পোশাকে বিশ্ববাংলা - অনিলায়ন থেকে মমতায়ন, ট্র্যাডিশান চলিতেছে

প্রস্তুতি চলছিল আগে থেকেই। অবশেষে সরকারি শিলমোহর পড়ল তাতে। ১৬ মার্চ জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্যের প্রতিটি স্কুলের ইউনিফর্ম হবে নীল সাদা এবং তাতে থাকবে বিশ্ববাংলার লোগো। রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছে। 

যে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য আমাদের বেঁচে থাকার রসদ, আমাদের পরিচিতি এই সিদ্ধান্তে সেই বৈচিত্র্যই প্রশ্নের মুখে। তার থেকে ও বড় কথা শিশু বয়স থেকেই একটি নির্দিষ্ট রঙের পোশাকে ছাত্র-ছাত্রীদের বেঁধে ফেলার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক? এর আগে আমরা হাসপাতালে নীল সাদা দেখেছি, সরকারি বাড়িতে নীল সাদা দেখেছি, কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে দলতন্ত্রের এমন  গণতন্ত্রকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। সরকার নির্ধারিত এক রঙে এক পোশাকে স্কুল যেতে হবে ছাত্র ছাত্রীদের, সরকারের এমন সিদ্ধান্ত ফ্যাসিস্ত আচরণকেই মনে পড়ায়। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্ষমতাশীল পার্টির হস্তক্ষেপ নতুন নয়। সরকারের ওপর দলতন্ত্রের ভূতকে ছাপিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ সেই বাম আমল থেকেই।

১৯৭৭ সাল। গোটা ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ডামাডোল, জরুরি অবস্থার পর ক্ষমতায় এসেছে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার। শুরুর দিকে না হলে ও মোটামুটি ১৯৮২ এর গোড়া থেকেই সরকারের ওপর দলতন্ত্রের বোঝা চেপে বসতে থাকে। ব্যতয় হয় না শিক্ষাব্যবস্থা ও। পার্টির তরফে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় বাম শাসন কায়েম করার দায়িত্ব পান সিপিএমের শিক্ষাসেলের প্রধান অনিল বিশ্বাস। সেই শুরু, তারপর থেকে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার নেপথ্যে ছিলেন সিপিএমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁর এই একচেটিয়া প্রভাবের জন্য আনন্দবাজার প্রথম কয়েনেজ করে ‘অনিলায়ন’ শব্দটি।

কেমন ছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘অনিলায়ন’?

তখন সবে সবে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে পার্টিতন্ত্র। শিক্ষা জগতে কোথায় কী নিয়োগ হবে, কার বদলি হবে সবটাই নিয়ন্ত্রিত হত আলিমুদ্দিন থেকে। যে শিক্ষক যত বেশি ‘পার্টিজান’ তাঁকে তত বেশি সুবিধা দেবে সরকার। দু একটা উদাহরণ দিলেই আনুগত্যের স্বরুপ কী ছিল তা বোঝা যাবে। ১৯৮৩ সালে শাসক দল সিপিএমের প্রবল আপত্তি সত্ত্বে ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য। আচার্য তথা রাজ্যপাল উপাচার্যর প্যানেলে থাকা বাকি দুই বাম সমর্থিত প্রার্থী কে অগ্রাহ্য করেই সেদিন সন্তোষবাবুকে মনোনীত করেন। তার পর থেকেই শুরু হয় বামেদের অসহযোগিতা। উপাচার্য হিসেবে যাতে সন্তোষবাবু নিজের মেয়াদ শেষ না করতে পারেন তার জন্য অতিসক্রিয় হয়ে ওঠেন অনিল বিশ্বাস। রোজই ক্লাস বয়কট, কর্মচারীদের দ্বারা ঘেরাও হতেন সন্তোষ বাবু। একবার ড. ভট্টাচার্য বাম ঘেঁষা পাঁচ কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। বামপন্থী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করবে না জেনেই নিজের জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করেন উপাচার্য। উপাচার্যের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন অনিল বিশ্বাস। সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য যা খুশি তাই করতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয় ওঁর বাবার সম্পত্তি নয়’। অনিল বিশ্বাসের এই আক্রমণেই স্পষ্ট হয়ে যায় শিক্ষা ব্যবস্থায় তখন তাঁর প্রভাব ঠিক কেমন ছিল। অথচ অনিল বাবু কোনদিনই সরকারের অংশ ছিলেন না। সিপিএম পার্টি ও সরকারের মধ্যে ক্ষমতার সেতু বাঁধার কাজটি নিপুণ ভাবে করতেন এই প্রভাবশালী সিপিএম নেতা।

বহুক্ষেত্রেই দেখা যেত আনুগত্যই চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে শেষ মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই বাম-আনুগত্যের প্রতিদান স্বরূপ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ- উপাচার্য ভারতী রায় মনোনীত হয়েছিলেন রাজ্যসভার বাম- সাংসদ হিসেবে। আনুগত্যের কাছে যোগ্যতার এহেন পরাজয় মেনে নিতে পারেননি আরেক সিপিএম নেতা অর্থনীতিবিদ বাম সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী ডঃ অশোক মিত্র। ১৯৮৬ সালে সরকারি কলেজ ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত কলেজের বেতন সমান হওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে মন্ত্রিত্ব ছাড়লে ও অশোক মিত্র বরাবরই শিক্ষাজগতে আনুগত্যের চেয়ে ও যোগ্যতার কদর করার স্বপক্ষে কথা বলেছেন। 

 ‘অনিলায়নের’ প্রভাব এড়াতে পারেনি শিক্ষাব্যবস্থা। সিপিএম চলে গিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে  ক্ষমতা ধরে রাখার অভ্যাসের এতটুকু বদল হয়নি। ‘অনিলায়ন’ যেন রূপ বদলে হয়েছে ‘মমতায়ন’। আলিমুদ্দিনের মতই শিক্ষা ব্যবস্থা উপর থেকে নীচ গোটাটাই শাসন হয় কালীঘাটের তৃণমূল হেড কোয়াটারস থেকে। কোন কলেজে শিক্ষক বদল হবে, কোন স্কুলে পরিচালন সমিতির নির্বাচন হবে সবই ঠিক হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অঙ্গুলিহেলনে। এবার শিক্ষাব্যবস্থায় পার্টির প্রভাবকে চিরস্থায়ী করার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন মুখ্যমন্ত্রী। 

রাজ্য সরকারের এই অভিন্ন স্কুল ড্রেস নীতির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। দক্ষিণ ২৪ পরগণার কৃষ্ণচন্দ্রপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক চন্দন মাইতি এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিদ্যালয়ের পোশাকের মধ্যে দিয়ে স্কুলের নিজের চরিত্র প্রকাশিত হয়। তাছাড়া সরকারের এই সিদ্ধান্ত সরকারি স্কুল গুলির জন্যে হলে ও সরকারি অনুদান প্রাপ্ত স্কুল গুলির জন্য এই নিয়ম বাধ্যতামূলক হবে কেন? শিক্ষা দপ্তরকে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন জানাচ্ছি’।

যদিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘লোগোটা আমি তৈরি করেছিলাম।আইন করে ওটা বাংলা সরকারের কাছে আছে।প্রাইভেট স্কুল ইচ্ছেমত ব্যাজ ব্যবহার করতেই পারে। আমরা বারণ করিনি। সরকারি স্কুলেরও যদি নিজস্ব ব্যাজ থাকে তা লাগাক না। আমরা তো আপত্তি করিনি। শুধু জামায় একটা বিশ্ববাংলা ব্র্যান্ডের ব্যাজ থাকবে। আমি যে বাংলার অধিবাসী এটা তার প্রমাণ’। মুখ্যমন্ত্রী সাফাই গাইলে ও প্রশ্ন ওঠে এই সিদ্ধান্ত কি ক্ষমতাতন্ত্রেরই প্রচ্ছন্ন প্রদর্শন নয়? শাসক বদলায়। ক্ষমতাতন্ত্রের স্বরুপ বদলায় কী?

More Articles

;