বারাসাতের ৫০০ বছর পুরনো এই কালীবাড়ির সঙ্গে জড়িত আছে রঘু ডাকাতের নাম!

Dakat Kali: বিভিন্ন রাজবাড়ি থেকে ডাকাতি করে রঘু ডাকাত এখানেই আসতেন সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে।

Sourish Das
৪ মিনিট
বারাসাতের ৫০০ বছর পুরনো এই কালীবাড়ির সঙ্গে জড়িত আছে রঘু ডাকাতের নাম!

বহু পুরনো সময় থেকেই অবিভক্ত বাংলাদেশে ডাকাতির সঙ্গে কালীপুজোর এবং তন্ত্রসাধনার একটা আলাদা যোগাযোগ রয়েছে। বহু বছর ধরেই ডাকাতরা কালীপুজো করে আসেন। আগেকার দিনে যারা ডাকাত ছিলেন তারা ডাকাতি করতে যাবার আগে কালীপুজো করতেন বলে শোনা যায়। তবে তাদের পুজোর রীতিনীতি আলাদা রকমের ছিল। আজকের যেরকম আধুনিক পুজোর রীতিনীতি রয়েছে তার থেকে বেশ কিছুটা আলাদা ভাবে পুজো করতেন ডাকাতরা। কিছু জনশ্রুতির দৌলতে সেই ইতিহাসের কিছু কিছু তথ্য আমরা এখনও জানতে পারি। বাংলার বুকে বহু পিঠস্থান নির্মাণে বাংলার পুরনো দস্যু এবং ডাকাতদের বেশ কিছু অবদান রয়েছে বলে জানা যায়।

পুরনো ইতিহাস ঘাঁটলেও ডাকাত দলের সঙ্গে কালীপুজোর কিছু ঘটনা জানা যায়। এই বাংলায় কালীপুজোর সূচনাও বেশ কিছু ডাকাতের হাত ধরেই। বর্তমানে বাংলায় বেশ কিছু জায়গায় বেশ কিছু কালীবাড়ি রয়েছে কিন্তু তার মধ্যেও সবথেকে বেশি রয়েছে ডাকাত কালীবাড়ি। কলকাতায় এবং কলকাতার আশেপাশে যে কয়টি ডাকাত কালীবাড়ি জনপ্রিয়তার মধ্যে সবথেকে বেশি জনপ্রিয় হলো পূর্ণদাস রোডে ডাকাত কালীবাড়ি এবং বারাসাতের মধ্যমগ্রামের ডাকাত কালীবাড়ি।

যে ক'টা জায়গার কালীপুজো সবথেকে জনপ্রিয় তার মধ্যে অন্যতম উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত। কালীপুজোর কথা উঠলেই সবার আগে মনে বারাসাতের নাম ভেসে আসে। সারাবাংলায় সবথেকে জনপ্রিয় দুর্গাপুজো যেমন কলকাতায়, তেমনই সবথেকে জনপ্রিয় কালীপুজো হয় বারাসাতে। বারাসাতের কিছু নামকরা কালীপুজোর মধ্যে অন্যতম হলো কেএনসি রেজিমেন্টের মতো ক্লাব। কিন্তু বারাসাতে একটি কালিবাড়ি রয়েছে যাতে প্রায় ৫০০ বছর ধরে পূজিতা হন কালী। আর সেই কালিবাড়ির সঙ্গে জড়িত রয়েছে রঘু ডাকাতের নাম। আগেকার দিনের ডাকাত সর্দার রঘু ডাকাতের নামে বারাসাতের মধ্যমগ্রামে রয়েছে একটি ডাকাত কালীবাড়ি। সেই ডাকাত কালী বাড়ির কিছু গা ছমছমে ইতিহাস নিয়েই আজকের আলোচনা।

উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতের ২২ নম্বর ওয়ার্ডে এই ডাকাত কালীবাড়ি অবস্থিত। মধ্যমগ্রামের বাদু রোডের উপরে এই ডাকাত কালীবাড়িটি অবস্থিত। ডাকাত কালীবাড়ি নাম শুনলেই কেমন একটা গা ছমছমে ভাব আসে। আর এই মন্দিরের সঙ্গে যে ডাকাতের নাম জড়িয়ে রয়েছে তিনি হলেন ডাকাত সর্দার রঘু ডাকাত। ৫০০ বছর ধরে একটানা এই কালীবাড়িতে কালীর পুজো হয়ে আসছে নিয়মনিষ্ঠা ভরে। এই কালীবাড়িতে একটি বটগাছতলাও আছে যা এই কালীবাড়িকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

শোনা যায়, কালীবাড়ির এই বটগাছতলা ছিল ডাকাত সর্দার রঘু ডাকাতের একমাত্র আস্তানা। বিভিন্ন রাজবাড়ি থেকে ডাকাতি করে রঘু ডাকাত এখানেই আসতেন সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে। তিনি ছিলেন কালী ভক্ত। তিনি যখন ডাকাতি করতে যেতেন তার আগে মা কালীর কাছে মানত করে যেতেন। তখন থেকেই এই কালীবাড়িতে পুজো হয়ে আসছে কালীর। তবে, বর্তমানে মন্দির বলতে রয়েছে ওই একটি বটগাছ। এই মন্দিরে কোনও বিগ্রহ দেখা যায় না। বর্তমানে ওই বটগাছের গোড়াটাকে পুজো করা হয় কালীর বিগ্রহ হিসেবে।

সঙ্গেই এই মন্দিরে পুজো করার বেশ কিছু নিয়ম-নীতি রয়েছে। এই মন্দিরে কোনও পুরোহিতের প্রবেশ নিষেধ। যদি পুজো করতে হয় তাহলে মন্দিরের বাইরে প্রতিমা রেখে পুজো করতে হবে। সেইমতো প্রত্যেক অমাবস্যায় এবং কালীপুজোর দিন সারারাত ধরে কালীর পুজো করা হয় এই ডাকাত কালীবাড়িতে। প্রথম দর্শনে এই বাড়িটিকে পোড়ো বাড়ি কিংবা ভুতুড়ে বাড়ি হিসাবে মনে হলেও বাদু কাজীপাড়া অঞ্চলের এই কালীবাড়িকে ঘিরে অসংখ্য জনশ্রুতি এখনও ঘোরাফেরা করে।

রঘু ডাকাতের আরাধ্যা কালীমূর্তি এখন আর এই বাড়িতে না থাকলেও রঘু ডাকাতের সঙ্গে জড়িত বটগাছকেই কালীমূর্তি হিসেবে পুজো করা হয়। কথিত আছে, একটা সময় দলবল নিয়ে এই বটগাছতলায় আস্তানা গেড়েছিলেন রঘু ডাকাত। কালীভক্ত হবার কারণে তিনি ওই বটগাছ তলায় একটি অষ্টধাতুর কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই মূর্তিটি কে পুজো করে ডাকাতি করতে যেতেন রঘু ডাকাত। স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে শোনা যায়, একটা সময় নাকি সামন্ত রাজাদের লেঠেল বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন রঘু ডাকাত। সেই সময়ের আগে তলোয়ার দিয়ে ওই কালী মূর্তি ভেঙে দিয়েছিলেন রঘু ডাকাত নিজেই।

পরবর্তীতে ওই ভাঙা মূর্তিতেই তিনি পুজো করতেন। দীর্ঘ বেশ কয়েক যুগ ধরে ওই ভাঙা মূর্তিতে কালীপুজো করতেন তার বংশধররা। পরবর্তীতে ওই পুজো চালিয়ে যান এলাকার বাসিন্দারা। তবে, বছর কয়েক আগে হঠাৎ করেই ওই মন্দির থেকে রঘু ডাকাতের সেই কালী বিগ্রহটি চুরি হয়ে যায়। তারপর থেকে এলাকার বাসিন্দারা ওই বটগাছকে কালীর মূর্তি হিসেবে পুজো করে আসছেন। মন্দিরের সম্পূর্ণ অংশটাকে ইতিমধ্যেই ঘিরে ফেলেছে ওই বটগাছটি। মন্দিরের ছাদ আটকে আছে শুধুমাত্র বটগাছের শক্ত শক্ত ঝুরিগুলির জন্য।

যশ হোক কিংবা আম্ফান, শত বাধা-বিপত্তি আসলেও মন্দিরের ছাদের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। একটা ইটও খসে পড়ে যায়নি ওই মন্দিরের ছাদ থেকে। স্থানীয়রা বলেন, ওই বট গাছের ঝুরি এমন ভাবে নেমে এসেছে যে দেখে মনে হয় ওটা কালীর দুই পা। মন্দিরের ভিতরে একটি ছোট্ট আলোর ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া, এই মন্দিরে অনেকেই মানসিক করে যায়। মানসিকের অসংখ্য সুতো যেন সেই দেওয়ালের রং পরিবর্তন করে দিয়েছে। রঘু ডাকাতের আস্থানা হওয়ায় একটা সময় এই এলাকা দিয়ে বিকেলের পরে আর কেউ যেতেন না, আর এখন ওই জায়গাটি হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী কালিবাড়ী, যেখানে মানসিক করে বহু মানুষের মনের বাসনা পূর্ণ হয়েছে। বর্তমানে, রঘু ডাকাতের আস্থানা থেকে পরিবর্তিত হয়ে এই বাড়িটি হয়ে উঠেছে বারাসাতের বিখ্যাত ডাকাত কালীবাড়ি।

অনেকেই এই পোড়োবাড়িতে, থুড়ি কালীবাড়িতে আসেন ফটোশুট করতে। আবার অনেকে বাদু রোডে পিকনিক করতে গেলে এই জায়গাটা ঘুরে যান। এই জায়গার আশেপাশে কিছু রাজবাড়ি, বাগানবাড়ি এবং একটি বিখ্যাত পুকুর রয়েছে যার নাম মাকড়সা পুকুর। স্থানীয় মানুষ রঘু ডাকাতের এই কালিবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন। যে কেউ এই কালিবাড়ির একেবারে ভিতরে প্রবেশ করে যেতে পারেন না। পুরোহিতের প্রবেশ এই কালীবাড়িতে নিষেধ। তবে এই মন্দিরের ভেতরে যদি পুজো দিতে হয় তাহলে বাইরে একটি ছোট্ট মন্দির রয়েছে যেখানে আপনাদের পুজো দিতে হবে। পুরোহিত যদি আসতে চান তাহলে ওই মন্দিরে পুজো দিতে হয়। অনেকেই এই কালী বাড়ির ইতিহাস জানতেন না। তাই চাইলে আপনিও কালীপুজোর দিন অথবা বছরের অন্য যেকোনও দিন একবার গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন রঘু ডাকাতের এই কালিবাড়িতে।

তথ্যসূত্র -

  • https://bengali.news18.com/news/local-18/north-24-parganas-kali-puja-2021-history-of-barasat-dakat-kalibari-at-barasat-north-24-parganas-683197.html

লিখেছেন
Sourish Das
Sourish Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।

মল্লভূমে দুর্গাপুজোর সময় জানাত কামান, জলঘড়ি মাপত ক্ষণ

Bishnupur Durga Puja: বিষ্ণুপুররাজের কাছে একসময় প্রায় ১,২০০টি কামান ছিল বলে স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করেন। রাজা গোপাল সিংহদেবের (১৭১২–১৭৪৮) সময় সংখ্যাটা প্রায় দ্বিগুন হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

ব্যারিকেড ঘেরা দিল্লি, নজরদারির চোখে নাগরিক: নিরাপত্তা নাকি নিয়ন্ত্রণ?

Delhi Under Siege: জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লি কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে। ৩৫ হাজার পুলিশ, কাঁটাতারের ব্যারিকেড, ড্রোন নজরদারি, ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ২৪ ঘণ্টার ইন্টারনেট শাটডাউন, ৭ হাজারের বেশি আটক। ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতির অভিযোগ তুলেছেন, দিল্লিতে 'কাশ্মীর মডেল'-এর প্রয়োগ চলছে।

দশমীতে দেবীর মূর্তি খণ্ড খণ্ড করে বিসর্জন! কোচবিহার রাজবাড়ির পুজোর বিচিত্র রীতি

Cooch Behar Rajbari Durga Puja: সালটা ১৮৮৭, বাকিংহাম প্যালেসের আদলে নির্মিত হয়েছিল কোচবিহার রাজবাড়ি। রাজবাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজ পরিবারের সদস্যদের নানা ঘটনা। রাজ পরিবারের এই পুজোয় মাকে নর-রক্ত দিয়ে অষ্টমীর গভীর রাতে পুজো করা হতো।

বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ভোগ: কোথাও কাঁচা ইলিশ, কোথাও শালু শাপলা

Bonedi Bari Durga Puja Bhog: এইবার পুজোর লেখা লিখতে গিয়ে ভাবলাম তাঁদের কথা বলি—আমাদের বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়ির পুজোর কথা। যাদবপুরের দত্ত বাড়ির পুজো— তাঁদের বাড়ি মা আসেন রাজবেশে। তাঁদের ভোগে প্রতিদিন তিনটি অন্ন থাকবে—ভাত, খিচুড়ি, পোলাও ও পরমান্ন। এ ছাড়া রোজ থাকবে কচুর শাক, এমনকী সন্ধিপুজোর ভোগেও কচুর শাক তাঁরা নিবেদন করেন।

বড়ো বাড়ি, মনসাতলা, নতুন বাড়ি: তিন ঠিকানায় বেঁচে আছে মাকড়দহের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির সাড়ে তিনশো বছরের পুজো

Makardaha Durga Puja: নারায়ণ শিলা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে 'অনন্তদেব' নামেই পরিচিত। জগদীশ বাচস্পতি এই নারায়ণ শিলা দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরই প্রপৌত্র রামকানাইকে। দুর্গাপুজোর সময় অনন্তদেব বন্দ্যোপাধ্যায়দের তিন বাড়িতেই পূজিত হন।

হেরিটেজ স্বীকৃতি পেতে চলেছে কলকাতার পাঁচ পুরনো চায়ের দোকান

Old Tea Shops in Kolkata: কিছু পুরনো দোকানকে নতুন করে পরিচিতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়া। শুধু স্বীকৃতি দেওয়াই নয়, দোকানগুলির ভিতরের অংশ সংস্কার করে তাদের আরও সুন্দর করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।