হারিয়ে গিয়েছে যে রীতি! কেমন ছিল সেকালের বাঙালি বিয়েবাড়ির পদ্য উপহার?

Bengali Wedding Rhymes: দু'টি চরিত্রের সংলাপের মধ্যে দিয়ে কোনও এক নবযুবকের চিরকৌমার্য ব্রতভঙ্গের কথা উঠে এসেছে। আবার কখনও দেখা যায় যে, পাত্র তার স্ত্রীর মন চুরি করার দোষে সাজা পেয়েছে।

Samipeshu Das
৩ মিনিট
হারিয়ে গিয়েছে যে রীতি! কেমন ছিল সেকালের বাঙালি বিয়েবাড়ির পদ্য উপহার?

বিবাহ আর উপহারের সম্পর্ক চিরকালই মধুর। গুরুজন, আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী সবার থেকেই নবদম্পতি কিছু না কিছু উপহার পেয়েই থাকেন, তা সে ‘আশীর্বাদী’ হিসেবে হোক বা ‘যৌতুক’। কখনও বা তত্ত্বের ডালি থেকেও বিভিন্ন উপহার আসে দ্বিপাক্ষিকভাবেই। তবে উপহারের ধরন কিঞ্চিৎ বদলেছে। এখনও কিছু উপহার এক্কেবারে 'কমন'। তবে, নানা পোশাক, অলংকার, বই, গৃহসজ্জার সামগ্রীর সঙ্গে সেকালে আরও এক ধরনের উপহার প্রায় একপ্রকার বাধ্যতামূলক ছিল। বিবাহের ‘পদ্য’ বা ‘কাব্য’। সময়টা ১৯০০-১৯৮০ অবধি বিস্তৃত বলা যায়। তখন বাড়িতে যে কোনও বিবাহ উপলক্ষ্যেই পদ্য লেখার চল ছিল। চিঠি লেখার প্রবণতা থেকেই এই ছড়া বা কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা এসেছিল বলেই অনুমান করা যেতে পারে। অভিভাবকেরা আশীর্বাদের ভঙ্গিতে নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা বার্তা দিতেন। আবার অন্যান্য আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবরা রঙ্গ-রসিকতা বা ব্যঙ্গের সুরে-ছন্দে পদ্য লিখতেন। সেসব পদ্য যে সবসময় সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিরাই লিখতেন এমনটি নয়। পরিবারের কোনও সদস্য বা কোনও প্রতিবেশীর ডাক পড়ত এরকম পদ্য লেখার জন্য। তারাই হয়তো মুখে-মুখে রচনা করে দিতেন বা লিখে দিতেন। সেইসব ছড়া, কবিতা মুদ্রিত হতো কোনও প্রচারপত্রিকায়। আবার কখনও বা একাধিক পদ্য হলে সেগুলি সংকলিত হয়ে একটি পুস্তিকায় প্রকাশিত হতো।

হলুদ, গোলাপি, হালকা সবুজ, সাদা বিভিন্ন রঙিন কাগজে এই পদ্যগুলি ছাপা হতো। তার শিরোনাম থাকত নানারকম; যেমন ‘প্রীতি উপহার’, ‘আনন্দ সংবাদ’, ‘ভক্তি উপহার’, ‘আশীর্ব্বাণী’, ‘মিলনগীতি’, ‘আনন্দোচ্ছ্বাস’ ইত্যাদি। এমনকী তার অলংকরণেও চতুরানন ব্রহ্মা, প্রজাপতি, বিদেশি পরী, বাঙালি গৃহবধূ, সানাইয়ের ছবি থাকত। সেই কাগজের চারদিকে আলপনাও দেওয়া থাকত। তখন ছিল কাঠখোদাই করা ব্লকের যুগ। তাই যে কোনও একটি নকশা দিয়েই আলপনাটি ভরাট করা থাকত। পুস্তিকার প্রচ্ছদের ক্ষেত্রেও ফুলের তোড়ার ছবি দেওয়া থাকত। বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে, 'শখের দাম লাখ টাকা'। তাই সৌখিন বাঙালি শুধু কাগজেই নয়; বাহারি নকশা কাটা নরম ন্যাপকিনের ওপরেও এই ধরনের পদ্য ছাপিয়েছে। এ ছিল বিলাসিতার এক অন্য চাবিকাঠি। চিঠি সাধারণত গোপন বিষয় হলেও এই শুভেচ্ছাবার্তার মধ্যে কোনও পর্দা ছিল না। মুদ্রিত এই বিয়ের পদ্য বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রিত অতিথি, বরযাত্রী, কনেযাত্রীদের বিতরণ করা হতো। বাসরঘরে সেসব পদ্য পাঠ, আবৃত্তি করাও হতো। এই ছিল তখনকার বিনোদন। আবার দু-একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্তে দেখা যায় যে, উপহার হিসেবে সংক্ষিপ্ত কাব্যনাট্যও রচিত হয়েছে। দু'টি চরিত্রের সংলাপের মধ্যে দিয়ে কোনও এক নবযুবকের চিরকৌমার্য ব্রতভঙ্গের কথা উঠে এসেছে। আবার কখনও দেখা যায় যে, পাত্র তার স্ত্রীর মন চুরি করার দোষে সাজা পেয়েছে। তার শাস্তি হ’ল ‘সাত পাকে বাঁধা’। আবার কখনও বিজ্ঞাপন আকারেও বিবাহ সংবাদ দেওয়া হয়েছে। কেউ বা বাংলার বদলে ইংরেজিতেও এই পদ্য লিখেছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নকল গয়না, মোটা চালের ভাত, ট্যালটেলে মুরগির ঝোলের বিয়েবাড়িই বেশি টানে

Wedding Photography: পরিবারের অন্দরের গোপন কূটকচালি, অবৈধ সম্পর্ক, লুকিয়ে থাকা মুসলিম বিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ যা দেখলাম বই পড়ে বা সিনেমা দেখে সেই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হতো না।

তবে সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে এই পদ্যের বিষয় এবং ভাষারও পরিবর্তন হয়েছিল। ১৯১০-২০ সালের মধ্যে বাংলা কাব্যে সংস্কৃত ভাষার প্রাধান্য বা সাধু ভাষার প্রভাব ছিল বেশি। ১৯৫০-এর আশেপাশে দেখা যায় যে বাল্যবিবাহের প্রসঙ্গ এসেছে। পরে জনসচেতনতা ও নারীপ্রগতির সৌজন্যে তার সংখ্যা কমে যায়। এই সংস্কৃতি ছিল সারা বাংলারই। শুধুমাত্র কলকাতার ধনী পরিবারেই যে এটি সীমাবদ্ধ ছিল এমন নয়; বর্ধমান, নদিয়া, হাওড়া সহ বিভিন্ন জেলার গ্রামাঞ্চলেও এই সংস্কৃতি যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। ১৯৭০-এর দশকের সময় থেকেই এই বিয়ের পদ্যে সামান্য হলেও ছেদ পড়তে থাকে। ১৯৮০-র দশকে তা ম্রিয়মান হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকে এর দেখা পাওয়াই বিরল হয়ে যায়। অথচ বাঙালির এই নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যেই ছিল সাহিত্য-অনুরাগের বাসনা। পরবর্তীতে ছড়া বা কবিতা লেখার নানা পত্র-পত্রিকা বা সামাজিক মাধ্যমের অজস্র মঞ্চ তৈরি হয়েছে। ফলে সাবলীলভাবে সৃজনশীলতা প্রকাশের অভাব অনেকখানি দূর হয়েছে। অথচ সেই সময় বাংলার মহিলাদের বা যে কোনও সাধারণ ব্যক্তিদের মধ্যেও যে সুপ্ত কবিপ্রতিভা ছিল তা সাধারণত এই ধরনের সামাজিক, মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানেই প্রকাশ পেত। তবে এই ধরনের লিখিত উপহারগুলির যথোপযুক্ত সংরক্ষণ হয়নি। তার ফলে বহু বাংলা ছড়াই আজ বিলুপ্ত।

লোকসাহিত্যের অন্যতম উপাদান এই সমস্ত সহজ, সরল ও সুন্দর ছড়া মৌখিকভাবেই এক থেকে বহু জনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিবাহের পদ্য উপহারের ছড়াগুলি সকলের কাছে না পৌঁছলেও অন্তত লিখিত আকারে প্রকাশিত হওয়ার জন্যই তা সংরক্ষণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। বাংলা সাহিত্যের এক অন্যদিক আলোকিত হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা ছিল। তবে সেই ‘প্রীতি উপহার’-এর রেশ কিন্তু আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এখনও কারও জন্য উপহার দিলে তার ওপর একটি ছোট চিরকুটে ‘প্রীতি উপহার’ শব্দদু'টি লেখা হয়। তার সঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে নাম ও শুভেচ্ছা বার্তাও লেখা থাকে। একথা ভাবলে ভুল হবে যে, অজস্র উপহারের মধ্যে শুধুমাত্র নিজের নামটিকে চিহ্নিত করার জন্যই এই লেখার প্রচলন হয়েছে। এই লেখার মনোভাবের মধ্যেই বিয়ের পদ্য লেখার সুপ্ত রীতি আমাদের মনে রয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্ম সেই হারানো সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত না হলেও পরম্পরায় উপহারপত্রে নামোল্লেখের মাধ্যমেই সেই বিগত সংস্কৃতির ধারাকে আজও পালন করে চলেছে কিছুটা হলেও।

লিখেছেন
Samipeshu Das
Samipeshu Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নাৎসি জার্মানি থেকে FTII–SRFTI: ফিল্ম স্কুল কেন ক্ষমতার চোখে এত গুরুত্বপূর্ণ?

History of Film school's against Fasicsm: ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা ভাঙচুর করেছিল বার্লিনের ফিল্ম স্কুল টনফিল্মশুলে। ১৯৩৫ সালে মুসোলিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন ইতালির ফিল্ম স্কুল সিএসসি। ২০১৫ সালে ভারতে পুনের এফটিআইআইতে মোদী সরকারের নিয়োগ বিষয়ক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৩৯ দিনের ধর্মঘট হয়েছিল। ২০২৬-এ কলকাতার এসআরএফটিআইতে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ইট-পাথরের হামলা সেই ইতিহাসকেই পুনরাবৃত্ত করল। হামলার পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্য আজও একই, স্বাধীন সাংস্কৃতিক চর্চাকে নিয়ন্ত্রণ করা। যদিও ইতিহাস বলে, ফিল্ম স্কুল কেবল একটি ভবন নয়, একটি ধারণা, একটি মতাদর্শিক বলয়।

জেলের ৭১৬ দিন: কী পড়তেন, কী ভাবতেন, কীভাবে লড়তেন ভগৎ সিং?

Bhagat Singh jail life: জেলখানায় ভগৎ সিংয়ের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল বই। দ্বারকাদাস লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান শাস্ত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলের ভিতর বই পাচার করতেন। এই ৭১৬ দিনে তিনি প্রায় ৩০০-র বেশি বই পড়েছেন ভগৎ সিংহ।

টাকার বিনিময়ে বিজেপি-র প্রচার করেছেন সায়ক! আর আইনি জালে জড়ালেন অলিপাবের নিরীহ কর্মী

Sayak Chakraborty Olypub controversy: নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাঁচটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরের মোট খরচ ছিল ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই খরচ হয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা। সেই প্রচারের একটি অংশ ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্ট।

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।