নয়ের দশকের স্মৃতি ও একটি সমকামী ভালবাসার পরিণতি

একের পর এক সিনেমাসুলভ জাম্পকাটে রচনা হয় স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর ধরে জনসাধারণের বঞ্চনার, রাজনৈতিক দলগুলোর বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি, এক প্রাচীন জনপদের কাহিনি।

Sourab Biswas
৩ মিনিট
নয়ের দশকের স্মৃতি ও একটি সমকামী ভালবাসার পরিণতি

উত্তর কলকাতার এক রেলওয়ে কলোনিতে আমার জন্ম। সেখানে বেশিরভাগ গ্রুপ ডি কর্মচারীর বাস। বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে মাঠ, ঝিল, কমিউনিটি হল, বাজার, প্রচুর গাছ, বিশাল সব ছাদ ও কান ঘেঁষে সাপের মতো দূরে চলে যাওয়া ট্রেনলাইন। জ্ঞান হওয়া থেকে পরবর্তী ১৭ বছর এই ছিল পৃথিবী। ঝাঁ চকচকে কলকাতা এই জগৎ থেকে বহু দূরের অন্য কোনও এক গ্রহ। বর্ষায় সবুজ ঘাস ডোবা জলে ভেসে যাওয়া ফুটবল লাথাতাম দেদার! মে মাস থেকে ছাদে আস্তানা গেড়ে ঘুড়ি লাট খাওয়ানোর আর্টে দিতাম মন। সন্ধে নামলেই পাড়ায়-পাড়ায় লাল মিছিল মার্চ করত। যেন আমরা আছি, এইটুকু জানান দিতেই তাদের হানা। আমাদের মতো ছোটদের লাভ হতো ভোটের দিন, পাড়ায় কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলের বুথ থেকে বিরিয়ানি ও লুচি-আলুর দম খেয়ে। পড়াশোনা হবে শুধু পরীক্ষার একমাস আগে। তার চেয়ে বরং আনন্দের গরমকালে লোডশেডিংয়ের রাত, মাঠে, মাদুরে চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো ভেসে যাওয়া মেঘেদের দিকে চেয়ে কল্পনায় মেতে থাকা। স্কুলে নক্ষত্র চিনতে শেখামাত্রই রাতের আকাশে এক এক করে মিলিয়ে নেওয়ায় মনোনিবেশ করি। কালপুরুষকে চিনে নেওয়ার সময় তখনই। অপুকে চিনব তার অনেকগুলো বছর পরে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় পড়ে জানতে পারি, কালপুরুষের প্রেমে মজলে ঘরছাড়া হতে হয়। "যারা কালপুরুষকে ভালবাসে তাদের কি হয় জানিস?- ঘরছাড়া হতে হয়।" মন্টুকেও হতে হবে একদিন ঘরছাড়া; কালপুরুষকে চেয়ে!

‘নাইনটিন নাইনটি আ লাভ স্টোরি’ পড়ার সময় চেনা চরিত্রর ভিড়ে মন্টুকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করি। কয়েকটা মুখ ভেসে এল চোখের সামনে, যারা মন্টুর মতোই ঢলে পড়েছিল মৃত্যুর কোলে। না! তারা কেউই মন্টুর মতো আদর্শবাদী নয়। আসলে নয়ের দশকে আদর্শহীনতার ঘুণপোকা সমাজকে এতটাই ফাঁপা করে ফেলেছিল যে, এইসব চরিত্ররা সংখ্যালঘু হয়ে উঠছিল। তাদের জায়গায় ধীরেসুস্থে জাঁকিয়ে বসছিল কথায়-কথায় ‘বুর্জোয়া’ উচ্চারণ করা চাটুজ্জেমশাইদের দল, শ্রেণিসংগ্রামের বুলি ঝেড়ে যারা নিজেদের ধীরেসুস্থে গুছিয়ে নিচ্ছিল। গঙ্গার পাশ থেকে বয়ে চলা এক প্রাচীন জনপদে ঘনঘোর এক বর্ষার রাতে এই উপন্যাসের মূল চরিত্র কিংশুকের জন্ম। এরপর পাতার পর পাতাজুড়ে সে কখনও ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে, কখনও গঙ্গায় নৌকায় ভেসে, আবার কখনও মর্গে লাশের পাশে দাঁড়িয়ে খুঁজবে অন্ধকারে আলোর উৎস। মর্গের অন্ধকারে তখন শুয়ে এই প্রাচীন জনপদে জন্ম নেওয়া বীরগাথার নায়ক মন্টু সরকার। ধনুকধারী কালপুরুষের পিছে ছুটে চলা মন্টু খোদ তীরসজ্জায় শায়িত। আশ্চর্য সমাপতন!

এই লেখার বুনন উপন্যাস কম, সিনেমা বেশি। ঘন ঘন ফ্ল্যাশব্যাক সিনেমা হলের পর্দায় ফুটে উঠতে থাকে। উপন্যাসের শুরুতেই একটা থ্রিলার হয়ে ওঠার সব লক্ষণ উপস্থিত ছিল। কিন্তু লেখকের ভাষায় বর্ণনা করতে চাইলে লিখতে হয়, গল্পের ধরাবাঁধা সূত্রপাত, লোমহর্ষক বিচিত্র বুনন নিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার কোনও গরজ নেই তার। অথচ অনায়াসে হয়ে উঠতে পারত এই বাংলা বাজারে ডিমান্ডিং সাসপেন্স থ্রিলার! বা মফসসলি টিন-এজ প্রেমের এক মিষ্টি উপন্যাস! এগুলো কিছুই হলো না। ঠিক যেমন মন্টু কবি না হয়ে হল অন্ধকার দুনিয়ার রাজপুত্র।

একের পর এক সিনেমাসুলভ জাম্পকাটে রচনা হয় স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর ধরে জনসাধারণের বঞ্চনার, রাজনৈতিক দলগুলোর বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি, এক প্রাচীন জনপদের কাহিনি। যে কাহিনি পাতার পর পাতাজুড়ে একফোঁটা স্বস্তি না দিয়ে অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন করে। সমাজকে অস্বস্তির মুখে দাঁড় করিয়ে বলে চলে এক সমকামী, নিঃস্বার্থ প্রেমের কাহিনি। লেনিনের বক্তৃতা সংকলনকে সাক্ষী রেখে দুই পুরুষ দেহের মিলন! উদার অর্থনীতির জোয়ারে নিজেদের গায়ে সুগন্ধি স্প্রে করে মগ্ন হয়ে চেয়ে থাকি সুউচ্চ অট্টালিকাদের দিকে। একদিন এরকমই এক জায়গায় একের পর এক গুলি বুক চিরে চলে যাবে মন্টুকে। আসলে মন্টুদের চলে যেতে হয়। যেমন আজকের পৃথিবীতে হুলোর মতো রূপকথার চরিত্রদের হতে হয় নিরুদ্দেশ!

কিছু লেখা পড়ে নিজেদের গরজে উত্তরের সন্ধান করতে হয়। এই বই সেই গোত্রের। এখানে উত্তরের তোয়াক্কা না করে লেখক একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। প্রয়োজনে পাঠক নিজের গরজেই তার সন্ধান হয়তো করবে। লেখকের আগের লেখা বইগুলো অপেক্ষা এই লেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের। মেখলা ভট্টাচার্যর আঁকা ছবি কল্পনার ঘোড়াকে দুরন্ত গতিতে ছোটায়। বইজুড়ে ভেসে আসে কেওকারপিন তেলের হালকা সুগন্ধ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন, যাদের ছবি ধরা রইল না ক্যামেরার লেন্সে

দেশের আসল সংজ্ঞা কী? দেশের প্রতি ভালবাসা আসে কীভাবে? প্রত্যেকের কাছে আছে দেশের নিজস্ব সংজ্ঞা। সেই ভালবাসা জোর করে আসে না, এমনিই আসে মন থেকে। যেমন বড় মনির ছিল একটুকরো দেশ। টুক করে সে হারিয়ে যেত মাঝে মাঝে। হাঁদার ছিল একটা চায়ের দোকান।

'নাইনটিন নাইনটি আ লাভ স্টোরি'

কল্লোল লাহিড়ী

প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: মেখলা ভট্টাচার্য

সুপ্রকাশ

মূল্য: ২৮০

লিখেছেন
Sourab Biswas
Sourab Biswas
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক গঙ্গাপ্রসাদ সেনের বাড়ির দুর্গাপুজো: পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্য যেভাবে এল কুমারটুলিতে

Gangaprasad Sen Bari Durga Puja: গঙ্গাপ্রসাদ সেন ছিলেন বিখ্যাত আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও তাঁর কাছে চিকিৎসা করাতে আসতেন। তাঁর বাবা নীলাম্বর সেন অবিভক্ত বাংলার এক নামকরা কবিরাজ ছিলেন। কলকাতায় আসার পর সেন পরিবার কুমারটুলিতে বসতি গড়ে এবং সেখানেই ১৮৫৭ সালে শুরু হয় দুর্গার আরাধনা।

১৩ বছর বয়সে ফুটপাথে থাকা, কার্গিলে জওয়ানদের পাশে, ‘পরিন্দা’য় আগুনে পুড়ে যাওয়া: নানা পাটেকর আসলে কেমন মানুষ ছিলেন?

Nana Patekar unknown facts: প্রকাশ রাজের ভাষায়, নানা কেবল একজন প্রবীণ সহকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক অভিভাবক-বন্ধু, যাঁর সঙ্গে তীব্র তর্কে জড়িয়ে পড়া যেত, আবার একই টেবিলে বসে তাঁর হাতের রান্না করা খাবার ভাগ করে নেওয়া যেত। মদ বা মুম্বইয়ের তথাকথিত হাই-প্রোফাইল পার্টি কালচারের প্রতি তাঁর চিরকালই ছিল তীব্র অনীহা।

নানা পাটেকর: ফিরে দেখা অনন্য জীবন

Nana Patekar: ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বোম্বে রাজ্যের রায়গড় জেলার মুরুদ-জানজিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্মেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। পরে সিনেমার দুনিয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘নানা পাটেকর’।

মাছ-ভাত খেয়েই বোধন, দশমীতে মৎস্যমুখ! বাগবাজার হালদার বাড়ির সাড়ে চারশো বছরের পরম্পরা

Bagbazar Haldar Bari Durga Puja: পুজোর ইতিহাসের সূত্রপাত ওড়িশার বালেশ্বরের কাছে সাহেবপুর বা রহনপুরে। হালদার পরিবারের পূর্বপুরুষরা চন্দননগরের নোয়াপাড়ার জমিদার ছিলেন। তাঁদেরই এক পূর্বপুরুষ কৃষ্ণপ্রসাদ হালদার প্রমোদভ্রমণে ওড়িশার ওই এলাকায় গেলে স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নের বর্ণনা অনুযায়ী মাটি খুঁড়ে সত্যিই উদ্ধার হয় মহিষমর্দিনীর কষ্টিপাথরের মূর্তি।

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।

যে দুর্গাপুজোয় সাধারণের প্রবেশ ছিল নিষেধ, সেখান থেকেই যেভাবে হলো সর্বজনীন পুজোর শুরু

history of Durga Puja in Kolkata: ব্রিটিশ কলকাতায় সেই পুজোর ধরন বদলাতে শুরু করল; বদলাল গেট-টুগেদারের ধরনও। আর কলকাতার দুর্গাপুজো আদতে হয়ে উঠল কোম্পানির পুজো। মানে কোম্পানির লোকেদের তোয়াজের জন্য করা পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান। সেই পুজোর থেকে ইংরেজদের মনোরঞ্জন করা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

Jorge Luis Borges: ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে লেখকের বিধবা স্ত্রী মারিয়া কোদামা তাঁদের অনন্য সম্পর্ক ও একান্ত যাপনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মারিয়া কোদামা মৃত্যুবরণ করেন ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন পাবলো হিয়েনেরা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, পরে লা নাসিয়ন (La Nacion) পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্য ও বোর্হেসবিশেষজ্ঞ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন।