বিশ্বজুড়ে যে রাজনৈতিক দলগুলি নিষিদ্ধ হয়েছে

অপরিসীম জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক শক্তি, শাসনক্ষমতা পাওয়ার পরও বিশ্বে বহু রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। অনেক দলের বিরুদ্ধেই অভিযোগ রয়েছে- চরমপন্থা, সহিংসতা, রাষ্ট্রবিরোধীতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের। তবে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরও অনেক দলই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায়। সংগঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে সংগঠকেরা নিজেদের রক্ষা করতে অনেক সময়ই আত্মগোপন করেন। ফলে তাদের উপর নজর রাখা কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় এতে চরমপন্থারও জন্ম হয়। দেখা যাক, বিশ্বে কোন কোন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)

২০০৯ সালে ভারতের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বলে রাখা ভালো, কংগ্রেসের সময় থেকেই ২১ বছর পুরনো এই দলকে ভারতের প্রধান 'অভ্যন্তরীণ শত্রু বলে' উল্লেখ করা হত। দেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারও একই পথে হেঁটেছে। এই দল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫,৫০০ কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। তবে অনেক রাজ্যেই এই দল এখনও সক্রিয়। বলে রাখা ভালো, বিনা বিচারে এনকাউন্টার করা নিয়ে বারংবার প্রশ্ন তুলেছেন সমাজকর্মীরা।

আওয়ামী লীগ

২০২৪ সালের ৫ অগস্ট, ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে বাংলাদেশে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এই রাজনৈতিক দলের নেত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দমন করতে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। এতে প্রাণ হারান কয়েকশো মানুষ। বর্তমানে ইউনূস নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই গণহত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রেখেছে।

টিএলপি বা তেহরিক-ই-লাব্বাইক

২০২১ সালে পাকিস্তান সরকার পঞ্জাবের টিএলপি বা তেহরিক-ই-লাব্বাইক-কে নিষিদ্ধ করে। এই দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশকে হত্যা করার প্রমাণ ছিল। তবে ২০২২ সালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হয়। কারণ স্থানীয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চাপ বাড়ছিল, তাই প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম না চালাতে দিয়ে উপায় ছিল না। বলে রাখা ভালো, পাকিস্তানের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে এই দলই ৩০ লক্ষ ভোট পায়। এই নির্বাচনে টিএলপি বা তেহরিক-ই-লাব্বাইক চতুর্থ প্রধান দলের মর্যাদা পেয়েছে।

জার্মানির নাৎসি পার্টি

১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে ক্ষমতায় ছিল অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি পার্টি। এই দলই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। হলোকাস্টে প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে এই দলের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে মিত্র বাহিনী নাৎসি পার্টিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৪৫ সালে জার্মানির আইনে এই দলের প্রতীক, স্লোগান ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।

কেপিডি (KPD) বা জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি

কেপিডি বা জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি ছিল ওই দেশের একটি প্রভাবশালী মার্কসবাদী দল। জানানো হয়েছিল, দলটির আদর্শ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় যুক্ত।

ফ্যাসিস্ট পার্টি ইতালি (PNF)

এটি বিশ্বের প্রথম ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল। এই পার্টির আদর্শ ছিল কট্টর জাতীয়তাবাদ। ফ্যাসিস্ট পার্টির মুসোলিনি শাসনকালে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও গণহত্যা চালানো হয়। ১৯৪৩ সালে মুসোলিনির পতন হয় এবং ইতালির নতুন সরকার ফ্যাসিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

মুসলিম ব্রাদার হুড

২০১২ সালে মিশরের গণতান্ত্রিক নির্বাচনে এই দলটির প্রার্থী মোহাম্মদ মোরসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর দলটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়াতে এবং ২০২৫ সালে জর্ডানে এই দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বার্থ পার্টি ইরাক

এটি ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন আরব জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী একটি দল। ইরাকে বহু বছর এই দল ক্ষমতায় ছিল। দলটির বিরুদ্ধে কুর্দি ও শিয়া জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক নিপীড়ন ও গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

রেফাহ পার্টি তুরস্ক

এটি ওয়েলফেয়ার পার্টি নামেও পরিচিত একটি ইসলামপন্থী দল। ১৯৯০-এর দশকে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এই পার্টি। প্রথমে দলের প্রধান ছিলেন নেজমেত্তিন এরবাকান। ১৯৯৮ সালে আদালত থেকে এই দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। ধর্মীয় আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে হুমকির মুখে ফেলার অভিযোগ এই দলের বিরুদ্ধে।

গোল্ডেন ডন

এটি গ্রিসের একটি উগ্র-ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দল। অভিযোগ এই দল শরণার্থী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়েছিল। যদিও ২০১২ সালে গ্রিক পার্লামেন্টে জায়গা পেয়েছিল এই পার্টি। পরে এই দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও খুনের অভিযোগ ওঠে। ২০২০ সালে নিষিদ্ধ করা হয় এই দলকে।

আরএসএস

২০২৫ সালে আরএসএস-এর ৯৯ বছর পূর্ণ হল। এই দলের ওপর চারবার নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালে গান্ধীকে হত্যা করার কারণে আরএসএস-এর কর্মীদের ওপর প্রথম নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তারপর ১৯৯২ সালে ফের এই সংগঠন বাবরি মসজিদ গুড়িয়ে দেয়। বারংবার নিষেধাজ্ঞার পরও এই সংগঠন নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছে। এখন ভারতের ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তাদের সহযোগী দল বিজেপি ক্ষমতায়। কেন্দ্রেও এখন বিজেপি সরকার পরপর তিনবার ক্ষমতায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, একের পর এক অপরাধমূলক কাজের পরও রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি সমর্থনের কারণে সংগঠনকে নিষিদ্ধ রাখা কঠিন হয়ে গিয়েছে।

উল্লেখ্য, দেখা গেছে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পরও উক্ত সংগঠনগুলিকে তাদের নির্দিষ্ট ভাবাদর্শ বা রাজনীতি থেকে দূরে রাখা দুরুহ হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরও দলগুলি প্রকাশ্যে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছে। একের পর এক গণহত্যা, গণঅত্যাচরের প্রমাণ থাকার পরও দলগুলির কার্যক্রম থামানো যায়নি। আরএসএস, টিএলপি-সহ উল্লেখিত সব দলগুলি ফৌজদারি অন্যায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পরও কীভাবে তারা জনসমর্থন পেল তা প্রকৃতই গবেষণার বিষয়।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।