তাঁত শিল্প এবং তার ইতিবৃত্ত

Amit Patihar
৪ মিনিট
তাঁত শিল্প এবং তার ইতিবৃত্ত

প্রতিটা রাজ্য বা জাতির নিজস্ব খাদ্যরুচি, পোশাক রুচি, নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি থাকে। আমাদের বাংলাও এই নিয়ম থেকে বহির্ভূত নয়। বরং দেশের আর পাঁচটা রাজ্যের তুলনায় বাংলা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং শিল্পের দিক থেকে কয়েক পা এগিয়ে রয়েছে সে কথা বলাই বাহুল্য। বাংলার পোশাকের বিভিন্ন ধরনের স্বাদের ছোঁয়া পাওয়া গেলেও প্রাচীন কাল থেকে ছেলেদের ধুতি পাঞ্জাবি এবং মেয়েদের শাড়ির ব্যবহার কিন্তু চলেই এসেছে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে। আজকে জেনে নেবো মেয়েদের শাড়ির এক অন্যতম পছন্দের শ্রেণী তাঁত সম্পর্কে। তাঁত ব্যবহার করেননি এমন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বাংলায় হাতে গোনা, কিন্তু এই তাঁত গত পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলায় যেভাবে লড়াই করে এসেছে তার ইতিহাস সত্যিই অবাক করার মতো।

ছবি সৌজন্যে : Googleযেমনটি প্রথমেই বললাম, তাঁতের আনুমানিক বয়স ৫০০ বছরেরও বেশি। বলা হয় মোঘল সাম্রাজ্যের সময় তাঁতের খ্যাতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। এই সময় মসলিন তাঁত ব্যবহার করতেন অপেক্ষাকৃত ধনী বা রাজগৃহের মানুষেরা আর সুতির কাপড় ব্যবহার করতেন বাদবাকি সাধারণ মানুষ। পরবর্তীকালে যখন ভারতে ব্রিটিশ রাজত্ব শুরু হয় ঠিক তখন ইংরেজ সরকারের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায় তাঁত শিল্প। এই জমানায় ম্যানচেস্টারে তৈরি কাপড় ভারতীয় বাজারে ভরিয়ে দিতে চেষ্টা করে ব্রিটিশ সরকার, সাথে সাথে তাঁত এবং তাঁত শিল্পে বাধা নিষেধ লাগু করা হয়। কিন্তু এই কঠিন সময়ের মধ্যেও হার মানেনি তাঁত, অনেক চড়াই উৎরাই দেখলেও নিজেকে ঠিক টিকিয়ে রেখেছে বাংলার এই ঐতিহ্যশালী শিল্প। বাংলা ভাগের সময় আদি ঢাকার বহু মানুষ এপার বাংলায় চলে আসেন, বলা হয় আদি বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরাই সবচেয়ে পুরোনো তাঁত শিল্পী। প্রথমে তারা সিন্ধু অববাহিকা থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসে তাঁতের কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া শাড়ি তৈরির জন্য অনুকূল নয় দেখার পর তারা নতুন জায়গার সন্ধান করতে শুরু করেন, এবং শেষে বহু জায়গায় ঘুরে, পর্যবেক্ষণ করে তাদের ঠাঁয় হয় বাংলাদেশের রাজশাহীতে। সেখানেও কয়েকদিন বসবাস করার পর পরিস্থিতি অনেকাংশে অসুবিধায় ফেলে দেয় তাদের, এরপর তাদের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে তারা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে অর্ধেক চলে আসেন কিশোরগঞ্জে, এবং আরেকটি দল চলে যায় ঢাকায়। এরপর নিজস্ব বিবাদের জেরে বসাকরা চৌহাট্টা ও ধামরাইয়াতে বসবাস করতে শুরু করেন পাকাপাকি ভাবে।

তাঁত তৈরি হয় সুতি থেকে। উৎপাদিত সুতো প্রথমে রাসায়নিক ভাবে ধোয়া হয়, তারপর সেগুলি শোকানো হয় রোদে, তারপর সেই সুতো সাদা করা হয় আবারও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় করা, এবার সেগুলিকে আবার শুকিয়ে রঙিন ফুটন্ত জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এর পরেই সুতোয় ভাতের মাড় দেওয়া হয় এবং সেগুলিকে বাঁশের মধ্যে আরও শক্ত এবং সূক্ষ্ম করার জন্যে বেঁধে রাখা হয়। তাঁত যন্ত্রে সুতো টানাটানি ভাবে আটকে রাখা হয়। বাঁ দিক ডানদিকে আড়াআড়ি সুতোকে টানা এবং ওপর নিচে থাকা সুতোকে পোড়েন বলা হয়। তাঁত যন্ত্রে যে হাতল ঝোলানো থাকে তাকে মাকু বলা হয়। এছাড়াও তাঁত যন্ত্রের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রধান অঙ্গগুলির নাম - দক্তি, শানা এবং নরাজ। তাঁতের শাড়ির আঁচলে বা গোটা গায়ে সাধারণত নকশা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, এই নকশাগুলি তাঁত শিল্পীরাই আঁকেন। একটি তাঁতের শাড়ি বয়ন সম্পূর্ন হতে গড়ে দশ থেকে বারো ঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু শাড়ির কাজ যদি শক্ত বা জটিল হয়, সেই কাজ শেষ হতে কখনও কখনও পাঁচ বা ছ'দিন সময় লাগতে পারে।

ছবি সৌজন্যে : Googleতাঁতের কাপড় যে অঞ্চলে বোনা হয় বা কাপড়ে চিত্রিত নকশার ওপর ভিত্তি করে সেই কাপড়ের শ্রেণি বিভাগ করা যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের যে সমস্ত অঞ্চলে এই মুহূর্তে তাঁতের কাপড় সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় সেগুলি যথাক্রমে নদীয়ার ফুলিয়া ও শান্তিপুর, হুগলির ধনেখালি, আতপুর, বেগমপুর, এবং বর্ধমানের কালনা। টাঙ্গাইল থেকে যারা দেশ ভাগের আগে এপার বাংলায় চলে এসেছিলেন তাদের একটা বড় ভাগ ফুলিয়াতে থাকতে শুরু করেছিলেন, বর্তমানে ফুলিয়া এবং শান্তিপুর এলাকার মানুষ একত্রিত হয়ে যে ধরনের শাড়ি তৈরি করেন তাকে ফুলিয়া টাঙ্গাইল বলা হয়। এখানকার শিল্পীরা তথাকথিত ভাবে সবচেয়ে সুন্দর, মসৃণ এবং রঙিন শাড়ি তৈরি করে থাকে, এবং এর জনপ্রিয়তাও বিপুল। ধনিয়াখালী থেকে যে তাঁতের কাপড় উৎপন্ন হয় সেগুলিও ভীষণ ভালো মানের। সাধারণত কম নকশা এবং ছাপার কাজ করাই এর পরিচয় বহন করে। এছাড়া হুগলির বেগমপুর এর শাড়ি তুলনামূলক ভাবে হালকা ওজনের হওয়ার জন্য বিখ্যাত এবং আতপুরের নামডাক ছড়িয়ে পড়ার কারণ ছিল এখনকার নিত্যদিনের পরার কাপড় ও ধুতির জন্য। আমরা বাংলায় আটপৌরে শব্দটা ব্যবহার করি পুরোনো দিনের কাপড় পরার ধরনের ভিত্তিতে, এই শব্দটি আতপুর থেকেই এসেছে। আবার বর্ধমানের কালনা অঞ্চলে টাঙ্গাইল তাঁত বোনা হয়।

সময়ের সাথে তাঁত যন্ত্র ব্যবহার ক্রমশ কমে এসেছে, তাঁতের সাথে সাথে বাজারে অন্য বহু কাপড়ের ধরন উপলব্ধ হওয়ায় মানুষের কাছে এখন সুযোগ আর বিকল্প অনেক বেশি। দেশের স্বাধীনতার পূর্বে ব্রিটিশ সরকার বাৎসরিক দেড় লক্ষ পাউন্ডের পণ্য প্রতিবছর রপ্তানি করলেও একটা সময় তার তাঁত শিল্প বন্ধ করে নিজেদের তৈরি পোশাক বাজারে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু স্বদেশী আন্দোলনের দরুন তাঁত বেঁচে গেলেও স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে এই শিল্পের বিশেষ কোনও খেয়াল রাখা হয়নি, গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে ক্রমশ তাঁত শিল্পের অবনতি নেমে এসেছে ধনেখালি, শান্তিপুর জুড়ে। কিন্তু তাঁতিরা তাদের পৈতৃক জীবিকা ছেড়ে দিতে নারাজ, এই জীবিকা তাদের বংশগৌরব। সরকারি পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল পরবর্তী কালে। তারওপর ভিত্তি করেই এই শিল্পের ভবিষ্যত নির্ভর করে।

তথ্য সূত্র :

  • https://bn.m.wikipedia.org/wiki

  • https://www.parinita.co.in/pages/tant

  • https://www.google.com/amp/s/www.tripoto.com/trip/rural-tantshilpo-india-westbengal-heritage.amp

লিখেছেন
Amit Patihar
Amit Patihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।