এমনও সম্ভব! পৃথিবীতে বাক্সের মধ্যে তৈরি হল সূর্য, অসাধ্যসাধন বিজ্ঞানীদের

Nuclear Fusion: মানবজাতি যে পদ্ধতিতে পরমাণু বোমা বানিয়েছে বা পরমাণু চুল্লিতে শক্তি উৎপাদন করেছে তার একেবারে বিপরীত এই প্রযুক্তি।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
এমনও সম্ভব! পৃথিবীতে বাক্সের মধ্যে তৈরি হল সূর্য, অসাধ্যসাধন বিজ্ঞানীদের

লেখা শুরু করব একটা প্রশ্ন দিয়ে। আপনি কখনও সূর্যের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছেন যে আপনার, আমার, গোটা পৃথিবীর এই যে চালিকা শক্তি, এই যে প্রকাণ্ড শক্তির ভাণ্ডার, তার উৎস কী? কোন পদ্ধতিতে শত কোটি বছর ধরে অবিরাম শক্তি উৎপাদন করে চলেছে এই নক্ষত্র? আরও একটি প্রশ্ন। আপনার কি মনে হয় জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব উষ্ণায়ন কীভাবে ঠেকাতে পারবে মানুষ? জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করে, তাই তো? সৌর শক্তির ব্যবহার করে? জল শক্তি, বায়ুর শক্তি ব্যবহার করে? এই দুটো প্রশ্ন একসঙ্গে করার সম্পর্ক কী? তাহলে আসা যাক মূল জায়গায়, যদি আপনাকে বলা হয় আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদকে ঠেকাতে পারব পৃথিবীতে একটি বাক্সের ভিতর সূর্যকে সৃষ্টি করে! অবাস্তব শোনাচ্ছে নিশ্চয়ই। স্বাভাবিক। কিন্তু বিজ্ঞানের কাজই অবাস্তবকে বাস্তবে পরিণত করা। কল্পবিজ্ঞানের রূপকথাকে বিজ্ঞানের কঠিন বাস্তবে রূপ দেওয়া। সম্প্রতি মার্কিন বিজ্ঞানীরা এই অবাস্তবকেই পরীক্ষাগারে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন সফলভাবে। প্রায় ছয় দশকের প্রচেষ্টার পর!

সূর্যের শক্তির উৎস হল নিউক্লিয়ার ফিউশন নামক এক প্রযুক্তি। মানবজাতি যে পদ্ধতিতে পরমাণু বোমা বানিয়েছে বা পরমাণু চুল্লিতে শক্তি উৎপাদন করেছে তার একেবারে বিপরীত এই প্রযুক্তি। আমরা এতদিন নিউক্লিয়ার ফিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই কাজটি করতাম, যেখানে ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌলকে ভেঙে প্রকাণ্ড পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা হতো। সেই প্রক্রিয়ায় শুধুমাত্র যে প্রচুর পরিমাণে বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের জন্ম নিত তাই নয়, উৎপাদন প্রক্রিয়াও ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। চেরনোবিল বা জাপানের পরমাণু চুল্লির দুর্ঘটনার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে সকলের।

কিন্তু সূর্য যে পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন করে, তা হলো ফিউশন। সেখানে হালকা দুই মৌল উত্তপ্ত হয়ে একটি ভারী মৌল তৈরি করে এবং সেই পদ্ধতিতে প্রকাণ্ড পরিমাণ শক্তির সৃষ্টি হয়। সূর্যের শক্তির উৎস যেমন হাইড্রোজেনের দু'টি মৌল, যারা এই পদ্ধতিতে উত্তপ্ত হয়ে হিলিয়ম নামক একটি ভারী মৌলের জন্ম দেয়। যদিও এই পদ্ধতির জন্য প্রয়োজন প্রচণ্ড পরিমাণ শক্তি এবং চাপ। সূর্যের ক্ষেত্রে সেই শক্তির জোগান দেয় এক কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের চেয়ে প্রায় একশো বিলিয়ন গুণ বেশি চাপ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০৭১ সাল দেখাবে এই 'ভবিষ্যতের জাদুঘর'! কী কী আছে এর অন্দরে, জানলে আঁতকে উঠবেন

Museum of Future in Dubai: এই জাদুঘরকে নিছক মিউজিয়াম বললে সবটা বলা হয় না। বরং একে ডাকা যেতে পারে টাইম ক্যাপসুল নামে, যা আপনাকে ভবিষ্যতে নিয়ে যাবে।

কিন্তু পৃথিবীতে তো এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা ভীষণ কঠিন এক কাজ। ১৯৬০ থেকে প্রায় ৫০ টি দেশের বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু সূর্যের কোরের অবস্থা পৃথিবীতে সৃষ্টি করা এবং তাকে অধিক সময়ের জন্য ধরে রাখা ছিল অসম্ভব এক কাজ। সম্প্রতি আমেরিকার National Ignition Facility ১৯২ টি বিম লেজরের মাধ্যমে এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে। সব থেকে বড় কৃতিত্ব হল, যে পরিমাণ শক্তি তারা এই কাজের জন্য ব্যবহার করেছেন তার থেকে অনেকটাই বেশি শক্তি তারা এই পদ্ধতিতে উৎপাদন করতে পেরেছেন।

এবার প্রশ্ন আসতে পারে, এত পরিমাণ শক্তি পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি করা এবং তার মাধ্যমে পৃথিবীবাসীকে শক্তির জোগান দেওয়া কতটা সুরক্ষিত? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পদ্ধতি আসলে সব থেকে ঝুঁকিহীন। এমনভাবেই যন্ত্রের ব্যবহার করা সম্ভব যেখানে শক্তি উৎপাদন যদি মাত্রাছাড়া পরিস্থিতিতে চলে যায় তাহলে যন্ত্র নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। কোনও ধরনের বিস্ফোরণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। সেই সঙ্গেই, এই পদ্ধতিতে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বিশেষ তৈরি হয়না বললেই চলে। তৈরি হয় না কোনও ধরনের গ্রিন হাউজ গ্যাস। সব থেকে বড় বিষয় হল, এই পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন করতে যে উপাদানের প্রয়োজন তা হলো জল। পৃথিবীতে যে পরিমাণ জল রয়েছে তাতে আগামী তিন কোটি বছর হেসে খেলে শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

লেখার শুরুতেই দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি ছিল এবার সেই প্রসঙ্গে আসা যাক। জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ কীভাবে করা সম্ভব হবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। পৃথিবীতে যদি আর একদিনও জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর প্রয়োজন না হয়, তাহলে আজ যে বিপদের সম্মুখীন আমরা, তা ঠেকানো সম্ভব হবে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তা এক অলীক কল্পনা হলেও এই নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তি যেদিন পুরোদমে কাজ করা শুরু করবে সেই দিন গোটা পৃথিবী অনেক সস্তায় শক্তির জোগান পাবে। পৃথিবীর প্রত্যেক প্রান্তে এই পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে এবং তা হবে সম্পূর্ণভাবে দূষণহীন। হ্যাঁ, এটা ঠিকই যে সবে মাত্র পরীক্ষাগারে সাফল্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দিল্লি এখনও অনেক দূর। কিন্তু এই কথা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই যে ভবিষ্যত প্রজন্মকে এক সুন্দর পৃথিবী দেওয়ার পথে অনেক ধাপ এগিয়ে গেল মানবজাতি।

আশাব্যঞ্জক আরও এই কারণে, বিল গেটস, জেফ বেজোসের মতো ধনকুবের এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছেন। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও এ কথা সত্যি, ধনতান্ত্রিক পৃথিবীতে ধনকুবেরদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া পৃথিবীকে রক্ষা করা অসম্ভব। এবার এটাই দেখার, কত বছরের মধ্যে সাধারণের ঘরের আলো নিউক্লিয়ার ফিউশনের মাধ্যমে জ্বলে।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?

৩ অগাস্ট থেকে বদলে যাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম!

Stock Market India: নতুন ব্যবস্থার অধীনে শেয়ার বাজার বন্ধের সময়কে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে নন-এফএন্ডও (Non-F&O) স্টকগুলির ক্ষেত্রে আগের মতোই বিকেল ৩:৩০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক লেনদেন চালু থাকবে, এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু এফএন্ডও স্টকগুলির ক্যাশ মার্কেটে প্রতিদিন একটানা লেনদেন চলবে বিকেল ৩:১৫ মিনিট পর্যন্ত।

আইআইটি-র দুই প্রাক্তনীর বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রে একরপ্রতি খরচ মাত্র ৪০ টাকা

Electric Power Tiller: বাজারে যেসব ট্র্যাক্টর পাওয়া যায়, তা হয় বিশাল বড় জমির উপযোগী, না হয় কেনা ও চালানো দুটোই খুব ব্যয়বহুল। ভারতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কৃষকের জমিই ছোট ও খণ্ড-বিখণ্ড, যেখানে বড় যন্ত্র ঢোকানোই সম্ভব নয়। আবার চিন থেকে আমদানি করা ছোট ছোট সস্তা মেশিনগুলিতে যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিংয়ের চূড়ান্ত সমস্যা তৈরি হয়। তাই বিদেশ থেকে আমদানির কথা না ভেবে, আইআইটি বোম্বের দুই প্রাক্তনী ঐশ্বর্য রামকৃষ্ণন ও কেদার গোখলে সিদ্ধান্ত নেন খাঁটি দেশীয় প্রযুক্তিতে ভারতের মাটির উপযোগী সমাধান তৈরি করার।

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি

Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।

মহাকাশে মিলল চিনির সন্ধান, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।

কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা

Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।