ছড়ার দুনিয়ায় নিভল আলো, আর শোনা যাবে না 'বাংলাটা ঠিক আসে না'

Bhabani Prasad Majumdar: পুজাবার্ষিকী বা শারদীয়ার পাতা মানেই একসময় ভবাণীপ্রসাদের মিঠেকড়া সব ছড়ার ছড়াছড়ি। শুধু কি ছড়া, গল্পেও তিনি আসর মাতিয়েছেন বিস্তর।

Sohini Das
৩ মিনিট
ছড়ার দুনিয়ায় নিভল আলো, আর শোনা যাবে না 'বাংলাটা ঠিক আসে না'

বাংলা সাহিত্যের ধারায় ছড়া লিখেছেন অনেকেই। কিন্তু ছড়ার প্রতি তেমন ভাবে একনিষ্ঠতা দেখিয়েছেন হাতে গোনা মানুষ। সুকুমার রায়ের শ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি ছিলেন তিনি। ছোটদের মলাটের মধ্যেও যে বড়দের কথাটি গুছিয়ে বলে দেওয়া যায়, সেটাই দক্ষতার সঙ্গে আজীবন দেখিয়ে এসেছেন। আর তার মাধ্যমেই আট থেকে আশির হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন কবি ভবানীপ্রসাদ মজুমদার। বুধবার থামল সেই পথচলা। কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে বুধবার ভোরে প্রয়াত হন কবি ভবানীপ্রসাদ মজুমদার। বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

১৯৫০ সালের ৯ এপ্রিল, শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত হাওড়ার সানপুরেতে জন্ম ভবানীপ্রসাদের। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোট থেকেই কবিতাচর্চার শুরু। তবে কবিতার চেয়ে ছড়ার দিকেই বরাবর বেশি ঝুঁকে ছিলেন তিনি। সানপুর কালীতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে সেই স্কুলের অধ্যক্ষও হন ভবানীণীপ্রসাদ। ‘ভবানী স্যার’ নামে গোটা তল্লাটে দারুণ সুনাম ছিল তাঁর। পুজাবার্ষিকী বা শারদীয়ার পাতা মানেই একসময় ভবানীপ্রসাদের মিঠেকড়া সব ছড়ার ছড়াছড়ি। শুধু কি ছড়া, গল্পেও তিনি আসর মাতিয়েছেন বিস্তর। তাঁর লেখা বহু ছড়া, গল্প পড়ে বড় হয়েছে একসময়ের ছোটরা। ছোটদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা বেশি হলেও বড়দের জন্যেও যে একেবারে লেখেননি তিনি, এমনটা নয়। ছাগলের কাণ্ড, রঙ বদলের ব্যাপার স্যাপার, বাংলাটা ঠিক আসে না— এ রকম তাঁর লেখা বহু ছড়া ও কবিতা জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ছড়া লেখাকে যতই সহজ মনে করুক লোকে, আসলে কিন্তু তা বেদম শক্ত কাজ। ছড়ার মধ্যে থাকতে হয় যথাযথ কৌতূকবোধ, হাস্যরস এবং বুদ্ধিদীপ্ত ভাব। নাহলে গোটা চেষ্টাটাই বিফলে যায়। তবে ভবানীপ্রসাদের ক্ষেত্রে যে সেই কলম যথেষ্ট জোরালো, তার প্রমাণ তাঁর জনপ্রিয়তা। তাঁকে অনেকেই মনে করতেন সুকুমার রায়ের উত্তরসূরি। সুকুমার রায় শতবার্ষিকী পুরস্কার প্রাপক হিসেবেও নির্বাচিত হন ভবাণীপ্রসাদ। সেই পুরস্কার তাঁর হাকে তুলে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় খোদ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে পেয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী পুরস্কার। এ ছাড়াও আরও বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন সারা জীবনে। শিশু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সুকান্ত পুরস্কার, অমৃতকমল পুরস্কারের মতো একাধিক সম্মান ছিল তাঁর ঝুলিতে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
থামল 'অন্ধ স্কুলের ঘণ্টা', প্রয়াত কবি দেবারতি মিত্র

Debarati Mitra: সমকালীন বাকি কবিদের তুলনায় দেবারতি অবলীলায় গড়ে তুলেছিলেন এক অন্যতর কাব্যভুবন। যা প্রবল ভাবে নারীবাদী অথচ তার মধ্যে ছিল এক আশ্চর্য এক স্নেহলতা। যা জড়িয়ে ছিল তাঁর কবিতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে।

তাঁর লেখা শিশুদের জনপ্রিয় সাহিত্য পত্রিকা সন্দেশে নিয়মিত প্রকাশিত হত। আনন্দবাজার পত্রিকা-সহ বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রেও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত বই ‘ছন্দে গড়া আবৃত্তি ছড়া’, ‘মিঠে কড়া আবৃত্তি ছড়া’, ‘রক্তে ভাসা বাংলা ভাষা’, ‘মিঠে কড়া মজার ছড়া’, ‘মিঠে কড়া পশুর ছড়া’, ‘ছন্দে গড়া মহান যারা’। 'বাংলাটা ঠিক আসে না' তার অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা। আজও বাংলা ভাষাকে বাঁচানোর তাগিদে যারা লড়েন, তাদের মুখে স্লোগানের মতোই শোনা যায় এই কবিতা। বরাবরই ভাষার প্রতি এক অদম্য টান পরতে পরতে মিশে থেকেছে তাঁর লেখায়।

বাংলা ভাষা নিয়েই নাকি এংলা-প্যাংলা সবাই মুগ্ধ

বাংলা যাদের মাতৃভাষা, বাংলা যাদের মাতৃদুগ্ধ

মায়ের দুধের বড়ই অভাব

কৌটোর দুধ খাওয়াই স্বভাব

ওই দুধে তেজ-তাকত হয় না, বাংলাও তাই হাসে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
থামল মেধার বাতানুকুল ঘুঙুর

Hungry Generation poet, Malay Roy Choudhury passed away: বৃদ্ধাঙ্গুলি গুরুদক্ষিণা দিয়ে অন্ত্যজ হয়ে সরে থাকে যে একলব্য, বাংলা সাহিত্যে মলয় যেন তারই উল্টোমুদ্রা হয়ে থাকতে চেয়েছেন বরাবর। থেকেওছেন।  

বাংলাটা ঠিক আসে না!

সারা জীবনে লিখেছেন কুড়ি হাজারের বেশি ছড়া। করেছেন নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ‘মজার ছড়া’, ‘সোনালী ছড়া’, ‘কোলকাতা তোর খোল খাতা’, ‘হাওড়া-ভরা হরেক ছড়া’, ‘ডাইনোছড়া’র মতো একাধিক বই লিখেছেন তিনি। সত্যজিৎ রায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লিখেছেন ‘ছড়ায় ছড়ায় সত্যজিৎ’ এবং ‘রবীন্দ্রনাথ নইলে অনাথ’। একই সঙ্গে নানা বিষয়, নানা প্রেক্ষিতকে ছুঁয়ে গিয়েছে তাঁর কবিতাকে। যা কোনওদিনই ছোটদের হয়েও আর আটকে থাকেনি ছোটতে, বরং সেই গণ্ডি পেরিয়ে তা যে কখন সমকালীন হয়ে উঠেছে, তা বলা কঠিন।

যে ছেলেরা রাস্তা ঘাটে করছে পালিশ পরের জুতো

যে ছেলেরা ট্রেনের হকার , খাচ্ছে রোজই লোকের গুঁতো ,

লজেন্স খাওয়ার বয়স যাদের , করছে তারাই লজেন্স ফেরি

যাদের বুকে সূর্য ওঠার , গোলাপ ফোটার অনেক দেরি !

ওদের কাছে প্রশ্ন কোরো , ওরা কি কেউ সত্যি জানে

"স্বাধীনতা" জিনিসটা কি ? স্বাধীনতার সঠিক মানে?

স্বাধীনতার মানে

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে যে, গত পাঁচ বছর ধরেই নানা ধরনের বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগছিলেন কবি। শেষের দিকে শরীরে হানা দেয় ডিমেনশিয়ার সমস্যাও। দিন কয়েক আগে তাঁর নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। সঙ্গে দেখা দেয় শ্বাসকষ্টের সমস্যাও। পারিবারিক চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী গত সোমবার হাসপাতালে ভর্তি হন ভবাণীপ্রসাদ। আইসিইউ-তে রাখা হয় তাঁকে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। ভবানীপ্রসাদ চলে গেলেন। থেকে গেল তাঁর অজস্র ছড়া, যা বাঙালির আবেগে, মননে রয়ে গেল আজীবন। শিশুপাঠ্য সাহিত্যের এই আকালের যুগে যা কোথাও গিয়ে ভরসা দেবে আগামী যুগের ছেলেপুলেদের তো বটেই, একই ভাবে আগামী দিনের ছড়াকারদেরও।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।