বিয়াাল্লিশ পর্যন্ত উদ্দাম জীবন, বিয়েই বদলে দিয়েছিল ইমরানকে

Sindhu Som
৪ মিনিট
বিয়াাল্লিশ পর্যন্ত উদ্দাম জীবন, বিয়েই বদলে দিয়েছিল ইমরানকে

ইমরান খান– ক্রিকেটের ইতিহাসে নামটি উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু পাকিস্তানের রাজনীতির ইতিহাসে? ইমরান খান বিতর্কে আরেকবার সরগরম আন্তর্জাল দুনিয়া। সকলেরই এক প্রশ্ন। রাজনীতির ইনিংস এত তাড়াতাড়ি কি ফুরিয়ে গেল কাপ্তানের? আসলে রাজনীতি তো ঠাসবুনোট নয়, তার অনিশ্চয়তার ভাঁজে ভাঁজে থেকে যায় ফিরে আসার আশ্বাস। অনুরাগীরা সেই খড়কুটোটুকু ধরে ভাসতে চান। তবে রাজনীতিক ইমরানের অনুরাগী আদৌ বাকি রয়েছে কি না– সেটা জরুরি প্রশ্ন। সমর্থনহীন, পরিত্যক্ত এই পথে কি হাঁটতে পারবেন ইমরান খান? যদি না পারেন, তবে রাজনীতিক ইমরান কি বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবেন? যে প্রধানমন্ত্রীকে সরে দাঁড়াতে হয়, রাজনীতির মতো ভাবমূর্তিসর্বস্ব জায়গায় তিনি আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন তো? একদা ক্রিকেটে লক্ষ মানুষের মন জয় করা এই ব্যক্তিত্বের কি তবে রাজনীতিতে আসাটাই ভুল হয়েছিল? প্রশ্ন অনেক। এইসব প্রশ্নদের ভিড়ে এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক ইমরানের জীবনের নানা বর্ণময় ঘটনা।

রাজনীতিতে আসার আগে একবার এক সাক্ষাৎকারে অসাবধানী ইমরান বলেছিলেন, “প্লেবয়টা একটু বাড়িয়ে বলাই, তবে সন্ন্যাসীও আমি নই!” পাকিস্তানের এক জমিদার বংশে ইমরান খান নাজির জন্ম। প্রাথমিক পড়শোনা পাকিস্তানেই, এইচিশন কলেজে। পরে অক্সফোর্ডের ওয়রচেস্টার গ্রামার স্কুল ও কেবল কলেজে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা। পড়াশোনায় কপাল তেমন না খুললেও ক্রিকেটটা হয়ে গেল হঠাৎ করেই। ’৭১ সালে পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট দলে যখন টেস্ট খেলা শুরু করলেন, তখন তাঁর বয়স ১৮। ব্যাটিং এবং বোলিং– দুইয়েই দক্ষ ছিলেন। ১৯৭৪-এ ওয়ান ডে খেলা শুরু করছেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই। আবার অক্সফোর্ডে থাকাকালীন ‘অক্সফোর্ডস ব্লুজ’–এ খেলেছেন ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ অবধি। অক্সফোর্ড থেকে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শেষ করে পাকাপাকি ফিরে আসছেন পাকিস্তানে। জাতীয় দলে নিয়মিত খেলা শুরু হচ্ছে ১৯৭৬-এই। এরপরে খ্যাতির চূড়ান্ত। সেই পথেই ১৯৯২-এর বিশ্বকাপ। পাকিস্তানকে কাপ জিতিয়ে দিয়েছিল ‘কাপ্তান’-এর নেতৃত্বই।

বিচিত্র ছিল তাঁর যাপন। সবথেকে পরিচিত ছবিগুলির মধ্যে একটি, ‘বিগ বয়েজ প্লে অ্যাট নাইট’ লেখা একটি টি-শার্ট পরে পোজ দিচ্ছেন ইমরান। তখন জীবনের নেশা তুঙ্গে। প্রায় রোজ নাইটক্লাবে দেখা যেত তাঁকে। সঙ্গে কোনও মডেল বা অভিনেত্রী বা অভিজাত নারী। ব্যাপারটা উপভোগ করতেন ইমরান। লর্ড গর্ডি হোয়াইটের কন্যা সীতা হোয়াইটের সঙ্গে প্রেম ছিল একদা। লাইমলাইটের নানা নাম আকছার জড়িয়ে পড়ত ইমরানের সঙ্গে। প্রথম থেকেই ‘পলিঅ্যামোরাস’ ঝোঁক তাঁর ছিল। জীবনের নেশায় প্রথম বিয়াল্লিশটি বছর বিয়ে করেননি ইমরান। সম্ভবত, এই সময়টুকু তাঁর জীবনের, তাঁর ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠ পর্যায় বলা চলে। ১৯৯৫ সালে প্রথম বিবাহবন্ধনে জড়ালেন ইমরান। ব্রিটিশ সমাজবাদী জেমাইমা গোল্ডস্মিথের বয়স তখন ২১ মাত্র। ক্রিশ্চান জেমাইমা ইসলাম নিলেন। সংসারে জড়ালেন। এই বিয়ের যখন বছরদশেক বয়েস, ২০০৪-এ, মিউচুয়াল ডিভোর্স হয়ে গেল। আবারও একা ‘কাপ্তান’। তবে ১৯৯৬ থেকে রাজনীতির আশপাশে দেখা যাচ্ছিল তাঁকে। সেই কারণে আগের জীবনে ফিরে যাওয়ার কিছু বাধাবিপত্তি ছিল। ফলে, গতিবিধি আলো থেকে অন্ধকারে এল।

২০১৫-য় ব্রিটিশ-পাকিস্তানি সাংবাদিক রেহম নাইয়ার খানের সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহ। কিন্তু এই বিয়ে দশ মাসের মাথায় ভেঙে গেল। বিবিসি-র বিখ্যাত আবহাওয়া বার্তা উপস্থাপক রেহম ইমরানের যাপন একদমই পছন্দ করলেন না। নিজের আত্মজীবনীতে ইমরানের বহুবিধ সম্পর্কের কথা খোলাখুলি লিখলেন তিনি। এমনকী, রেহমের দাবি অনুসারে পাঁচটি অবৈধ সন্তানও রয়েছে ইমরানের। যদিও এই ঘটনা আলোয় থাকা মানুষদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রায় প্রতি বছরই কোনও না কোনও খেলোয়াড় এই অভিযোগে অভিযুক্ত হন। তবে রেহমের বইতে ইমরানের বহুনারীসঙ্গের পাশাপাশি কোকেনের নেশার কথাও উঠে এসেছে। একের পর এক এইসব অভিযোগে নালে-ঝোলে অবস্থা সামাল দিতে রাজনীতিক ইমরান পরের চালটি চাললেন। বিয়ে করলেন তাঁর আধ্যাত্মিক উপদেষ্টাকেই। বুশরা ওয়াট্টুকে সম্পূর্ণ ইসলামি আদবকায়দায় বিবাহ করেন ইমরান। এবং হিজাব বা বুরখা না পরে কখনও বেরতে দেখা যেত না তাঁকে। সেই সময় বহু কাগজে খবর হয়েছিল, স্বপ্নাদেশ পেয়েই বুশরা বিবিকে নাকি বিবাহ করেছেন ইমরান। গুজবে এও রটেছিল, স্বয়ং মুহম্মদ নাকি ইমরানকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে নিজের জীবন ও দেশের উন্নতির জন্য বুশরাকে বিবাহ করতে আদেশ দিয়েছিলেন। কুসংস্কারগ্রস্ত বলেও ইমরানের পরিচিতি ছিল। ফলে, সেই স্বপ্নাদেশ রাখতেই নাকি ইমরানের বিবাহ এই প্রিনিকে। সুন্নি মহিলা আধ্যাত্মিক উপদেষ্টাকে ‘প্রিনি’ বলা হয়। বুশরা পাঁচ সন্তানের জননী। সত্তরের কাছাকাছি ইমরানকে এই বিয়ে নিয়ে বারবার বলতে শোনা গেছে, এ কেবল আধ্যাত্মিক যোগ, শারীরিক আকর্ষণের তেমন ভূমিকা ছিল না এতে।

২০১৮-র নির্বাচনে বিপুল জয়ের পরে ইমরানের ওপর বুশরার প্রতিপত্তি আরও বাড়ে। গোঁড়া ঐতিহ্যপন্থী হয়ে পড়েন ইমরান এবং সাতের শতকে মদিনা যেমনটি ছিল, পাকিস্তানকেও তিনি তেমনটি করেই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

যদি খেয়াল করা যায়, প্রতিটি বিয়ে ইমরানকে আরও গোঁড়া করে তুলেছে। ইমরানের তিনজন স্ত্রীর মধ্যে ক্রমানুসারে রক্ষণশীলতাও বেড়েছে। জেমাইমা ইসলাম গ্রহণ করার পরেও মাথা ও কেশ খোলা রাখতেন, রেহম ক্বচিৎ-কদাচিৎ দোপাট্টা ব্যবহার করতেন, সেখানে বর্তমান স্ত্রী রীতিমতো পর্দা মেনে চলেন। কেউ কেউ বলে থাকেন, যত জীবন এগিয়েছে, রাজনৈতিক চিন্তাধারাও তত প্রতিক্রিয়াশীল হয়েছে ইমরানের। ক্রিকেটার ছিলেন, রাজার মতো বাঁচতেন, দলীয় রাজনীতির তেমন সম্যক ধারণা ইমরানের কোনওদিনই ছিল না, এবং তা বজায় রাখার ক্ষমতাও ছিল না তাঁর। এখন রাজ্যের অপবাদ-অপমান মাথায় নিয়ে যখন মাথা নিচু করে সরে দাঁড়াতে হল, তখন কি এই কথা আদৌ ভাবছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী? ক্রিকেট মাঠের অনবদ্য সাফল্যের কথা কি তাঁর মনে পড়ছে একবারও?

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।