মানুষের ভিতরের রাক্ষসকে মারেন যে দেবী

Amit Pratihar
৩ মিনিট
মানুষের ভিতরের রাক্ষসকে মারেন যে দেবী

এতদিন জানতাম মা দুর্গা মর্ত্য থেকে কৈলাসে ফিরে যাওয়ার পর আবার মর্ত্যে ফেরেন দেবী জগদ্ধাত্রী রূপে। তিনি সিংহবাহিনী, দশ হাতের বদলে মাত্র চারটি হাত, পায়ের নিচে বধ করে রেখেছেন হাতিরূপী এক অসুরকে। যার নাম কারিন্দ্রাসুর। কিন্তু কে এই কারিন্দ্রাসুর? ইনি কি আদেও কোনও অসুর? মা জগদ্ধাত্রী কি আদেও মা দুর্গার রূপ? তিনি কি আদেও কোনও অসুরকে বধ করেছিলেন? উত্তর শুনলে তাজ্জব হয়ে যাবেন। উত্তর হলো, 'না, দেবী জগদ্ধাত্রী আদেও কোনও অসুর বধ করেননি।'। তবে? কে এই অসুর যিনি মায়ের পায়ের নিচে লুটিয়ে আছেন?

জানতে গেলে জানতে হবে পৌরাণিক ইতিহাস। জগদ্ধাত্রী দেবী আসলে কোনও বিশেষ দেবী নন, ইনি পরম ব্রহ্মের জাগতিক রূপমাত্র! একটু বিশদে বুঝিয়ে বলা যাক। মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করার পর শান্তি নেমে আসে জগৎকুলে। দেবতা থেকে মানবজাতি সব্বাই শান্তির নিঃশ্বাস নেয়। তবে সব থেকে বেশি শান্তি পান দেবতারাই। কারণ মহিষাসুরের আতঙ্কে তারাই সবথেকে বেশি আতঙ্কিত ছিলেন। মা দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করার পর দেবতারা আবার নিজেদের পুরানো গর্বে অভিভূত অবতারে ফিরে যান। নিজেদের ক্ষমতার অহংয়ে তারা আবার অন্ধ হয়ে পড়েন। যেন তাঁরাই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, তাঁরা ছাড়া আর কারও কোনও শক্তিই নেই আর কী! এই দেখে ভারী ক্রুদ্ধ হয়ে যান ব্রহ্মা। তিনি যক্ষরূপ ধারণ করে দেবতাদের একে একে ডেকে পাঠান। একটি সামান্য ঘাসকে রেখে তিনি পবনদেবকে বলেন তা নিজ ক্ষমতায় সরিয়ে দেখাতে। পবনদেব হাজারো চেষ্টার পরেও বিফল হন। এরপর বরুনদেবকে ডেকে পাঠানো হয় এবং বলা হয় ঘাসটিকে ভিজিয়ে দেখাতে। তিনিও অসফল হন। তারপরে ডাক পরে অগ্নিদেব, তিনিও ঘাসটিকে জ্বালাতে সক্ষম হন না। অথচ এঁরা প্রত্যেকেই ঘাসটিকে সরাতে হবে, ভেজাতে হবে বা পোড়াতে হবে শুনে অট্টহাসি হাসেন প্রথমে। প্রত্যেকে অসফল হওয়ার পর নিজরূপে হাজির হন ব্রহ্মা। এবং তিনি দেবতাদের বোঝান যে সবার ওপরে ব্রহ্মাই সত্যি। তাহার ওপর কেহ না। তিনি আরও বলেন, দেবতাই হোক কিংবা মানব অথবা দৈত্য, এই জগতে সবচেয়ে বড় একটি অসুরের বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই করতে হবে আর সেটি হল তাঁদের মানসিক অহংয়ের অসুর। আর এই অসুরকে বধ করতেই পরম ব্রহ্ম যে দেবীর রূপ নেন, তিনিই জগদ্ধাত্রী।

জগদ্ধাত্রী দেবীর চার হাত, চার হাতে আছে শঙ্খ, চক্র, তির-ধনুক। দেবী বধ করছেন হস্তীরূপী করিন্দ্রাসুরকে, যা আসলে আমাদের ভিতরে বসবাসকারী অহংয়ের মূর্ত রূপমাত্র। তাই মা আমাদের সকলের মধ্যেই থাকেন, কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমায় তাঁকে পূজা করা হয় মাত্র। দেবীকে নিয়ে একটিই মাত্র শ্লোকের উল্লেখ পাওয়া যায়, শ্রী ললিতা সহস্রনাম-এর ১৭৩তম শ্লোকে দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীকেই জগদ্ধাত্রী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই শ্লোকটি হল, বিশ্বমাতা জগদ্ধাত্রী, বিশালাক্ষী, বিরাগিণী/প্রগলভা পরমোদরা, পরামোদা মানময়ী…

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী দেবীর খুব ধুমধাম করে পুজো করা হয়। অথচ চন্দননগরের সাথে জগদ্ধাত্রী পুজোর কোনও যোগই নেই বিশেষ। কোনও যোগ যদি থেকে থাকে তবে তা কৃষ্ণনগরের সাথে। এই যোগাযোগের পিছনে আছে এক ঐতিহাসিক কাহিনী। ১৭৫৪ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগে বন্দি হতে হয়েছিল কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর ছেলে কুমার শিবচন্দ্রকে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন আজীবন দুর্গাভক্ত। চতুর নবাব জানতেন যে, মনেপ্রাণে দুর্গাভক্ত কৃষ্ণচন্দ্রকে যদি তিনি দুর্গাপুজোর সময়ে বন্দি বানিয়ে রাখতে পারেন, তা হলেই রাজা নিজের রাজ্যটি অর্পণ করে দেবেন নবাবের কাছে। সেই পরিকল্পনা মতো তাঁকে বহুমাস কারাগারে বন্দি বানিয়ে রেখে অবশেষে ছেড়ে দেওয়া হয় দুর্গাপুজোর নবমীর দিন। রাজা ব্যাকুল হয়ে মায়ের পুজো করতে খালি পায়ে ছুট লাগালেন তাঁর রাজ্যের দিকে। যদি সময়ে পৌঁছে দেবীর আরাধনা করা যায়...

কিন্তু ততক্ষনে তার শরীর রণক্লান্ত, পেট ক্ষুধার্ত। দীর্ঘ দিনকাল যাবৎ জেলে বন্দি থাকায় শরীর ভীষণ দুর্বল। রাজা কিছুদূর দৌড়ে গিয়ে পথে রুকুনপুর বলে একটি জায়গায় পৌঁছে অজ্ঞান হয়ে যান। নিজের ভক্তের এই করুণ অবস্থা দেখে দেবী দুর্গা তাঁকে স্বয়ং স্বপ্নে দেখা দেন জগদ্ধাত্রী রূপে এবং বলেন যে, তাঁর পুজো সঠিক সময় অর্থাৎ শরত মাসে করতে না পারার দুঃখ রাজা ভুলতে পারবেন আগামী কার্তিক মাসের শুক্লা অষ্টমীতে জগদ্ধাত্রী রূপে দেবীর পুজো করলে। জ্ঞান ফেরার পর রাজা হন্তদন্ত হয়ে নিজ রাজ্যে পৌঁছান। সেখানে সমস্ত পণ্ডিতদের ডেকে তিনি তাঁর স্বপ্নের কথা খুলে বলেন এবং জানতে চান তাঁর স্বপ্নে দেখা সেই দেবী আসলে কে? পণ্ডিতেরা তাঁর কথা শুনে বলেন যে, তিনি দেবী জগদ্ধাত্রীকে দেখেছেন, যাঁকে এককালে পুজো করতেন দ্রাবিড়েরা। সেই মতো ১৭৫৪ সালে কৃষ্ণনগরে বাংলার প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন করেন তিনি, যা এখনও চলে আসছে। সে'সময় রাজার খুব কাছের বন্ধু ইন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী তাঁকে দেখে নিজ বাসস্থান চন্দননগরে শুরু করেন জগদ্ধাত্রী পুজোর, ১৭৫৫ সালে! সেই থেকেই চন্দননগরে এই পুজোর শুরু। যা আজকের দিনে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সব থেকে ধুমধাম করে করা হয়ে থাকে।

লিখেছেন
Amit Pratihar
Amit Pratihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।