বাঙালির ব্যবসা করতে না পারার দুর্নাম ঘুচিয়ে দিয়েছে একশো ছুঁই ছুঁই বোরোলিন

ঋতুপর্ণ ঘোষ বোরোলিন-এর জন্য লিখেছিলেন, 'জীবনের নানা ওঠাপড়া যেন সহজে গায়ে না লাগে'।

Piya Saha
৩ মিনিট
বাঙালির ব্যবসা করতে না পারার দুর্নাম ঘুচিয়ে দিয়েছে একশো ছুঁই ছুঁই বোরোলিন

সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন- নিশ্চয়ই এই লাইনটি পড়ার সময়ও আপনার কানে জিঙ্গেলের সুরটি বাজছে। আর হবে নাইই বা কেন, বাঙালি বাড়ির মা-ঠাকুরমারা যেভাবে কোনও কিছু হলেই বলে উঠতেন, 'একটু বোরোলিন লাগিয়ে নে ঠিক হয়ে যাবে সব', তাতে নতুন করে এই জিনিস চেনাতে হয় না কাউকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বোরোলিন মেখেই অর্ধেক অসুখ সারিয়ে তুলছে বাঙালি। সবুজ টিউবের ওপর কালো রঙের মুখ বাঙালির কাছে আজীবনের নস্টালজিয়া। আর যাঁরা বলেন, বাঙালি ব্যবসা করতে পারে না, তাঁদের মুখের ওপর জবাব দিয়েছে বোরোলিন। ৯০ বছর পার করে আজও স্বদেশি আন্দোলনের এই পণ্য বাঙালির পরিচয়ের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বোরোলিনের শুরুর কথা

সালটা তখন ১৯২৯। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বহু দেশি ছোট-বড় কোম্পানি পথচলা শুরু করেছে। এমন সময়েই গৌরমোহন দত্ত দেশি ওষুধ তৈরির উদ্দেশ্যে তৈরি করলেন জিডি ফার্মাসিউটক্যালস। গৌরবাবুর এই কোম্পানিতেই শুরু হয় বোরোলিনের উৎপাদন। তখনকার দিনে ক্ষত নিরাময়ের জন্য ভেষজ উপাদান ব্যবহার করা হতো। সেই সময় ভারতের বাজারে পাওয়া বিদেশি কোম্পানির ক্রিমের বিপরীতে দেশি ক্রিম হিসেবে এল এই বোরোলিন।

ব্যবসা চালাতে পরাধীন ভারতে ইংরেজদের তৈরি করা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে বারে বারে। কিন্তু গৌরমোহনবাবুও পিছিয়ে আসার পাত্র নন। লড়াই করে বাজার দখল করেছে বাংলা তথা ভারতবাসীর কাছের ক্রিম বোরোলিন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন ছাপা হল: আগামীকাল দু'টি আউটলেট থেকে বোরোলিন বিতরণ করা হবে । স্বাধীনতার দিন বিনামূল্যে জনসাধারণকে ১ লক্ষ টিউব বোরোলিন বিতরণ করেন গৌরমোহনবাবু। আজ ৯৩ বছর পেরিয়েও এতখানি কমেনি বোরোলিনের জনপ্রিয়তা। বহু বিদেশি কোম্পানির ক্রিমকে এত বছর পরেও কয়েক গোল দেবে বাঙালির তৈরি বোরোলিন।

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কমছে ওলা-উবেরের দাপট, শহরের পথে এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নস্টালজিয়ায় ভরা হলুদ ট্যাক্সি

অপর্ণা সেনের '৩৬ চৌরঙ্গী লেন'-এ ট্যাক্সির ভেতর প্রেমিক-প্রেমিকার রোম্যান্টিক সিন এখনও সিনেমাপ্রেমীদের স্মৃতিতে গাঁথা

বোরিক পাউডার, জিঙ্ক অক্সাইড এবং ল্যানোনিল দিয়ে তৈরি এই অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বাঙালির কাছে ম্যাজিকের মতো। বোরোলিন নামটি এসেছে এর উপাদান বোরিক পাউডারের থেকে 'বোরো' এবং ল্যানোলিনের 'ওলিন' কথাটি জুড়ে। সবুজ টিউবের ওপর হাতির ছবি থাকার পিছনে রয়েছে অন্য গল্প। ভারতীয় সংস্কৃতিতে হাতিকে শুভ বলে মনে করা হয়, এবং তার দেহের শক্তি মারাত্মক। সেই কারণেই এই ছবির ব্যবহার। গ্রামীণ ভারতের মানুষের কাছে এই ক্রিম আজও 'হাতিওয়ালা ক্রিম' নামে পরিচিত। সুগন্ধি এই ক্রিম ভারতের কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীর মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে। প্রচণ্ড তুষারপাতে কাশ্মীরের মানুষ যেমন ফাটা চামড়ায় বোরোলিনের প্রলেপ দেয়, তেমনই দাক্ষিণাত্যের মানুষ প্রখর রোদ থেকে বাঁচতে সানসক্রিম হিসেবে ব্যবহার করেন বোরোলিনকে। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও ব্যবহার করতেন বোরোলিন।

বোরোলিন এবং বিজ্ঞাপন

সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিনের সঙ্গে 'বঙ্গজীবনের অঙ্গ' ট্যাগলাইন মুখস্থ বাঙালির। এই ট্যাগলাইনের সৃষ্টিকর্তা বিখ্যাত বাঙালি পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ। আবার শোনা যায়, এই লাইন আদতে তৈরি জে. ওয়াল্টার টমসন নামক এক বিজ্ঞাপন সংস্থার। তবে ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালক হওয়ার আগে ১০ বছর টানা বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করেছেন। এই সময় তিনি বোরোলিন-এর জন্য লিখেছিলেন, 'জীবনের নানা ওঠাপড়া যেন সহজে গায়ে না লাগে'। সবক'টিই বাঙালিকে আরও বেশি করে ব্র্যান্ড লয়াল করে তুলেছে।

আজকের বোরোলিন

৯৩ বছর পরেও এতটুকু কমেনি বোরোলিনের চাহিদা। কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালেও ভারতের বাজারে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ ধরে রেখেছে বোরোলিন। ২০১৫-'১৬ আর্থিক বর্ষে জিডি ফার্মাসিটিক্যালের বার্ষিক টার্নওভার ছিল ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬০% এসেছে বোরোলিন বিক্রি করে, অর্থাৎ ৯০ কোটি টাকা। ভারতের 'মোস্ট অ্যাডমায়ার ব্র্যান্ড'-এর খেতাব রয়েছে বোরোলিন-এর মুকুটে। ২০০৩ সাল থেকে টানা ইন্ডিয়ান সুপার ব্র্যান্ডের শিরোপাও রয়েছে এই কোম্পানির। তবে অপরিসীম চাহিদার পরেও ভারতের বাইরে আজও অমিল বোরোলিন। কিন্তু দেশ থেকে বোরোলিন নিয়ে বিদেশ পাড়ি দেন বহু প্রবাসী ভারতীয়।

বহু ভুয়া প্রোডাক্টে একসময় ভরে গিয়েছিল বাজার। কিন্তু সেই সমস্যাও কাটিয়ে উঠেছে কোম্পানি। আজ সবুজ টিউবের বদলে এসেছে গোল কৌটো। নতুন জেনারেশনের কাছে পৌঁছতে এবং মহিলাদের ব্যাগে জায়গা করে নিতেই এই নতুন রূপ বলে জানিয়েছেন বর্তমান অধিকর্তা দেবাশিস দত্ত। বোরোলিন-এর নতুন ভেরিয়েশনও এসেছে বাজারে, আল্ট্রা স্মুথ, যা আরও বেশি মসৃণ, ও আরও বেশি নরম।

বোরোলিন আজও অমলিন। বাঙালির পরিচয়ের অন্যতম চিহ্ন এই বোরোলিন।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।